চতুর্মুখী সংকটে পোল্ট্রি শিল্প
মে ১৯ ২০২৬, ০২:৪৭
চলতি বাজেটে করপোরেট কর ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৭.৫ শতাংশ করা এবং আমদানিতে উচ্চ শুল্ক বহাল রাখায় গত ছয় বছরে এই খাতের উৎপাদন খরচ বেড়েছে প্রায় ২০০ শতাংশ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে ২০ শতাংশ বাড়তি পরিবহন খরচ। উৎপাদন ও সরবরাহের এই বিশাল ঘাটতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাজারে। মাত্র এক মাসের ব্যবধানে প্রতি ডজন ডিমের দাম ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে।
পোল্ট্রি খাতের এই বহুমুখী বিপর্যয় কেবল লাখ লাখ প্রান্তিক খামারির অস্তিত্বকেই হুমকির মুখে ফেলেনি, বরং দেশের সামগ্রিক পুষ্টি নিরাপত্তাকে এক বড় ধরনের ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছে। পোল্ট্রি শিল্পের প্রধান স্তম্ভ হলো ব্রয়লার ও লেয়ার মুরগির বাচ্চার নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ। ব্রিডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (বিএবি) সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এই শিল্পের মূল চালিকাশক্তি হলো বিদ্যুৎ। ব্রয়লারের বাচ্চা উৎপাদন, ডিম ইনকিউবেশন (ডিম থেকে বাচ্চা ফোটানো) এবং খামারের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের জন্য ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়।
কিন্তু বর্তমানে দেশের সার্বিক বিদ্যুৎ পরিস্থিতি এইশিল্পের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিদিন গড়ে ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। উৎপাদন ঘাটতির চিত্র: দেশে প্রতি সপ্তাহে ব্রয়লার বাচ্চার চাহিদা রয়েছে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ। কিন্তু ইনকিউবেটরে নিরবচ্ছিন্ন তাপমাত্রা বজায় রাখতে না পারায় প্রতি সপ্তাহে উৎপাদন কমছে প্রায় ৫০ লাখ। এই বিপুল পরিমাণ বাচ্চার ঘাটতি সরাসরি সরবরাহ শৃঙ্খলে আঘাত হেনেছে, যার চূড়ান্ত প্রভাব পড়ছে বাজারে।
পোল্ট্রি খাতে মোট উৎপাদন খরচের প্রায় ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশই ব্যয় হয় মুরগির খাদ্য বা ফিড ক্রয়ের পেছনে। আন্তর্জাতিক বাজারে ভুট্টা, সয়াবিন মিলসহ বিভিন্ন প্রধান কাঁচামালের দাম বাড়ার কারণে ফিড উৎপাদন ব্যয় রেকর্ড ছুঁয়েছে। বিগত ছয় বছরে বাংলাদেশে পোল্ট্রি শিল্পের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির হার বিশ্লেষণ করলে এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে ওঠে। বছরভিত্তিক উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির খতিয়ান: সাল ও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির হার (২০২০ সালের তুলনায়)- ২০২২ সালে ১১৫ শতাংশ, ২০২৩ সালে ১৪৫ শতাংশ, ২০২৪ সালে ১৭০ শতাংশ, ২০২৫ সালে ১৯০ শতাংশ এবং ২০২৬ (বর্তমান) ২০০ শতাংশ। ছয় বছরে উৎপাদন খরচ ঠিক দ্বিগুণ (২০০ শতাংশ) হওয়ায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিদের পক্ষে বাজারে টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। পোল্ট্রি খাতের এই সংকটের আগুনে ঘি ঢেলেছে সরকারের কর ও শুল্ক নীতি এবং জ্বালানি তেলের চড়া দাম। করপোরেট কর বৃদ্ধি: চলতি বাজেটে পোল্ট্রি খাতের করপোরেট কর ১৫ শতাংশ থেকে একলাফে বাড়িয়ে ২৭.৫ শতাংশ করা হয়েছে।
আমদানি শুল্ক: খাদ্যের কাঁচামাল আমদানির ওপর কর ও শুল্ক বৃদ্ধি পাওয়ায় ফিডের দাম দফায় দফায় বেড়েছে। পরিবহন ব্যয়: জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে সরাসরি প্রভাব পড়েছে লজিস্টিকস খাতে। খামার থেকে বাজারে পণ্য পৌঁছানোর পরিবহন খরচ এক ধাক্কায় প্রায় ২০ শতাংশ বেড়ে গেছে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের (যেমন ভারত বা নেপাল) তুলনায় বাংলাদেশে পোল্ট্রি ও পশুখাদ্য খাতে কর সুবিধা অত্যন্ত কম। অন্যান্য দেশে যেখানে এই খাতকে বাঁচাতে প্রণোদনা ও কর মওকুফ করা হচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশে বহাল রয়েছে উচ্চ কর কাঠামো। উৎপাদন সংকটের সরাসরি খড়্গ এসে পড়েছে সাধারণ ভোক্তার পকেটে।
রাজধানীর কারওয়ান বাজার, মিরপুর ও যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ডিমের দাম আবার আকাশছোঁয়া। লাল ডিম: প্রতি ডজন বিক্রি হচ্ছে ১২০ থেকে ১৩০ টাকায়। সাদা ডিম: প্রতি ডজন বিক্রি হচ্ছে ১১০ থেকে ১১৫ টাকায়। অথচ মাত্র এক মাস আগেও বাজারে ডজন প্রতি ডিমের দাম ছিল ৯৫ থেকে ১০০ টাকা। অর্থাৎ, মাত্র ৩০ দিনের ব্যবধানে ডিমের দাম ডজনে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ব্রয়লার ও সোনালি মুরগির দামও কেজিতে ২০ থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। খামারিদের অভিযোগ, মাঠ পর্যায়ে তারা ডিম ও মুরগির যে দাম পাচ্ছেন, খুচরা বাজারে ভোক্তাদের তার চেয়ে অনেক বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। মধ্যস্বত্বভোগী ও ত্রুটিপূর্ণ বাজার ব্যবস্থাপনার কারণে এই পার্থক্যের সৃষ্টি হচ্ছে।
বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিআইএ) সভাপতি মোশারফ হোসেন চৌধুরী এই পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন ‘বিশ্বের কোথাও খাদ্য উৎপাদন সংশ্লিষ্ট খাতে এতো উচ্চ কর নেই। বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ হয়েও এখানে উল্টো প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বর্তমান কর ও শুল্ক কাঠামো যদি দ্রুত অন্তত অর্ধেকে নামিয়ে আনা না হয়, তবে দেশের প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র খামারিরা চিরতরে হারিয়ে যাবে। এর ফলে পুরো পোল্ট্রি খাত গুটিকয়েক বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে, যা বাজারের জন্য আরও বিপজ্জনক হবে।’
সর্বোপরি, দেশের মানুষের সস্তা পুষ্টির প্রধান উৎস পোল্ট্রি শিল্পকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে হলে সরকারকে এখনই জরুরি ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নিতে হবে। কৃষি অর্থনীতিবিদ ও খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, উত্তরণের জন্য ফিড বা খাদ্যের কাঁচামাল আমদানিতে আয়কর ও শুল্ক অবিলম্বে হ্রাস করতে হবে। দেশীয় খাদ্য উৎপাদনকারী উদ্যোক্তাদের যন্ত্রপাতি আমদানিতে বিশেষ ছাড় দিতে হবে। হ্যাচারি ও ব্রিডিং ফার্মগুলোয় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে অথবা জেনারেটর সচল রাখার জন্য জ্বালানি তেলে বিশেষ ভর্তুকি দিতে হবে। খামারিদের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি এবং খুচরা বাজারে যৌক্তিক দাম নিশ্চিত করতে সরকারি বিপণন সংস্থাগুলোর কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। পোল্ট্রি খাত কেবল একটি শিল্প নয়, এটি দেশের কোটি মানুষের কর্মসংস্থান এবং পুষ্টির ভিত্তি। এই খাতকে বাঁচাতে সরকারের নীতিগত সহায়তা ও দ্রুত হস্তক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।









































