বেপরোয়া ছিনতাই চক্র
মে ১৮ ২০২৬, ০৩:০১
রাজধানী ঢাকা এখন এক আতঙ্কের নগরীতে পরিণত হয়েছে। সন্ধ্যা নামার পর থেকে ভোর পর্যন্ত তো বটেই, এমনকি খোদ দিনের আলোতেও ঢাকার বিভিন্ন প্রধান সড়ক, অলিগলি, বাসস্ট্যান্ড ও রেলগেট এলাকায় সক্রিয় হয়ে উঠছে সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী চক্র। পথচারী, দিনমজুর, শিক্ষার্থী, নারী, সাংবাদিক থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত গাড়িচালক কেউই রেহাই পাচ্ছেন না এই চক্রের হাত থেকে।
ধারালো অস্ত্রের মুখে নিমেষেই সর্বস্ব ছিনিয়ে নেয়ার পাশাপাশি সামান্য প্রতিরোধ করলেই কুপিয়ে ও ছুরিকাঘাত করে জখম করার ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে, যা মেগাসিটির নাগরিকদের নিরাপত্তাবোধকে চরম সংকটে ফেলেছে।
রাজধানীতে সামপ্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনা বিশ্লেষণ করলে ছিনতাইকারীদের বেপরোয়া রূপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে সাংবাদিকের ওপর চড়াও সিন্ডিকেট: গত ১৩ মে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে শেরেবাংলা নগর থানার শিশুমেলার সামনে সংঘবদ্ধ ছিনতাইয়ের শিকার হন একটি অনলাইন পোর্টালের ঢাকা মেডিকেল প্রতিবেদক কাজী আল-আমিন। একটি বিআরটিসি বাসে ওঠার পরপরই ওত পেতে থাকা ছিনতাইকারীরা তাকে ঘিরে ধরে এবং তার ব্যাগ নিয়ে পালিয়ে যায়। ব্যাগে নগদ ৯ হাজার টাকা, তিনটি স্যামসাং গ্যালাক্সি স্মার্টফোন এবং জাতীয় পরিচয়পত্র, ডেবিট কার্ড ও মেট্রোপাসসহ গুরুত্বপূর্ণ নথি ছিল।
ভুক্তভোগীর ধারণা, ব্যাংকের বুথ থেকে টাকা তোলার পর থেকেই অপরাধীরা তাকে অনুসরণ করছিল। এই ঘটনায় ট্রাফিক পুলিশ সহযোগিতা করলেও সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশের ভূমিকা ছিল চরম হতাশাজনক। দিনের আলোতে চাপাতি ঠেকিয়ে ছিনতাই: এর দুই দিন আগে, ১১ মে বিকেলে মোহাম্মদপুরের চাঁন মিয়া হাউজিং এলাকায় জনসম্মুখে চলন্ত রিকশা থামিয়ে এক কলেজ শিক্ষার্থীর গতিরোধ করে একদল সশস্ত্র যুবক। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, মুহূর্তের মধ্যে চাপাতি ঠেকিয়ে ওই শিক্ষার্থীর কাছ থেকে আইফোন ১৭ প্রো ম্যাক্স, ইয়ারবাড ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেয়া হয়।
ভুক্তভোগীর বাবা নুরে আলম সিদ্দিকী জানান, অস্ত্রের মুখে ছিনতাই হলেও পুলিশ মামলা না নিয়ে শুধু মোবাইল হারানোর জিডি করেছে। ঘটনার পর থেকে এইচএসসি পরীক্ষার্থী ওই তরুণ মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে।
ছিনতাইকারীদের বর্তমান কৌশলের একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে ভোরের আলো ফোটার সময়টা। যখন দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ বাস বা ট্রেনে করে ঢাকায় নামেন, ঠিক তখনই থাবা বসাচ্ছে এই চক্রগুলো।
১ মে (ভোর): আগারগাঁও নির্বাচন কমিশন অফিসের সামনে গৃহবধূ শিল্পী বেগমকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে শাশুড়ির চিকিৎসার জন্য রাখা ২৫ হাজার টাকা ও দুটি মোবাইল ছিনিয়ে নেয়া হয়। ১ মে (রাত): মালিবাগ রেলগেটে তিন পোশাকশ্রমিককে ছুরিকাঘাত করা হয়। ছিনতাইকারীদের একজনকে জনতা আটকে ফেললে, চক্রের বাকি সদস্যরা দলবল নিয়ে এসে ছুরিকাঘাত করে তাদের সঙ্গীকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়। ৩০ এপ্রিল: শাহবাগ শিশুপার্কের সামনে এক দম্পতিকে ছুরিকাঘাত করে মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়া হয়।
অপরাধ চিত্র ও বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, বর্তমানে রাজধানীর মোহাম্মদপুর, আদাবর, যাত্রাবাড়ী, আগারগাঁও, মালিবাগ, শাহবাগ এবং বিভিন্ন রেলগেট সংলগ্ন এলাকাগুলো ছিনতাইয়ের হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। রাজধানীতে তিন ধরনের ছিনতাইকারী সক্রিয় রয়েছে— ১. পেশাদার সংঘবদ্ধ চক্র: এরা মূলত বড় গ্যাং বা সিন্ডিকেটের অংশ, ২. ভাসমান অপরাধী: মাদকের টাকার জোগাড় করতে এরা ছদ্মবেশে ছিনতাই করে। ৩. বখে যাওয়া তরুণ: পাড়া-মহল্লার কিশোর গ্যাং বা শখের বশে অপরাধে জড়ানো কিশোর-যুবক।
ডিএমপির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, অপরাধের ধরনের ওপর ভিত্তি করে পরিবহনের ব্যবহার দেখানো হলো— মোটরসাইকেল ব্যবহার করে (বাইক পার্টি) ৬৫%, সংঘবদ্ধ ৪/৫ জনের দল (ঘেরাও করে) ২০%, ছদ্মবেশ বা বিশেষ কৌশলে ১৫%। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে রাজধানীতে ছিনতাইয়ের ঘটনায় ৩০৮টি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জমা পড়ে।
অন্যদিকে, পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাব মতে, জানুয়ারি মাসে সারা দেশে ১৬৩টি এবং ফেব্রুয়ারিতে ১৩৭টি ছিনতাই ও দস্যুতার মামলা হয়েছে। তবে অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিসংখ্যান হলো হিমশৈলের চূড়ামাত্র। বাস্তব চিত্র এর চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। কারণ, পুলিশের অনাগ্রহ: মোহাম্মদপুরের ঘটনার মতোই, অস্ত্রের মুখে ছিনতাই হলেও পুলিশ অনেক সময় মামলার বদলে ‘মোবাইল হারিয়েছে’ মর্মে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করাতে বাধ্য করে, যাতে থানার ক্রাইম রেকর্ড কম দেখায়।
হয়রানির ভয়: আইনি জটিলতা ও আদালতে ঘোরার ভয়ে অনেক সাধারণ ভুক্তভোগী থানাই যান না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় মাসে রাজধানীর বিভিন্ন স্থান থেকে অন্তত ১,২০০ ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না।
ডিএমপির লালবাগ বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান জানান, চিহ্নিত স্পটগুলোতে টহল ও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। তবে ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম) মো. ফারুক হোসেন একটি বড় সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরে বলেন, ‘গত ছয় মাসে আমরা ১,২০০ অপরাধীকে ধরেছি। কিন্তু আইনি প্রক্রিয়ার দুর্বলতায় এরা খুব দ্রুত জামিনে বেরিয়ে আসে এবং কারাগার থেকে বের হয়েই আবার একই পুরোনো পেশায় অর্থাৎ ছিনতাইয়ে লিপ্ত হয়।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক এই পরিস্থিতির তীব্র সমালোচনা করে বলেন, ‘ছিনতাইয়ের প্রকৃত গভীরতা শুধু মামলার খতিয়ান দিয়ে বোঝা সম্ভব নয়। বর্তমানে রাজধানীতে পুলিশি টহলে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। বিশেষ করে গভীর রাত, ভোর এবং সন্ধ্যার সময়ে যখন অপরাধ সবচেয়ে বেশি ঘটে, তখন মাঠে পর্যাপ্ত ফোর্স দেখা যায় না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনেক পরিকল্পনাই মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়িত না হয়ে টেবিলকেন্দ্রিক থেকে যাচ্ছে।’
তিনি আরও যোগ করেন, আগে কেবল মাদকাসক্ত বা চরম অভাবগ্রস্ত ব্যক্তিরা এককভাবে চুরি-ছিনতাই করত। কিন্তু এখন এটি একটি সংঘবদ্ধ ও পেশাভিত্তিক লাভজনক অপরাধে রূপ নিয়েছে, যার পেছনে বড় রাজনৈতিক ও স্থানীয় সিন্ডিকেটের পৃষ্ঠপোষকতা রয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শুধু গ্রেপ্তার নয়, আইন সংশোধন করে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি। একই সুর মেলালেন মানবাধিকারকর্মী আবু আহমেদ ফয়জুল কবিরও। তিনি বলেন, দুর্বল নজরদারি ও বেকারত্বের কারণে এই ধারা বাড়ছে, যা রুখতে সিসিটিভি নজরদারি বাড়ানো ও কার্যকর কমিউনিটি পুলিশিং অত্যন্ত জরুরি।
রাজধানীতে ‘চাপাতি ঠেকানো’ সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারীদের এই বাড়বাড়ন্ত কেবল সাধারণ কোনো আইনশৃঙ্খলার অবনতি নয়, বরং এটি রাষ্ট্র ও প্রশাসনের নজরদারির দুর্বলতাকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। মেগাসিটির মানুষ যদি ট্যাক্স দিয়েও রাস্তায় নিরাপদে চলাচল করতে না পারেন, তবে সেই নগর উন্নয়ন অর্থহীন। ধরা পড়া ছিনতাইকারীরা কীভাবে বারবার জামিন পেয়ে পুনরায় রাস্তায় অস্ত্র হাতে নামার সাহস পাচ্ছে, সেই আইনি ফাঁকফোকরগুলো বন্ধ করা এখন সময়ের দাবি। পুলিশি টহলকে টেবিলের ফাইল থেকে বের করে ভোরের এবং রাতের ঢাকার রাজপথে দৃশ্যমান করতে হবে। যতক্ষণ না এই অপরাধী এবং তাদের পেছনে থাকা গডফাদারদের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে কঠোর শাস্তির মুখোমুখি করা যাচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত ঢাকাবাসীর এই ছিনতাই আতঙ্ক কাটবে না।









































