পলাশপুরে হত্যার পরও ধরাছোঁয়ার বাইরে হত্যাকারী মধু!
মে ১৭ ২০২৬, ০০:০১
১৬ মে সরেজমিনে বরিশাল সিটি করপোরেশনের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের পলাশপুর ৩, ৫ ও ৭ নম্বর গুচ্ছগ্রাম এলাকা ঘুরে উঠে এসেছে ভয়াবহ চিত্র। স্থানীয়দের ভাষায়, এটি এখন আর সাধারণ আবাসিক এলাকা নয়; বরং মাদক কারবারি, কিশোর গ্যাং ও চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের নিরাপদ ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে। বাসিন্দাদের অভিযোগ, বহুদিন ধরেই এসব কর্মকা- প্রকাশ্যে চললেও কার্যকর অভিযান বা স্থায়ী ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে।
স্থানীয়দের দাবি, হত্যাকা-ের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনৈতিক অঙ্গনে বিভ্রান্তিকরভাবে মধুকে বিএনপির কর্মী হিসেবে প্রচারের চেষ্টা চলছে। কিন্তু এলাকাবাসী, স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মী এমনকি প্রবীণ বাসিন্দারাও বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের ভাষ্যমতে, মধু দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাদের ছত্রছায়ায় এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করেছে। আওয়ামী লীগের সময় স্থানীয় অফিসকেন্দ্রিক বিভিন্ন কর্মকা-ে তার সক্রিয় উপস্থিতি ছিলো বলেও অভিযোগ করেন অনেকে। তবে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর সে ভোল পাল্টে ফেলে বিএনপি হয়ে যায়।
মোহাম্মদপুর এলাকার কয়েকজন প্রবীণ বাসিন্দা জানান, মধুর বাবা শওকত হোসেন বিএনপির সমর্থক হলেও ছেলের কর্মকা-ে অতিষ্ঠ হয়ে বহু আগেই সম্পর্ক ছিন্ন করেন। তারা বলেন, “বাবা রাজনীতি করলেও ছেলে সবসময় সন্ত্রাসী গ্রুপের সাথে চলাফেরা করেছে। এলাকায় চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা আর ভয়ভীতি দেখানোই ছিলো ওদের কাজ।”
স্থানীয় সূত্র জানায়, মধুর বিরুদ্ধে কাউনিয়া থানায় একাধিক লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছিল। অভিযোগগুলোর মধ্যে ছিলো মাদক ব্যবসা, কিশোর গ্যাং গঠন, চাঁদাবাজি ও এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি। এছাড়া পোর্ট রোড বাজারে চাঁদাবাজির মামলাও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তবে অভিযোগকারীদের দাবি, প্রতিবারই রহস্যজনক কারণে সে আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে আসে।
নিহত জসিম সিকদার বাবুর বিরুদ্ধেও অতীতে নানা অভিযোগ থাকলেও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, প্রায় ছয়মাস ধরে তিনি বাবার মাছের ব্যবসায় নিয়মিত যুক্ত হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করছিলেন। পোর্ট রোড মাছ বাজারের ব্যবসায়ী ও শ্রমিকরা জানান, “কালাম সিকদার বহু পুরনো মাছ ব্যবসায়ী। কিছুদিন ধরে বাবুও নিয়মিত বাজারে আসতো। আগের জীবন ছেড়ে সংসার আর ব্যবসা নিয়েই ব্যস্ত ছিলো।”
শুক্রবার সকালে বাবুর জানাজা শেষে গুচ্ছগ্রামে নেমে আসে শোকের ছায়া। নিহতের স্ত্রী নিশি বেগম দুই শিশু সন্তানকে বুকে জড়িয়ে বললেন, এই ছোট্ট শিশুদের আমি কিভাবে বুঝাবো যে ওদের বাবা আর নেই।
নিহত বাবুর ছেলে মাদ্রাসায় তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। আর ছোট মেয়ে একটু পরপর ছুটে এসে বাবা বাবা বলে ডাকে। স্বজনদের আহাজারিতে যেন ভারী হয়ে আছে পুরো এলাকা।
নিহতের বাবা কালাম সিকদার আতঙ্কিত কণ্ঠে অভিযোগ করেন, রাতে ঘরে ঘুমাতে ভয় হয়। মামলা তুলে নিতে রাত থেকেই বিভিন্ন ভাবে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। তার দাবি, হত্যাকা-ের পরের রাতেও মধুকে এলাকায় ঘোরাফেরা করতে দেখেছেন স্থানীয়রা।
পলাশপুর ৫ ও ৭ নম্বর গুচ্ছগ্রামের কয়েকজন বাসিন্দা জানান, বাবু ও মধু একসময় ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলো। বাবু মধুর কাছে টাকা পেতেন বলেও এলাকায় আলোচনা ছিলো। তবে সেই টাকার উৎস বা লেনদেনের প্রকৃতি নিয়ে কেউ স্পষ্ট কিছু বলতে পারেননি। অনেকের ধারণা, টাকার দ্বন্দ্ব থেকেই এই হত্যাকা-ের সূত্রপাত হতে পারে।
সরেজমিনে কথা হয় কয়েকজন বয়স্ক নারী-পুরুষের সাথে। তারা জানান, পুরো এলাকাজুড়ে মাদক ব্যবসা এখন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। অনেক ঘরেই প্রকাশ্যে মাদক কেনাবেচা হয়। তাদের অভিযোগ, “পুলিশ সব জানে। কারা ব্যবসা করে, কোথায় আড্ডা হয় সবই জানে পুলিশ । কিন্তু অভিযান হয় না। আবার হলেও কিছু নগদ টাকা ও ইয়াবা বা গাঁজা উদ্ধার হয়, মূলহোতা কেউই আটক হয়না কখনো।
৫ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সদস্য সচিব হানিফ হাওলাদার বলেন, “পলাশপুর এখন মাদক কারবারিদের স্বর্গরাজ্য। বরিশাল নগরীর বিভিন্ন এলাকায় যে মাদক যায়, তার বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ এই এলাকা থেকে হয়। আমার ৪২ বছরের রাজনৈতিক জীবনে বাবু বা মধু কাউকেই বিএনপির রাজনীতিতে দেখিনি। আওয়ামী লীগের সময় যারা স্থানীয় অফিসে খিচুড়ি পার্টি করতো, ওরাও সেই দলে ছিলো। মাদকের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় আমাকে জেল-জুলুম পর্যন্ত সহ্য করতে হয়েছে।”
মোহাম্মদপুর এলাকার বাসিন্দারাও একই ধরনের বক্তব্য দেন। তারা বলেন, “সন্ত্রাসী আর মাদক কারবারিদের কোনো রাজনৈতিক আদর্শ থাকে না। যারা ক্ষমতায় থাকে, এরা তাদের নাম ব্যবহার করে টিকে থাকে। বাবু কিছুটা স্বাভাবিক জীবনে ফিরছিলো। কিন্তু মধু এলাকায় নিজের বাহিনী গড়ে ভয়ংকর হয়ে উঠেছিল। হত্যাকা-ের পর থেকেই মধু আত্মগোপনে রয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয়রা। তার সহযোগীরাও এলাকা ছেড়েছে বলে দাবি অনেকের। তবে বাসিন্দাদের মধ্যে এখনো আতঙ্ক কাটেনি। সন্ধ্যার পর অনেক পরিবার সন্তানদের বাইরে যেতে দিচ্ছে না। কেউ কেউ বলছেন, “মধু ধরা না পড়া পর্যন্ত আমরা নিরাপদ নই।”
এ বিষয়ে কাউনিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সনজিত চন্দ্র নাথ বলেন, “তার বিরুদ্ধে আগেও কয়েকটি মামলা ছিলো। আমরা জানতাম সে খারাপ প্রকৃতির লোক। তবে গ্রেফতারের মতো পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ সবসময় পাওয়া যায়নি। বর্তমানে তাকে গ্রেফতারে গোয়েন্দা টিম কাজ করছে। খুব দ্রুত তাকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে বলে আশা করছি।”
তবে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ থাকার পরও কেন কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি? কেন মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের অভয়ারণ্যে পরিণত হওয়া পলাশপুরে প্রশাসনিক নজরদারি দৃশ্যমান হয়নি? জসিম সিকদার বাবুর নৃশংস হত্যাকা-ের পর সেই প্রশ্ন এখন আরও জোরালো হয়ে উঠেছে নগরজুড়ে।








































