দেশজুড়ে হামে স্বস্তির নিশ্বাস
মে ১৮ ২০২৬, ০০:৫০
সারাদেশে ছড়িয়ে পড়া তীব্র হামের সংক্রমণ ও তা থেকে সৃষ্ট মহামারি আতঙ্ক কাটিয়ে অবশেষে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলছে বাংলাদেশ। সরকারের সময়োপযোগী পদক্ষেপ এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দ্রুত ও সমন্বিত টিকাদান কার্যক্রমের ফলে মাঠপর্যায়ে এই ইতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
বিশেষ করে দেশের অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বা ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত ১৮টি জেলার ৩০টি উপজেলায় হামের সংক্রমণ এখন দৃশ্যমানভাবে নিম্নমুখী। বিগত এপ্রিল মাসেও যেসব এলাকায় প্রতিদিন শত শত শিশু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালের বেডে ছটফট করত, মে মাসের মাঝামাঝিতে এসে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচির সুবাদে সেই দৈনিক আক্রান্তের গ্রাফ নাটকীয়ভাবে একক অঙ্কে (সিঙ্গেল ডিজিট) নেমে এসেছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধিরা নিশ্চিত করেন যে, গত ৫ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া জরুরি গণটিকা ক্যাম্পেইনের আওতায় ৫ থেকে ৫৯ মাস বয়সি লাখ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় নিয়ে আসার কারণেই এই মরণঘাতী রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর ও পাবনাসহ উপদ্রুত জেলাগুলোর হাসপাতালগুলোয় কমছে রোগীর ভিড়, যা দীর্ঘদিনের অবরুদ্ধ উদ্বেগ কাটিয়ে সাধারণ অভিভাবকদের মনে স্বস্তি ও ভরসা ফিরিয়ে এনেছে। তবে ভাইরাসের বিরুদ্ধে শরীরে পূর্ণাঙ্গ অ্যান্টিবডি তৈরি হতে আরও কিছুটা সময় লাগবে বিধায় সংক্রমণ কমলেও জনসচেতনতা বজায় রাখার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। সব মিলিয়ে, একসময়ের চরম উদ্বেগ পেছনে ফেলে বাংলাদেশ এখন সম্পূর্ণ হামমুক্ত হওয়ার পথে ধাবিত হচ্ছে।
হামের টিকাদান কর্মসূচির এই অভাবনীয় অগ্রগতি ও বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ‘গত ৫ এপ্রিল আমরা দেশের ১৮টি জেলার ৩০টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ উপজেলাকে হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছিলাম। আমাদের স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরলস প্রচেষ্টায় বর্তমানে ওইসব এলাকায় হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা প্রায় নেই বললেই চলে। শুধু হটস্পট নয়, বর্তমানে দেশেরসার্বিক হাম পরিস্থিতি সম্পূর্ণ সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।’
এ বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধি ডা. চিরঞ্জিত দাস টিকার কার্যকারিতার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, ‘যেকোনো ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা শরীরে দৃশ্যমান হতে সাধারণত ২ থেকে ৩ সপ্তাহ সময় লাগে। আমাদের গাণিতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৫ এপ্রিল টিকাদান কার্যক্রম চালুর পর ঠিক দুই সপ্তাহ পর অর্থাৎ ১৭ এপ্রিল থেকে উপদ্রুত এলাকাগুলোয় রোগীর সংখ্যা নাটকীয়ভাবে কমতে শুরু করেছে। এই বৈজ্ঞানিক ফলাফলই প্রমাণ করে যে সরকারের এই গণটিকা কর্মসূচি কতটা সময়োপযোগী ও কার্যকর ছিল।’ একই ইতিবাচক প্রবণতা দেশের ৫টি বড় সিটি করপোরেশন এলাকায়ও দেখা যাচ্ছে বলে তিনি জানান।
প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার দেশের বর্তমান শিশুমৃত্যু হার নিয়ে কথা বলেছেন। তিনি জানান, সময়মতো টিকাদানের ফলে দেশে বর্তমানে হামজনিত কারণে শিশুমৃত্যুর হার সামগ্রিকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘টিকাদান কর্মসূচির পূর্ণাঙ্গ সুফল পুরোপুরি পেতে আমাদের আরও কয়েক সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হবে। কারণ ভ্যাকসিন নেয়ার পর শিশুদের শরীরে রোগ প্রতিরোধক ‘অ্যান্টিবডি’ তৈরি হতে সাধারণত ৩ থেকে ৪ সপ্তাহ সময় লাগে। তাই সংক্রমণ কমলেও অভিভাবকদের এখনো সচেতন থাকতে হবে।’
অনুরূপ সুর মেলালেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাসও। তিনি জানান, বিশেষ ক্যাম্পেইনের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক প্রচারণার কারণেই শিশুদের সংক্রমণ থেকে বাঁচানো সম্ভব হয়েছে।
দেশের ৩টি অন্যতম প্রধান আক্রান্ত জেলার মাঠপর্যায়ের সর্বশেষ ডেটা ও সিভিল সার্জনদের বক্তব্য বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো: চাঁপাইনবাবগঞ্জ: চলতি বছরের শুরুতে চাঁপাইনবাবগঞ্জে হামের পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও মার্চ ও এপ্রিলে তা ভয়াবহ আকার ধারণ করে। হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মশিউর রহমান ও সিভিল সার্জন ডা. এ কে এম শাহাব উদ্দীন জানান, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে যথাক্রমে মাত্র ২ ও ৫ জন রোগী ভর্তি হলেও মার্চে তা হু হু করে বাড়ে। এপ্রিল মাসে প্রতিদিন প্রায় ১০০ শিশু হাম নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ায় পরিস্থিতি মহামারির রূপ নেয়। তবে ৫ এপ্রিলের টিকার সুবাদে বর্তমানে এই সংখ্যা দিনে মাত্র ৮ থেকে ১০ জনে নেমে এসেছে। নাটোর: নাটোর সদর উপজেলায় বিশেষ টিকাদান কার্যক্রমের ফলে সাধারণ মানুষের মনে দীর্ঘদিনের আতঙ্ক কেটে স্বস্তি ফিরেছে।
নাটোরের সিভিল সার্জন ডা. মুহাম্মদ মশিউর রহমান জানান, সদর উপজেলায় তাদের লক্ষ্যমাত্রার শতভাগ শিশুকে সফলভাবে হাম-রুবেলার বিশেষ টিকা দেয়া সম্পন্ন হয়েছে। এর ফলে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা যেমন বেড়েছে, তেমনি বর্তমানে নাটোর জেলায় হামের উপসর্গ নিয়ে কোনো শিশুমৃত্যু বা বড় ধরনের শারীরিক জটিলতার খবর নেই। পাবনা: পাবনা জেলায়ও সংক্রমণের গ্রাফ ক্রমান্বয়ে নিচের দিকে নামছে।
পাবনার সিভিল সার্জন মো. আবুল কালাম আজাদ জানান, এখনো কিছু শিশু বিচ্ছিন্নভাবে হামে আক্রান্ত হচ্ছে সত্য, তবে সেই সংখ্যা আগের চেয়ে অনেক কম। মার্চ মাসেও যেখানে প্রতিদিন ১৯ থেকে ২১ জন হাম রোগী পাবনা জেলা সদর হাসপাতালে ছটফট করত, বর্তমানে বিশেষ টিকার প্রভাবে সেখানে প্রতিদিন গড়ে ৮ থেকে ১০ জন রোগী ভর্তি হচ্ছে, অর্থাৎ সংক্রমণ প্রায় অর্ধেক কমে গেছে।
আক্রান্ত কমছে, শনিবার হামে কোনো মৃত্যু নেই স্বাস্থ্যমন্ত্রী : দেশে হামের সংক্রমণ ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।
তিনি বলেন, গত শনিবার প্রথমবারের মতো নিশ্চিত হামে কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি, যা পরিস্থিতির উন্নতির একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত। গতকাল রোববার রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব) আয়োজিত ‘হাম ও ডেঙ্গু রোগ নিয়ন্ত্রণে জনসচেতনতা ও প্রতিরোধই সর্বোত্তম পন্থা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মন্ত্রী বলেন, বর্তমানে হামের আক্রান্তের হারও কমছে। এটি নিয়ন্ত্রণে রাখতে টিকাদান কর্মসূচি ও মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্য কার্যক্রম আরও জোরদার করা হয়েছে। শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, আগে ধারণা ছিল ছয় থেকে ৯ মাস বয়স পর্যন্ত শিশু মায়ের দুধের মাধ্যমে কিছুটা সুরক্ষা পায়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, অনেক শিশুই এই বয়সের মধ্যেই হাম আক্রান্ত হচ্ছে। এর প্রধান কারণ হিসেবে অপুষ্টি ও বুকের দুধ না পাওয়াকে উল্লেখ করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
তিনি বলেন, অনেক মা নিজেও অপুষ্টিতে ভুগছেন, ফলে শিশুর পর্যাপ্ত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হচ্ছে না। এমনকি জন্মের পর অনেক শিশু প্রয়োজনীয় শালদুধও পাচ্ছে না, যা রোগ প্রতিরোধে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হামের জটিলতা তুলে ধরে তিনি বলেন, অনেক শিশুই হাম থেকে সেরে উঠলেও পরে নিউমোনিয়া বা অন্যান্য সেকেন্ডারি ইনফেকশনে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করছে। তাই সময়মতো চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত জরুরি।
মন্ত্রী জানান, ২০২০ সালের পর দেশে নিয়মিত হাম টিকাদান কার্যক্রমে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছিল। এক পর্যায়ে টিকার সংকটও তৈরি হয়। পরে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ইউনিসেফ ও গ্যাভির সহায়তায় জরুরি ভিত্তিতে টিকা সংগ্রহ করা হয়। তিনি বলেন, ৪ এপ্রিল ১৮ জেলার ৩০টি উপজেলায় বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করা হয়। পরে চারটি সিটি করপোরেশনসহ সারাদেশে এ কার্যক্রম বিস্তৃত করা হয়েছে। বর্তমানে বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকা না পাওয়া শিশুদের শনাক্ত করে টিকাদান কার্যক্রম চলছে। অনুষ্ঠানে ড্যাবের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কেনান সভাপতিত্ব করেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংসদ সদস্য ডা. মো. আব্দুস সালাম এবং ড্যাবের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. ফরহাদ হালিম ডোনারসহ চিকিৎসক নেতারা।
হাম ও উপসর্গ নিয়ে আরও ৬ শিশুর মৃত্যু : দেশজুড়ে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে হাম রোগের সংক্রমণ। গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গে আরও ৬ শিশুর মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এর মধ্যে পরীক্ষায় নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়ে ১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে, আর হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে আরও ৫ শিশু।
গতকাল রোববার দুপুরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, গত একদিনে সারা দেশে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়েছে ২৪৩ শিশু। একই সময়ে সন্দেহজনক হামে আক্রান্ত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে আরও ১ হাজার ২৭৪ শিশু। এতে করে স্বাস্থ্য খাতে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গে মোট ৪৫৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে পরীক্ষায় নিশ্চিত হামে মৃত্যু হয়েছে ৭৫ শিশুর। বাকি ৩৮৪ শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হাসপাতালগুলোতে বিশেষ প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে। তবে সংক্রমণ ঠেকাতে পরিবার ও সমাজের সবাইকে আরও সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সর্বোপরি, ১৮টি জেলার ৩০টি হটস্পট উপজেলায় হামের সংক্রমণ কমে আসা বাংলাদেশের টিকাদান ও স্বাস্থ্য খাতের সক্ষমতার আরেকটি বড় জয়। সঠিক সময়ে ৫ থেকে ৫৯ মাস বয়সি শিশুদের চিহ্নিত করে টিকার আওতায় নিয়ে আসার যে সুফল, তা চাঁপাইনবাবগঞ্জ বা পাবনার হাসপাতালের খালি হওয়া বেডগুলোই প্রমাণ করছে। তবে সংক্রমণ কমে যাওয়ায় স্বাস্থ্য বিভাগ বা অভিভাবকদের আত্মতুষ্টিতে ভোগার কোনো সুযোগ নেই।
যেহেতু শরীরে পূর্ণাঙ্গ অ্যান্টিবডি তৈরি হতে আরও কিছুটা সময় লাগবে, তাই এখনো কোনো শিশুর শরীরে হামের লক্ষণ (যেমন তীব্র জ্বর, গায়ে লালচে র্যাশ, সর্দি) দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। এই সফল টিকাদান কর্মসূচির ধারাবাহিকতা বজায় রেখে দেশের বাকি এলাকাগুলোয়ও নিয়মিত টিকাদান সচল রাখলে বাংলাদেশ অচিরেই হামমুক্ত রাষ্ট্রে পরিণত হবে এটাই স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের প্রত্যাশা।









































