বরিশালে বাড়তি লোডশেডিং,গ্রাহকের মাথায় বাড়তি বিলের বোঝা
আগস্ট ০৪ ২০২৬, ০৩:৪৯
আরিফ হোসেন ॥ সকালে বিদ্যুৎ থাকলেও দুপুরের পর বিদ্যুৎ শুরু হয় লুকোচুরি খেলা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং। অথচ বিল আসে আগের তুলনায় দিগুণ বরিশাল নগরী সহ গোটা জেলার অধিকাংশ এলাকায় বিদ্যুৎ গ্রাহকদের এখন এই দুই যন্ত্রণা ভোগ করতে হচ্ছে। গরমের মধ্যে ঘন ঘন লোডশেডিং আর বাড়তি বিলের কারণে বিদ্যুৎ গ্রাহকদের অবস্থা এখন অনেকটা নাজুক।
অন্যদিকে অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়া বিদ্যুৎ বিল—এই দুই সংকটে দেশের সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তির মধ্যে পড়েছেন। জুলাই মাসে হাতে পাওয়া জুনের বিদ্যুৎ বিল নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিদ্যুৎ অফিস এবং গ্রাহকদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
একই ধরনের বিদ্যুৎ ব্যবহার থাকা সত্ত্বেও অনেক গ্রাহকের বিল এক মাসের ব্যবধানে ২০ শতাংশ থেকে শুরু করে দুই, তিন, এমনকি চার গুণ পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
গ্রাহকদের দাবি, সামান্য ইউনিট বৃদ্ধি দেখিয়েই অনেককে উচ্চতর স্ল্যাবে ফেলে অতিরিক্ত বিল আদায় করা হচ্ছে। আবার অনেকেই অভিযোগ করছেন, প্রকৃত ব্যবহারের তুলনায় বেশি ইউনিট দেখিয়ে বিল প্রস্তুত করা হয়েছে। তবে বিদ্যুৎ বিভাগের দাবি, নতুন ট্যারিফ কার্যকর হওয়া এবং গ্রীষ্মকালে বিদ্যুতের ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেক গ্রাহক উচ্চতর স্ল্যাবে চলে যাওয়ায় বিল বেড়েছে।
বরিশালের এক গ্রাহকের হাতে থাকা মে ও জুন মাসের দুটি বিদ্যুৎ বিল পর্যালোচনায় দেখা যায়, মে মাসে বিদ্যুৎ ব্যবহার দেখানো হয়েছে ১৮০ ইউনিট, আর জুনে ২৪৫ ইউনিট। মাত্র ৬৫ ইউনিট বেশি ব্যবহারের বিপরীতে মোট বিল বেড়েছে প্রায় ৬৮২ টাকা। সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের প্রশ্ন, প্রকৃত ব্যবহারের সঙ্গে এই অতিরিক্ত ইউনিটের হিসাব কীভাবে মিলছে?
এ ধরনের অভিযোগ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকেও পাওয়া যাচ্ছে। সাংবাদিক ও অ্যাক্টিভিস্ট আনিস ইউ খান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, জুন মাসের বিদ্যুৎ বিলে অতিরিক্ত চার্জ যেন প্রতি বছরের নিয়মিত ঘটনা। তার দাবি, বিদ্যুৎ চুরি ও সিস্টেম লস নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার দায় নিয়মিত বিল পরিশোধকারী গ্রাহকদের ওপর চাপানো হচ্ছে। নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি জানান, তার ভবনের কমন বিদ্যুতের বিল এক মাসে ১৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৫৬ হাজার টাকায় পৌঁছেছে। ব্যক্তিগত ফ্ল্যাটের বিলও প্রায় ২০ শতাংশ বেশি এসেছে। তার প্রশ্ন, “যে বিদ্যুৎ ব্যবহার করিনি, তার বিল কেন দেব?”
বিদ্যুৎ বিভাগ অবশ্য বলছে, জুন মাস থেকে কার্যকর হওয়া নতুন ট্যারিফ এবং অতিরিক্ত গরমের কারণে বিদ্যুতের ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেক গ্রাহকের বিল বেড়েছে। বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এবং বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব মিরানা মাহরুখ জানিয়েছেন, অধিকাংশ বিল বৃদ্ধি নতুন ট্যারিফ ও বেশি ব্যবহারের ফল। তবে কিছু ক্ষেত্রে করণিক ভুল হয়েছে, যা যাচাই করে সংশোধন করা হচ্ছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানিয়েছেন তারা।
উচ্চতর স্ল্যাব পদ্ধতি নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন রয়েছে। নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করলেই পরবর্তী স্ল্যাবের বেশি ইউনিট মূল্য কার্যকর হওয়ায় অল্প ব্যবহারের অতিরিক্ত বৃদ্ধিতেও মোট বিল অনেক বেড়ে যায়। জ্বালানি খাতের বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক ট্যারিফ পুনর্বিন্যাসের ফলে মধ্যম আয়ের গ্রাহকদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক গ্রাহক অভিযোগ করেছেন, যথাযথ মিটার রিডিং ছাড়াই অতিরিক্ত ইউনিট যোগ করে বিল তৈরি করা হয়েছে। আবার দীর্ঘ সময় লোডশেডিং চলার পরও বিদ্যুৎ ব্যবহার অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন তারা।
ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ওজোপাডিকো) বরিশালের নির্বাহী প্রকৌশলী মঞ্জুর কুমার স্বর্ণকার বলেন, “কোনো অতিরিক্ত বিল করা হয়নি। মিটারে যে পরিমাণ ইউনিট রেকর্ড হয়েছে, সে অনুযায়ীই বিল প্রস্তুত করা হয়েছে।” তিনি আরও জানান, বরিশালে আপাতত প্রিপেইড মিটার চালুর কোনো পরিকল্পনা নেই।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর জনসংযোগ কর্মকর্তা আরিফ সাদিক বলেন, অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল নিয়ে অনেক অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে সরকার ব্যাখ্যা দিয়েছে এবং নির্দিষ্ট অভিযোগের সমাধানসংক্রান্ত আরও একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে।
তিনি বলেন, উচ্চতর স্ল্যাব নতুন নয়; এটি আগে থেকেই কার্যকর রয়েছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে বায়ু বিদ্যুৎ, বায়োগ্যাস ও সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে বিদ্যুৎ খাতে স্বনির্ভরতা অর্জনের পরিকল্পনার কথাও জানান।
তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, যখন একই সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে একই ধরনের অভিযোগ আসে, তখন কেবল “ব্যবহার বেড়েছে” ব্যাখ্যায় বিতর্কের অবসান হয় না।
তারা মিটার রিডিং, বিল প্রস্তুতের সফটওয়্যার, সিস্টেম লস এবং ওভার বিলিংয়ের অভিযোগ স্বাধীনভাবে নিরীক্ষা করে প্রকৃত তথ্য প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র প্রকাশ করা গেলে যেমন ভোক্তাদের আস্থা ফিরবে, তেমনি বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার জবাবদিহিতাও নিশ্চিত হবে।







































