ফের নতুন করে বিরোধ প্রকাশ্যে বরিশাল বিএনপিতে

জুলাই ২৭ ২০২৬, ০৩:৫৬

বরিশাল সদর উপজেলা বিএনপির সদ্য ঘোষিত পূর্ণাঙ্গ কমিটি নিয়ে সংগঠনটির ভেতরে দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছে। আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের পদ দেওয়া, মৃত ব্যক্তি, শয্যাশায়ী ও প্রবাসীদের অন্তর্ভুক্তি এবং কমিটি গঠনে সাংগঠনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করার অভিযোগ কেন্দ্র করে দলটির অভ্যন্তরীণ বিরোধ নতুন করে প্রকাশ্যে এসেছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে বরিশাল বিএনপির দীর্ঘদিনের গ্রুপিংও আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় নেতারা।

জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে গ্রুপিং ভুলে বরিশাল বিএনপির নেতারা একমঞ্চে উঠেছিলেন। তখন দাবি করা হয়েছিল, বিবদমান গ্রুপগুলো ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে সেই গ্রুপিং আবারও চাঙ্গা হয়েছে বলে নেতারা দাবি করছেন। তাদের অভিযোগ, দলীয় বিভক্তির সুযোগে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সক্রিয় নেতাকর্মীরা বিএনপিতে প্রবেশ করছেন।

এর মধ্যেই নবগঠিত কমিটির একাংশের নেতাদের কাছ থেকে ফুল গ্রহণ করেছেন বরিশাল সদর আসনের সংসদ সদস্য মজিবর রহমান সরোয়ার। বিরোধী পক্ষের নেতাদের দাবি, এ ঘটনাই বরিশাল বিএনপির গ্রুপিংকে প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে।

স্থানীয় নেতাদের অভিযোগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা ছাড়াই নিজের একক সিদ্ধান্তে সদর উপজেলা বিএনপির পূর্ণাঙ্গ কমিটি অনুমোদনের ব্যবস্থা করেন সংসদ সদস্য মজিবর রহমান সরোয়ার। যদিও তিনি এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন চলাকালে কেন্দ্রীয় বিএনপি বরিশাল সদর উপজেলা বিএনপির তিন সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করে। পরে গত ১২ জুলাই সাবেক জামায়াত নেতা নুরুল ইসলামকে আহ্বায়ক, সাইফুল ইসলাম আব্বাসকে সদস্য সচিব এবং সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুস সালাম রাঢ়ীকে সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক করে ১৬১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয়।

কমিটি ঘোষণার পর থেকেই বিতর্ক শুরু হয়। আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের বিএনপির কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করার অভিযোগ তুলে সংবাদ সম্মেলন করা হয়। একই সঙ্গে নতুন কমিটির বিরুদ্ধে ঝাড়ু মিছিলও অনুষ্ঠিত হয়।

নবগঠিত সদর উপজেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুস সালাম রাঢ়ী এবং সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক জিয়াউর ইসলাম সাবু অভিযোগ করেন, আহ্বায়ক কমিটির অন্য নেতাদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ বা পরামর্শ ছাড়াই আহ্বায়ক নুরুল ইসলাম পূর্ণাঙ্গ কমিটির তালিকা কেন্দ্রে পাঠিয়েছেন।

তাদের দাবি, কমিটির ২২ নম্বর সদস্য চন্দ্রমোহন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সিরাজুল হক মাস্টার, ৬১ নম্বর সদস্য হুমায়ুন কবির বাদল ঢালি, ৮৮ নম্বর সদস্য মো. জাহাঙ্গীর হোসেন, ১০২ নম্বর সদস্য মো. সাহাবুদ্দিন স্বপন এবং ১৩৪ নম্বর সদস্য ক্যাপ্টেন অব. আলাউদ্দিন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন। আওয়ামী লীগের শাসনামলে সংসদ ও উপজেলা নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের পক্ষে প্রকাশ্যে কাজ করেছেন তারা।

আরও অভিযোগ করা হয়েছে, কমিটির ১১ নম্বর যুগ্ম আহ্বায়ক মো. ওবায়দুল করিম তুহিন এসআর সমাজকল্যাণ সংস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত। এ সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা সালাউদ্দিন রিপন। আওয়ামী লীগের আমলে তিনি রেল দুর্নীতির অন্যতম হোতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশাল সদর আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পেয়ে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে সালাউদ্দিন রিপনের চাচা আব্দুল মালেক মাস্টারের পক্ষেও প্রকাশ্যে প্রচারণা চালিয়েছিলেন তুহিন বলে অভিযোগ রয়েছে।

পদবঞ্চিত ও অবমূল্যায়নের শিকার নেতাদের অভিযোগ, কমিটির ৬০ নম্বর সদস্য মিরাজ বেপারি এবং ৯৮ নম্বর সদস্য গিয়াস উদ্দিন ফকির বর্তমানে প্রবাসে রয়েছেন। নিয়মের বাইরে গিয়ে অর্থের প্রভাব এবং উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে নিজের অবস্থান শক্ত রাখতে তাদের সদস্য করা হয়েছে। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, কমিটির ১০৭ নম্বর পদ পাওয়া মিজানুর রহমান আয়নাল বেপারি দীর্ঘদিন আগে মারা গেছেন।

এ ছাড়া প্রায় আট বছর ধরে অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী থাকা ডা. মো. ফরিদ উদ্দিন তালুকদারকে ১৮ নম্বর সদস্য করা হয়েছে। নুরুল ইসলামকে নিয়েও গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন দলের একাংশের নেতারা। তাদের দাবি, তিনি একসময় জামায়াতে ইসলামীর বিতর্কিত নেতা ছিলেন। পরে বিএনপিতে যোগ দিলেও এখনো জামায়াতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতা করছেন।

এর মাধ্যমে তিনি গোপনে জামায়াতের আদর্শ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ করেন তারা। জানা গেছে, ২০২২ সালেও নুরুল ইসলামকে আহ্বায়ক করে সদর উপজেলা বিএনপির কমিটি গঠন করা হয়েছিল। সেই কমিটি নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হলে কেন্দ্রীয় তদন্ত ও সাংগঠনিক সিদ্ধান্তে বরিশাল দক্ষিণ জেলা বিএনপির কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। পরে নতুন নেতৃত্বের মাধ্যমে আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হলেও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন চলাকালে সংসদ সদস্য মজিবর রহমান সরোয়ারের সুপারিশে আবারও নুরুল ইসলামকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের কমিটি ঘোষণা করা হয়। অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে নুরুল ইসলামের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সাড়া পাওয়া যায়নি।

বরিশাল দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট আবুল কালাম শাহীন বলেন, ‘এ কমিটি সম্বন্ধে আমি বা আমাদের জেলা কমিটি কিছুই জানি না। নিয়ম থাকলেও উপজেলা কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে আমাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা ও অনুমোদন নেওয়া হয়নি। কেন্দ্র থেকে সরাসরি কমিটি করে দিয়েছে।’

বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির বরিশাল বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও বিসিসির প্রশাসক অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন বলেন, ‘এ কমিটি সরোয়ার ভাইয়ের মতামতের ভিত্তিতে হয়েছে। অভিভাবক হিসেবে তার দায়িত্ব ছিল সবাইকে নিয়ে বসে কমিটি করা। সাংগঠনিক প্রক্রিয়ার ভেতরে থেকে কমিটিটা হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু বিতর্কের মধ্যেই দেখলাম সেই কমিটির নেতাদের ফুল নিয়েছেন তিনি। আমি আশা করব বিষয়টি যেন সাংগঠনিক প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকে।’

তবে বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও বরিশাল সদর আসনের সংসদ সদস্য মজিবর রহমান সরোয়ার দাবি করেন, তিনি কমিটি গঠনের বিষয়ে অবগত ছিলেন না। তিনি বলেন, ‘কমিটিতে ত্রুটি থাকতে পারে। তবে এ কমিটির বিষয়ে আমি কিছুই জানি না।

এমনকি কমিটিতে কারা এসেছে, তাও ভালোভাবে দেখিনি। ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে আমারও ঘনিষ্ঠ লোক আছে। তারা বিষয়টি আমাকে জানাতে পারত বা মানববন্ধন, প্রতিবাদ সভা করতে পারত। আমি সমাধান করতে পারতাম। কিন্তু তারা ঝাড়ু মিছিল করেছে। এটা ঠিক হয়নি। মনে হচ্ছে তারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে করেছে।’

বরিশাল বিএনপিতে গ্রুপিং থাকার কথা স্বীকার করে সরোয়ার বলেন, সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন থাকায় নেতাকর্মীদের মধ্যে মতবিরোধ ও প্রতিযোগিতা রয়েছে। একজন আরেকজনকে হেয় করার জন্য এমন কর্মকাণ্ড হতে পারে। সৃষ্ট বিতর্কের বিষয়ে এখন কেন্দ্র সিদ্ধান্ত নেবে।

স্থানীয় নেতাদের ভাষ্য, বরিশাল জেলা ও মহানগর বিএনপি কয়েকটি অংশে বিভক্ত। এর মধ্যে বর্তমান ও সাবেক নেতাদের বড় দুটি অংশের নেতৃত্ব দিচ্ছেন সংসদ সদস্য মজিবর রহমান সরোয়ার। আরেকটি অংশের নেতৃত্বে রয়েছেন বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন। কেন্দ্রীয় বিএনপির সহসাংগঠনিক সম্পাদক আকন কুদ্দুসুর রহমান ও মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব জিয়াউদ্দিন সিকদার একটি অংশের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

এ ছাড়া মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান খান ফারুক, ১ নম্বর যুগ্ম আহ্বায়ক আফরোজা খানম নাসরীন এবং সাবেক সদস্য সচিব মীর জাহিদুল কবির জাহিদ পৃথক অংশের নেতৃত্বে রয়েছেন। তৃণমূলের নেতাদের মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে এই গ্রুপিং আরও জটিল হয়ে উঠছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন....

আমাদের ফেসবুক পাতা

আজকের আবহাওয়া


এক্সক্লুসিভ আরও