নামে মিল নয়,তার পরেও আসামী!
মার্চ ৩১ ২০২৬, ১৯:৩১
তারেক হোসেন ॥ শুধু নামের সাথে আংশিক অংশের মিল রয়েছে। তাই এক দিনমজুর নির্দোষ হলেও পুলিশ এক পিজিআইডি মামলা দুই ব্যক্তিকে আসামি বানানোর চেষ্টা করেন! বরিশাল কোতয়ালী থানায় দায়ের করার জিআর ৯৪৩/২১ (১চঠ৩৭) মামলার একই পিজিআইডি (১৭ঐঝই) তে দেখা গেছে দুই নামের দুই ব্যক্তিকে আসামী করা হয়েছে।
তবে সচেতন মহলে প্রশ্ন জেগেছে একটি মামলার দুইটি এফআইআর কি ভাবে হয়। দুই আসামীর কাছে রয়েছে দুই ধরনের দুইটি কাগজ। তবে বরিশালে ঘটে যাওয়া এমনই এক চাঞ্চল্যকর ঘটনার অনুসন্ধানে উঠে এসেছে পুলিশের দায়িত্ব পালনে গুরুতর গাফিলতির অভিযোগ।
বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের পানি শাখার পাম্প অপারেটর মো. নিলয় পারভেজ (রুবেল)-কে একটি ফৌজদারী মামলায় আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা ঘিরে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, শুধুমাত্র নামের আংশিক মিলের কারণে তাকে মামলায় জড়ানোর হয়েছে। যা পরবর্তীতে বাংলাদেশ পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের আইজিপি (সিকিউরিটি সেল) এর তদন্ত টিমের তদন্তে বেড়িয়ে আসলো মূল রহস্য।
কীভাবে শুরু হয় বিতর্ক ॥
একটি সূত্র জানিয়েছেন, একটি চলমান ফৌজদারী মামলার তদন্তের সময় প্রকৃত আসামিকে শনাক্ত করতে গিয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত তদন্তকারী কর্মকর্তা বরিশাল মেট্টোপলিটন পুলিশের কর্মরত এসআই মো. শহিদুল ইসলাম তিনি আসামীর নামের সাথে অন্য এক ব্যাক্তির নামের আংশিক অংশ মিল থাকায় তথ্য যাচাই না করেই নিলয় পারভেজ (রুবেল)-কে আসামী হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করেন পুলিশের এসআই সহিদুল।
যদিও চাকরিজীবি মো. নিলয় পারভেজ (রুবেল) কে যে মামলায় অন্তভূক্ত করা হয়েছে। সেই মামলার ঘটনার সাথে এবং উক্ত মামলার চিহ্নিত আসামীর সাথে মো. নিলয় পারভেজ (রুবেল) এর কোন সম্পর্ক নেই বলে সেটা প্রাথমিক তদন্তেই বেড়িয়ে এসেছে। মো. নিলয় পারভেজ (রুবেল) এর বিরুদ্ধে কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায়নি এখন পর্যন্ত।
অপরাধ না করেও কি ভাবে মামলার আসামী হয়েছেন ঘটনাটি নিয়ে মো. নিলয় পারভেজ (রুবেল) প্রতিবাদ শুরু করলে সামনে বেড়িয়ে আসে আরো চাঞ্চল্যকর তথ্য।
নিজেকে নির্দোষ দাবি করে নিলয় পারভেজ (রুবেল) বিষয়টি নিয়ে সরব হলে মামলার নথি ও তথ্যাদি পুনরায় যাচাইয়ের দাবি ওঠে। এরপরই প্রকাশ পেতে থাকে একাধিক অসঙ্গতি।
দেখা যায়, মামলার প্রকৃত আসামির পরিচয়, ঠিকানা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের সঙ্গে নিলয় পারভেজের কোনো মিল নেই। পরে ভুক্তভোগী মো. নিলয় পারভেজ (রুবেল) বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনের উচ্চ পর্যায়ে অভিযোগ করেন।
বাংলাদেশ পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের আইজিপি (সিকিউরিটি সেল)-এর কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। একইসঙ্গে প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরেও অভিযোগের অনুলিপি পাঠানো হয়।
অভিযোগে তিনি দাবি করেন, তদন্ত প্রক্রিয়ায় গুরুতর অবহেলা এবং দায়িত্বে গাফিলতির মাধ্যমে তাকে ষড়যন্ত্র করে পরিকল্পিত ভাবে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই শহিদুল ইসলাম হয়রানি করেছেন। যা বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তরের উদ্যোগে শুরু হওয়া তদন্তে প্রাথমিক পর্যায়েই অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায় বলে একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র এবং ভুক্তভোগী নিলয় পারভেজ (রুবেল) প্রতিবেদকে নিশ্চিত করেছেন।
তদন্তে স্পষ্ট হয়, মামলার আসামির সঙ্গে নিলয় পারভেজ (রুবেল)-এর নাম সাথে একটি শব্দ শুধু মিল রয়েছে। তা ছাড়া অন্য কোনো তথ্যগত মিল নেই। ফলে তাকে আসামি করার কোনো আইনগত ভিত্তি ছিল না।
এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মো. শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রুজু করা হয়েছে। মামলার নম্বর ৪১/২০২২ এবং প্রসিডিং নম্বর ০৫-২২/৫৪৪০। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, তদন্তে প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে আরও কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রশ্নবিদ্ধ তদন্ত প্রক্রিয়া ॥ আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধুমাত্র নামের মিলের ভিত্তিতে কাউকে আসামি করা আইন ও মানবাধিকারের পরিপন্থী। এ ধরনের ঘটনা বিচার ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট করতে পারে। তারা মনে করেন, তদন্ত প্রক্রিয়ায় আরও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।
ভুক্তভোগীর প্রত্যাশা ॥ নিলয় পারভেজ (রুবেল) বলেন,“আমি নির্দোষ হয়েও একটি মামলায় আমাকে কেন জড়ালো পুলিশের এস আই শহিদুল। উক্ত বিষয়টি নিয়ে আমি ও আমার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। শুধু তাই নয় সমাজে মানুষের কাছে আমি এখন অপরাধী হিসেবে পরিচিত হয়েছি। আমার পরিবার এখনও আতঙ্কে রয়েছে ঘটনাটি নিয়ে।
সঠিক তদন্তের মাধ্যমে সত্য প্রকাশ পাওয়ায় আমি স্বস্তি পেলেও সমাজের মানুষ কি সেটা বুঝবে? এখন আমি চাই, প্রকৃত আসামিকে গ্রেফতার করা হোক এবং ভবিষ্যতে যেন কেউ এ ধরনের ভোগান্তির শিকার না হয়।” সে ব্যাপারে উক্ত মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এস আই শহিদুল ইসলাম এর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহন করা হোক।
স্থানীয় কয়েক জন ব্যাক্তিদের বক্তব্য ॥ আমাদের এলাকার ছেলে নিলয় পারভেজ (রুবেল) এর নামের সাথে নাকি অন্য এক ছেলে পারভেজ হাওলাদার নামে এক প্রতারক ও মাদক বিক্রেতার নামের সাথে শুধু মিল রয়েছে নামের একটি অংশ পারভেজ।
তাতেই আমাদের এলাকার নিরহ দিন খেটে খাওয়া নিলয় পারভেজ (রুবেল) নামে যুবকে পুলিশ মামলার আসামী হিসেবে আর্šÍভুক্ত করতে পারভেজ হওলাদারকে বানিয়েছেন নিলয় পারভেজ (রুবেল)। যা সম্পূর্ন আলাদা দুই ব্যাক্তি। যাদের কেউ কাকে চিনে না।
ভুক্তভোগী নিলয় পারভেজ (রুবেল) এর বন্ধু চাঁদমারী এলাকার ব্যবসায়ী হাসান বলেন, শুনেছি রুবেলকে পুলিশ একটি মিথ্যা মামলায় আসামী করেছে। তবে যে মামলায় রুবেলকে আসামী করা হয়েছে সেই মামলার মূল আসামী পারভেজ হাওলাদারকে জীবনেও দেখেনি নিলয় পারভেজ রুবেল। শুধু তাই নয় তাদের জন্মদাতা পিতা-মাতার নামের সাথে এবং ঠিকানা ও বয়সের সাথে কোন ধরনের মিল নেই। আমার প্রশ্ন-যেখানে দুই ব্যক্তি পুরো আলাদা আলাদা বংশের এবং নাম ভিন্ন। কিন্তু সেখানে পুলিশ তাকে আসামী করলো। এটা কিভাবে সম্ভব, তা আমরা বুঝে উঠতে পারছিনা।
তবে এই ধরনের কর্মকান্ড যদি পুলিশ করে থাকে তাহলে মানুষ আর পুলিশের প্রতি আস্তা রাখবেন না। তবে উক্ত ঘটনাটি নিয়ে বেশ কিছু দিন ধরে নগরজুরে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে।
প্রতিবাদেই ফাঁস রহস্য ॥ ঘটনাটি সামনে আসে তখনই, যখন নিলয় পারভেজ (রুবেল) নিজেকে নির্দোষ দাবি করে প্রতিবাদ শুরু করেন। তিনি মামলার নথিপত্র যাচাইয়ের দাবি জানালে একে একে বেরিয়ে আসে অসঙ্গতি। অনুসন্ধানে দেখা যায়, মামলার প্রকৃত আসামির পরিচয়, ঠিকানা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। শুধুমাত্র নামের আংশিক মিলকে ভিত্তি করে তাকে সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হয়েছিল।
উচ্চ পর্যায়ে অভিযোগ, নড়ে চড়ে বসে কর্তৃপক্ষ ॥
ভুক্তভোগী ন্যায়বিচারের আশায় বাংলাদেশ পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের আইজিপি (সিকিউরিটি সেল)-এর কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। এর পরেই সংশ্লি দপ্তর শুরু করেন অভ্যন্তরীণ তদন্ত। তবে তদন্তেই মিললো সত্যতা। তদন্তের শুরুতেই অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া যায় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এতে নিশ্চিত হয়, মামলার আসামির সঙ্গে নিলয় পারভেজ (রুবেল)-এর নাম একটি অংশ মিল ছাড়া অন্য কোনো তথ্যের মিল নেই।
তবে দেখা গেছে যে মামলাটি নিয়ে এতো ঘটনা। সেই মামলায় অভিযুক্ত তদন্তকারী কর্মকর্তা এস আই শহিদুল ইসলাম আদালতে উক্ত মামলার জবানবন্দি লিখিবার ধারায় তিনি বলে গেছেন, পারভেজ এর বিরুদ্ধে পিসিপিআরএ ৭ টি মামলা রয়েছে। তবে নিলয় পারভেজ রুবেলের নামে এর বিরুদ্ধে কোন মামলা নেই। চার্জশীটে ভুল বর্শত নাম দেওয়া হয়েছে। এর কারনে আমার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়েছে।
এসআই’র বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা ॥ ঘটনার পর তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মো. শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রুজু করা হয়েছে। মামলার নম্বর ৪১/২০২২ এবং প্রসিডিং নম্বর ০৫-২২/৫৪৪০। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
আইন বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা ॥ আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র নামের মিলের ভিত্তিতে কাউকে আসামি করা গুরুতর অবহেলা এবং আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এ ধরনের ঘটনা বিচার ব্যবস্থার প্রতি জনসাধারণের আস্থা ক্ষুণ্ন করতে পারে।
“আমি নির্দোষ, তবু আসামি! ভুক্তভোগী নিলয় পারভেজ (রুবেল) বলেন, “আমি কোনো অপরাধ করিনি। তবুও আমাকে মামলায় জড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে। সঠিক তদন্তে সত্য প্রকাশ পেয়েছে—এটাই আমার স্বস্তি। আমি চাই, প্রকৃত অপরাধীকে গ্রেফতার করা হোক।”
চলমান তদন্ত, নজরে পুরো ঘটনা ॥ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিষয়টি এখনও তদন্তাধীন এবং প্রমাণের ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এই প্রতিবেদনটির তথ্য ভুক্তভোগীর অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট সূত্র এবং প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে অভিযুক্ত মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মো. শহিদুল ইসলামের সাথে উক্ত বিষয়টি নিয়ে কথা হলে তিনি বলেন, পারভেজ হাওলাদার ও নিলয় পারভেজ রুবেল একই ব্যক্তি। এবং নিলয় পারভেজ রুবেল এর বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। তার ফুপু নিলয় পারভেজ রুবেল ও তার বাবার নামে তারই জমিজমা বিরোধী নিয়ে মারামারির ঘটনায় একটি মামলা করেছেন। সেই মামলার তদন্তর দায়িত্বভার দেওয়া হয় আমাকে।
তবে যে মামলার কাগজের নিয়ে তিনি বলছেন পারভেজ হাওলাদার তিনি নয়, অন্য কোন ব্যক্তি, এটা সম্পূর্ন মিথ্যা। ওই মামলার পারভেজ হাওলাদারই হলো নিলয় পারভেজ। মূলত ঘটনা হচ্ছে মামলার তদন্ত শেষে থানায় বসে রির্পোট লেখার সময়, কম্পিউটার ভুল করেছে। যেমন অন্য মামলার কপির মধ্যে এডিট করে এই মামলার রিপোর্ট লেখার সময় ভুলে কম্পউটার অপারেটর পিজিআইডি (১৭ঐঝই) পরিবর্তন করে ভুলে গেছেন।
এর জন্য সমস্যাটি হয়েছে। এর জন্য আমার অনেক জবাবহিদি দিতে হয়েছে। এবং কি আমার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলাও হয়েছে। পরে বিষয়টি আমার সিনিয়র কর্মকর্তা বুঝতে পারেছে। যে এটা ভুলের কারনে হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, এই বিষয়টি তো অনেক আগেই আদালতে বসে সমাধান হয়েছে। এখন তো আর এটা নিয়ে কোন সমস্যা হওয়ার কথা নয়।
বরিশাল
৩১-০৩-২৬








































