দাপট বাড়ছে সন্ত্রাস-চাঁদাবাজির

মার্চ ০৬ ২০২৬, ০২:১৬

সামপ্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজ চক্র। রাজধানী থেকে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম প্রায় সর্বত্রই চাঁদার দাবিতে হামলা, গুলি, ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপানো এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের মতো একের পর এক ঘটনা সামনে আসছে। এসব ঘটনায় ব্যবসায়ী, দোকান কর্মচারী ও সাধারণ মানুষ আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইতোমধ্যে দেশব্যাপী সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের একটি তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। তালিকা প্রস্তুত শেষ হলে শিগগিরই বিশেষ সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করা হবে। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে অপরাধীদের ক্ষেত্রে কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব বিবেচনা না করে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

রাজধানীতে চাঁদাবাজদের তৎপরতা বৃদ্ধি : ঢাকার বিভিন্ন এলাকায়ও চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্য বাড়ছে বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে মোহাম্মদপুর, আদাবর, বসিলা ও আশপাশের এলাকায় ব্যবসায়ী এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

ভুক্তভোগীরা বলছেন, কিছু সন্ত্রাসী দল নিয়মিত বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, দোকান ও কারখানায় গিয়ে চাঁদা দাবি করছে। কেউ টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে মারধর, হামলা কিংবা ভয়ভীতি দেখানোর মতো ঘটনা ঘটছে। মোহাম্মদপুর এলাকায় সমপ্রতি এক সমন্বয়কের ওপর হামলার ঘটনায় আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বোরকা পরে আসা এক ব্যক্তি ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাকে কোপায়। পরে আহত ব্যক্তি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।

ভুক্তভোগী বলেন, “লোকটি বোরকা পরে ছিল। কী ঘটছে বুঝে ওঠার আগেই আমাকে কোপানো হয়। এরপর আর কিছু মনে নেই, আমি অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলাম।”

এই ঘটনায় একটি শীর্ষসন্ত্রাসী চক্রের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়রা বলছেন, নির্বাচনের পর থেকেই এলাকায় অপরাধীদের তৎপরতা কিছুটা বেড়েছে।

চট্টগ্রামের ঘটনায় দেশজুড়ে আলোড়ন

সমপ্রতি চট্টগ্রামে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা নতুন করে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাস নিয়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কোটি টাকা চাঁদা না পাওয়ায় এক ব্যবসায়ীর বাসায় একাধিক দফা গুলি চালানো হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। ওই ব্যবসায়ী পুলিশি নিরাপত্তার মধ্যেই ছিলেন, তবু সন্ত্রাসীরা সাহস করে তার বাসার সামনে গুলি চালায় যা অনেককে বিস্মিত করেছে।

ঘটনার পর থেকেই চট্টগ্রামসহ সারা দেশে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। ব্যবসায়ী মহল বলছে, এই ধরনের ঘটনা শুধু একজন ব্যবসায়ীর ওপর হামলা নয়; বরং এটি পুরো ব্যবসায়ী সমাজের জন্য ভয়াবহ বার্তা। একজন ব্যবসায়ী নেতা বলেন, “যখন পুলিশ পাহারায় থাকা একজন ব্যবসায়ীও নিরাপদ থাকেন না, তখন সাধারণ ব্যবসায়ীরা কীভাবে নিরাপদ থাকবেন- এই প্রশ্নটাই এখন সবচেয়ে বড়।”

চাঁদা না দিলে হামলা : রাজধানীর আদাবর এলাকায় গত ২১ ফেব্রুয়ারি ঘটে যাওয়া একটি ঘটনাওআতঙ্ক বাড়িয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, চাঁদা না পাওয়ায় একটি এমব্রয়ডারি কারখানায় ঢুকে ১০ থেকে ১২ জন সন্ত্রাসী তিন কর্মচারীকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে জখম করে। আহতদের স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হয়। ঘটনার পর এলাকাবাসীর মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়।

এছাড়া বসিলার সিটি হাউজিং এলাকায় আরেকটি ঘটনায় চাঁদা না পেয়ে এক দোকান কর্মচারীকে ইলেকট্রিক শক দেয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পুলিশ বলছে, ওই ঘটনার প্রধান অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে ভুক্তভোগীরা বলছেন, মূল হুমকি এখনও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

একজন ভুক্তভোগী বলেন, “আমরা ভয় নিয়ে চলাফেরা করছি। যারা হামলা করেছে তারা পুরোপুরি ধরা পড়েনি। কখন কোথায় আবার সামনে পড়ে যায়্তএই ভয় সব সময় কাজ করে।”

সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ : এসব ঘটনায় শুধু ব্যবসায়ীরাই নন, সাধারণ মানুষও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। বিশেষ করে পরিবার নিয়ে বসবাসকারী মানুষজন নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছেন।

একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “পরিস্থিতি সত্যিই ভয়ংকর মনে হচ্ছে। ছেলে-মেয়ে নিয়ে শান্তিতে থাকতে চাই। কিন্তু এখন মনে হয় সব সময় সতর্ক থাকতে হচ্ছে।”

আরেকজন বলেন, “রাস্তাঘাটে চলাফেরা করতে গেলেও ভয় লাগে। কখন কোথায় কী হয় বলা যায় না।”

পুলিশের তথ্য: তিন হাজার অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী : পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সারাদেশে প্রায় তিন হাজার অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীর সক্রিয় উপস্থিতি রয়েছে। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকায় রয়েছে ৪০১ জন সন্ত্রাসী। তাদের মধ্যে অন্তত ১৫ জনকে ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। চট্টগ্রাম রয়েছে দ্বিতীয় অবস্থানে, যেখানে প্রায় ৩৩০ জন অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীর সক্রিয়তার তথ্য রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, এসব তথ্যের ভিত্তিতেই এখন একটি হালনাগাদ তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে।

সরকারের কঠোর নির্দেশ : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি জানান, সারাদেশে সক্রিয় সন্ত্রাসীদের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। তালিকা প্রস্তুত শেষ হলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মন্ত্রী বলেন, “যে-ই অপরাধে জড়িত থাকুক, তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। কোনো প্রভাব বা পরিচয় বিবেচনা করা হবে না।”

ডিএমপির তথ্য সংগ্রহ অভিযান : রাজধানীতে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) ইতোমধ্যে বিভিন্ন এলাকায় তথ্য সংগ্রহ শুরু করেছে। মার্কেট, কাঁচাবাজার, ঘাট, ফুটপাত এবং ভাসমান দোকান সব জায়গায় চাঁদাবাজি সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন মো. নজরুল ইসলাম বলেন, “কারা চাঁদা তুলছে, কারা এর পেছনে আছে এবং কারা তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করছে সব তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। তালিকা প্রস্তুত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।”

তিনি আরও জানান, পুলিশের নিজস্ব গোয়েন্দা ইউনিট ছাড়াও অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থাও এই কাজে যুক্ত রয়েছে।

গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সমন্বিত তৎপরতা : চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাস দমনে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বিত কার্যক্রম শুরু হয়েছে। পুলিশের বিশেষ ইউনিট ছাড়াও ডিজিএফআই, এনএসআইসহ বিভিন্ন সংস্থা তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের কাজ করছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে বড় ধরনের একটি অভিযান পরিচালনা করা হতে পারে।

রাজনৈতিক আশ্রয়ের অভিযোগ : অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের শক্তির অন্যতম বড় উৎস হলো রাজনৈতিক আশ্রয়। সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া না থাকলে এই ধরনের অপরাধ অনেকাংশে কমে আসতে পারে।

তিনি বলেন, “চাঁদাবাজি ও জোরপূর্বক অপরাধ অনেক সময় রাজনৈতিক আশ্রয়ে টিকে থাকে। যদি এই আশ্রয় বন্ধ করা যায়, তাহলে পরিস্থিতি অনেকটাই উন্নত হতে পারে।”

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহি জরুরি : বিশ্লেষকরা আরও বলছেন, শুধু সন্ত্রাসীদের ধরলেই সমস্যার সমাধান হবে না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যেও যদি কেউ এসব অপরাধে জড়িত থাকে, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে।

ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন, অনেক সময় অভিযোগ জানালেও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। তাদের মতে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে অপরাধ দমন আরও কার্যকর হবে।

ব্যবসায়ী মহলের দাবি : ব্যবসায়ীরা বলছেন, চাঁদাবাজি বন্ধ না হলে ব্যবসা পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়বে। অনেক ছোট ব্যবসায়ী ইতোমধ্যে ব্যবসা বন্ধ করার কথাও ভাবছেন বলে জানা গেছে।

একজন ব্যবসায়ী বলেন, “চাঁদা দিতে থাকলে ব্যবসা করা সম্ভব না। আবার না দিলে হামলার ভয়। এই পরিস্থিতিতে আমরা কী করব বুঝতে পারছি না।”

সামনে কঠিন পরীক্ষা : বিশ্লেষকদের মতে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা এখন সরকারের জন্য একটি পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে নির্বাচনের পর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, অন্যদিকে মাঠপর্যায়ে সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি দমন এই দুই চ্যালেঞ্জ একসঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে। তারা মনে করেন, দ্রুত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়া গেলে সাধারণ মানুষের আস্থা বাড়বে।

সর্বোপরি, দেশের মানুষ এখন শান্তিপূর্ণ পরিবেশে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে চায়। তারা চায় নিরাপদ ব্যবসা, নিরাপদ রাস্তা এবং আইনশৃঙ্খলার দৃশ্যমান উপস্থিতি। অনেকের মতে, যদি সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কঠোর ব্যবস্থা নেয়া যায়, তাহলে পরিস্থিতি আবার স্বাভাবিক হয়ে উঠবে।

অন্যথায়, এই আতঙ্ক দীর্ঘস্থায়ী হয়ে উঠতে পারে। সার্বিকভাবে বলা যায়, সামপ্রতিক ঘটনাগুলো নতুন করে সতর্কবার্তা দিচ্ছে। এখন দেখার বিষয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিকল্পিত অভিযান কতটা দ্রুত এবং কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়। কারণ সাধারণ মানুষের একটাই প্রত্যাশা সন্ত্রাসমুক্ত, নিরাপদ একটি সমাজ।

সংবাদটি শেয়ার করুন....

আমাদের ফেসবুক পাতা

আজকের আবহাওয়া

পুরাতন সংবাদ খুঁজুন

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১৩১৫
১৬১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭
৩০৩১  

এক্সক্লুসিভ আরও