ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নজিরবিহীন সামরিক অভিযানের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের অস্থিরতার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। ইরানের হরমুজ প্রণালি দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের তেলের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পরিবহন করা হয়। মার্কিন-ইসরায়েলের হামলার পর হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল রয়েছে। গতকাল রোববার তাৎক্ষণিকভাবে তেলের দাম ব্যারেলে ২০ শতাংশ বেড়ে ৮০ ডলারে ঠেকেছে। এ কারণে তেলসহ বৈশ্বিক পণ্য সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে নতুন করে বহুমাত্রিক ঝুঁকির ইঙ্গিত দিচ্ছে। বাংলাদেশে জ্বালানি খাতে আমদানিনির্ভর হওয়ায় তেলের দাম বাড়ার প্রভাব পড়বে। তেলের দাম বৃদ্ধির নানামুখী প্রভাবে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধিসহ দেশের রপ্তানি খাতেও পড়বে। তাছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে প্রবাসী আয় ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ, বাংলাদেশের বিদেশের শ্রমবাজার মূলত উপসাগরীয় দেশনির্ভর।
বাংলাদেশ এমন বাস্তবতায় পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে দূরবর্তী যুদ্ধও দেশীয় বাজার, বাজেট ব্যবস্থাপনা ও বৈদেশিক মুদ্রার ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বন্ধ, লোহিত সাগর ঘিরে নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং তেলের দামের ঊর্ধ্বগতি—সব মিলিয়ে নীতিনির্ধারকদের সামনে এক উচ্চসতর্কতামূলক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে জ্বালানি সংকট, রেমিট্যান্স প্রবাহ ও মূল্যস্ফীতিতে চাপ বাড়বে বলে ব্যবসায়ী, অর্থনীতির বিশ্লেষকসহ সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা।
এই বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, ‘সংঘাত যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় তবে বাংলাদেশ ঝুঁকিতে পড়বে। আর এই সংঘাত যদি এক মাস বা তার কম সময়ের মধ্যে থেমে যায় তাহলে বাংলাদেশ খুব একটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।’ তবে এই কর্মকর্তার ধারণা সংঘাত দীঘস্থায়ী হবে না।
মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে হরমুজ প্রণালি—পারস্য উপসাগরে যাওয়ার একমাত্র সামুদ্রিক প্রবেশপথ। এক পাশে ইরান, অন্য পাশে ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত; এই সরু জলপথ পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ—প্রতিদিন আনুমানিক ২ কোটি ব্যারেল—এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসও এ প্রণালী হয়ে যায়। তাই প্রণালীতে সামান্য ঝুঁকির আভাসই আন্তর্জাতিক বাজারে তাৎক্ষণিক দামের প্রতিক্রিয়া তৈরি করে যার প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের সরবরাহ চ্যানেলে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার প্রেক্ষাপটে ইরানের আধাসরকারি তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানায়, প্রণালি দিয়ে কোনো জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না—এমন বার্তা সংশ্লিষ্ট এলাকায় থাকা জাহাজগুলো ভেরি হাই ফ্রিকোয়েন্সি বেতারতরঙ্গে পাচ্ছে বলে উল্লেখ করা হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের এক নৌ কর্মকর্তার বরাতে রয়টার্সও অনুরূপ তথ্য প্রকাশ করেছে। যদিও ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে নির্দেশ জারির বিষয়টি নিশ্চিত করেনি, তবে বহু বছর ধরে হামলার প্রতিশোধ হিসেবে প্রণালি বন্ধের হুমকি দিয়ে আসছিল তেহরান। এ প্রেক্ষাপটে জাহাজ চলাচল সীমিত বা বন্ধের ঘোষণার ঝুঁকি বাস্তব—এমন আশঙ্কাই এখন বাজারে প্রাধান্য পাচ্ছে।
বাংলাদেশে জ্বালানি আমদানির সমন্বয় করে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে সংস্থাটির আমদানি ব্যয় বেড়ে যায়। তখন দুটি পথ সামনে থাকে, ভোক্তা পর্যায়ে মূল্য সমন্বয় অথবা ভর্তুকি বাড়িয়ে মূল্য স্থিতিশীল রাখা। উভয় ক্ষেত্রেই অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হয়। মূল্য বাড়লে পরিবহন, কৃষি ও শিল্প—সবখানে বৃদ্ধির চাপ তৈরি হয়। আর ভর্তুকি বাড়লে বাজেটে অতিরিক্ত বোঝা পড়ে, রাজস্ব ঘাটতি বাড়ে ও উন্নয়ন ব্যয়ে কমবেশি করার প্রয়োজন দেখা দেয়।
তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) আন্তর্জাতিক দাম বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ে। বিদ্যুতের দাম সমন্বয় করা হলে শিল্প উৎপাদনের ব্যয় বাড়ে; আর দাম স্থির রাখলে ভর্তুকির চাপ বাড়ে। ফলে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা জ্বালানিসম্পর্কিত ভর্তুকি ও বাজেট ব্যবস্থাপনায় অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হলে তেলের দাম বৃদ্ধি, এলপিজি পরিবহনে জটিলতা এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন— সব মিলিয়ে দেশের জ্বালানি খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মন্তব্য করেন ডেল্টা এলপিজির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক। তিনি জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, কার্যকর জ্বালানি নিরাপত্তা পরিকল্পনার অভাবে বাংলাদেশ এখন প্রায় পুরোপুরি আমদানিনির্ভর হয়ে পড়েছে। ‘যুদ্ধ চলতে থাকলে আমরা ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে পড়ব’ বলে সতর্ক করেন তিনি।
জ্বালানি খাতের এই ব্যবসায়ী আরও বলেন, গত দুই দশক ধরে দেশে উল্লেখযোগ্য নতুন গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়ন বা বৃহৎ পরিসরে গ্যাস উত্তোলনের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন না বাড়ায় আমদানিনির্ভরতা ক্রমেই গভীর হয়েছে। বৈশ্বিক অস্থিরতার ধাক্কা থেকে জ্বালানি খাতকে সুরক্ষিত রাখতে হলে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান এবং উত্তোলন জোরদার করার বিকল্প নেই।
বাংলাদেশের আমদানি–রপ্তানির সিংহভাগ সমুদ্রপথে হয়। দেশের প্রধান বন্দর চট্টগ্রাম বন্দর থেকে কনটেইনার হ্যান্ডলিং ও জ্বালানি আমদানির বড় অংশ পরিচালিত হয়। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রগামী পণ্যের প্রধান নৌপথ সুয়েজ খাল যা মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার প্রভাববলয়ের মধ্যে আছে। লোহিত সাগর ঘিরে হুতি হামলার কারণে ইতোমধ্যে ওই রুটে ঝুঁকি বেড়েছে বলে জানান বাংলাদেশ কনটেইনার শিপিং অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান হারুন-উর-রশিদ। তিনি জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ হলে পণ্য পরিবহনে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে। যদি রাশিয়া ও চীন এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে তাহলে বৈশ্বিক বাণিজ্য আরও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
নৌপথে ঝুঁকি বাড়লে জাহাজভাড়া ও যুদ্ধঝুঁকি বিমার প্রিমিয়াম বেড়ে যায়। জাহাজগুলো আফ্রিকার ‘কেপ অব গুড হোপ’ ঘুরে বা বিকল্প দীর্ঘ রুটে চলতে বাধ্য হয়। ফলে ট্রানজিট সময় ও ব্যয় বাড়ে। তুলা, রাসায়নিক, ভোজ্যতেল, গমের মতো আমদানির কাঁচামাল যথাসময়ে না এলে শিল্প উৎপাদনে বিঘ্ন ঘটে। এর মারাত্মক প্রভাব পড়ে রপ্তানিমুখী শিল্পে। একদিকে যেমন পণ্যের দাম বেড়ে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয় অন্যদিকে রপ্তানিতে শিপমেন্ট বিলম্ব আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা ক্ষুণ্ণ করতে পারে।
বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, বাংলাদেশ একটি রপ্তানিনির্ভর দেশ। তাই যুদ্ধের প্রভাব মোকাবিলা করতে হবে, বিশেষ করে পোশাক রপ্তানিকারকদের। যুদ্ধের কারণে ভোক্তা সক্ষমতা কমে গেলে পোশাকের মতো পণ্যে ব্যয় কমতে পারে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে উৎপাদন ব্যয়ও বাড়বে। তাছাড়া ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য পাঠাতে বিকল্প নৌপথ বেছে নিতে হলে সামগ্রিক বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
ইউক্রেন যুদ্ধের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ব্যবসায়ীরা শুরুতে ভেবেছিলেন যুদ্ধ দ্রুত শেষ হবে; কিন্তু চার বছর ধরে তা চলমান। ফলে যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সংঘাত দীর্ঘমেয়াদি হলে কুয়েত, ইরাক, ইরান, বাহরাইন, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের রপ্তানি বাজারগুলো প্রভাবিত হতে পারে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ ইরানের প্রায় ৬৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাজারে প্রায় ১০ দশমিক ৯ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে যার বেশিরভাগ পোশাক ও ওষুধ পণ্য। অঙ্কটি মোট রপ্তানির তুলনায় ছোট হলেও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা আঞ্চলিক বাজারে আস্থা ও লেনদেনে সতর্কতা বাড়ায়, যার পরোক্ষ প্রভাব বড় বাজারেও পড়তে পারে।
বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার বড় উৎস প্রবাসী আয়, বিশেষ করে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, ওমান, কুয়েত ও বাহরাইনে কর্মরত শ্রমিকদের পাঠানো অর্থ। সংঘাত তীব্র হলে তিন ঝুঁকি সামনে আসে—কর্মসংস্থান অনিশ্চয়তা, লেনদেন ব্যয় ও সময় বৃদ্ধি এবং বিমান চলাচলে বিঘ্ন। নির্মাণ ও সেবা খাতে প্রকল্প বিলম্বিত হলে প্রকল্পভিত্তিক কর্মীদের আয় কমতে পারে; চুক্তি নবায়ন বিলম্বিত হওয়ার ঝুঁকিও থাকে। তবে তেলের দাম বাড়লে উপসাগরীয় দেশগুলোর রাজস্বও বাড়ে যা সরকারি ব্যয় ও অবকাঠামো প্রকল্পে ব্যবহৃত হলে শ্রমবাজার স্থিতিশীল থাকতে পারে। ফলে রেমিট্যান্সের প্রভাব একরৈখিক নয়; সংঘাতের মেয়াদ ও তেলের দামের গতিপথ নির্ধারণ করবে চূড়ান্ত ফলাফল।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ বলেন, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় প্রভাব পড়তে পারে। তার মতে, মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশের প্রধান আমদানি উৎস হওয়ায় জ্বালানির দাম ও সরবরাহ অস্থিতিশীল হতে পারে; এতে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য ও রিজার্ভে চাপ বাড়বে। সুয়েজ খাল-নির্ভর নৌপথে প্রভাব পড়লে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি পরিবহন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
জ্বালানি দামের ঊর্ধ্বগতি পরিবহন ব্যয় বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি তৈরি করে। ভোজ্যতেল ও খাদ্যশস্য আমদানিনির্ভর হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে স্থানীয় বাজারেও প্রভাব পড়ে। আমদানি বিল বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা বৃদ্ধি পায় যা বিনিময় হার চাপে পড়তে পারে। একই সময়ে জ্বালানি ভর্তুকি বাড়লে বাজেট ঘাটতি বাড়ে—উন্নয়ন ব্যয় ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজন দেখা দেয়।
বাংলাদেশ কনটেইনার শিপিং অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান হারুন-উর-রশিদ সংক্ষেপে বলেন, ‘বাংলাদেশ আমদানিনির্ভর দেশ হওয়ায় সবসময় ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার শিকার হয়।’








































