গণতন্ত্রের রক্ষাকবচ: সুষ্ঠু নির্বাচনের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর মহাপরিকল্পনা রণকৌশল
ফেব্রুয়ারি ০২ ২০২৬, ১৮:৪৫
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিতে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো এক ঐতিহাসিক ও চ্যালেঞ্জিং দায়িত্ব পালন করছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এটিই দেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচন, যেখানে জনআকাঙ্ক্ষা ও আন্তর্জাতিক মহলের তীক্ষ্ণ নজর রয়েছে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেবল একটি ভোট নয়, বরং বাংলাদেশের নতুন গণতান্ত্রিক যাত্রার এক অগ্নিপরীক্ষা। এ পরীক্ষায় সফল হতে নির্বাচন কমিশন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক নজিরবিহীন নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেছে। প্রায় ৯ লাখ সদস্যের বিশাল এ বাহিনীগুলোর মূল লক্ষ্য ভোটারদের মনে নির্ভয়ে ভোট দেওয়ার সাহস জোগানো এবং যেকোনো ধরনের অপশক্তি বা ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দেওয়া।
নির্বাচন কমিশনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এবার মোট ৮ লাখ ৯৭ হাজার ১১৭ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মাঠে থাকছেন। এর মধ্যে আনসার ও ভিডিপি প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার যারা ভোটকেন্দ্রের মূল পাহারাদার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। পুলিশ থাকছে ১ লাখ ৫০ হাজার যারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও ভ্রাম্যমাণ দল হিসেবে কাজ করবেন। সশস্ত্র বাহিনী তথা সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী থাকছে প্রায় ১ লাখ যারা বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তার অধীনে কাজ করবে।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বা বিজিবি থাকছে ৩৫ হাজার থেকে ৩৭ হাজার যা ১ হাজার ১৫১ প্লাটুনেরও বেশি। র্যাব ও কোস্ট গার্ড থাকছে আট হাজার থেকে দশ হাজার সদস্য। এ বিশাল বাহিনী ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পূর্ণ শক্তিতে মাঠে থাকবে। তবে সেনাবাহিনীর ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে কার্যকর থাকবে।
২০২৪ সালের প্রেক্ষাপটের পর এবারের নির্বাচনে সেনাবাহিনীর ভূমিকা সবচেয়ে বেশি আলোচিত। সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা এবং নাগরিকবান্ধব আচরণ বজায় রাখতে হবে।
সেনাবাহিনী মূলত স্ট্রাইকিং ফোর্স বা বিশেষ আঘাতকারী দল হিসেবে কাজ করবে। তবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় তারা নিয়মিত টহল বা শক্তির মহড়া দেবে যাতে কোনো দুষ্কৃতকারী বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির সাহস না পায়। কমিশন কর্মকর্তাদের বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে যাতে তারা তাৎক্ষণিকভাবে অপরাধ দমন করতে পারেন। পুলিশ মূলত সরাসরি জনসম্পৃক্ততার কাজ করবে। ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা, ব্যালট পেপার পাহারা এবং নির্বাচনের আগের রাতে কোনো ধরনের সহিংসতা রোধে তারা কাজ করবে।
র্যাব তাদের ড্রোন প্রযুক্তি ও বিশেষ টহল দলের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো নজরদারিতে রাখবে। বিজিবি সীমান্ত এলাকা ছাড়াও সমতলের ৪৮৯টি উপজেলায় মোতায়েন করা হয়েছে।
বিজিবি মহাপরিচালক জানিয়েছেন, তারা ৩০০ সংসদীয় আসনেই মোবাইল এবং স্ট্যাটিক ফোর্স বা স্থাণীয় বাহিনী হিসেবে থাকবে। বিশেষ করে চরাঞ্চল ও দুর্গম এলাকায় তাদের বিচরণ হবে নিবিড়।
এবারের নির্বাচনে কারচুপি ও সহিংসতা ঠেকাতে কিছু নতুন কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রগুলোতে পুলিশ ও আনসার সদস্যদের শরীরে বডি ওউন ক্যামেরা বা শরীরে পরিহিত ক্যামেরা থাকবে। এছাড়া র্যাব ৪১৮টি ড্রোন ব্যবহার করে আকাশ থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি ল অ্যান্ড অর্ডার কোর্ডিনেশন সেল বা আইনশৃঙ্খলা সমন্বয় কেন্দ্র গঠন করা হয়েছে, যেখান থেকে সরাসরি প্রতিটি কেন্দ্রের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা হবে। দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখতে ৬৪ জেলার পুলিশ সুপার বা এসপি এবং ওসিদের লটারির মাধ্যমে বদলি করা হয়েছে, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য পদক্ষেপ। অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেইজ-২ অভিযান দ্বিতীয় ধাপের মাধ্যমে দেশজুড়ে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে চিরুনি অভিযান চালানো হচ্ছে।
সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে প্রতিটি বাহিনীর সদস্যদের জন্য সরকারের তরফ থেকে কঠোর কিছু নীতিমালা দেওয়া হয়েছে। কোনো দল বা প্রার্থীর প্রতি বিন্দুমাত্র পক্ষপাত দেখালে সরাসরি বরখাস্ত ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। উসকানিমূলক পরিস্থিতিতেও সর্বোচ্চ ধৈর্য প্রদর্শন করতে হবে, যাতে সাধারণ ভোটাররা আতঙ্কিত না হন।
সোশ্যাল মিডিয়ায় গুজব ছড়িয়ে নির্বাচন ভণ্ডুল করার চেষ্টা করা হলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে বিটিআরসি ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ২৪ ঘণ্টা সক্রিয় থাকবে। গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও দেশীয় কুচক্রী মহল এ নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা করতে পারে। বিশেষ করে আইইডি বা উন্নত বিস্ফোরক হামলা বা আকস্মিক বিক্ষোভের ঝুঁকি রয়েছে। এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় বিজিবি ও র্যাবকে মক এক্সারসাইজ বা মহড়ার মাধ্যমে প্রস্তুত করা হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো এখন কেবল আদেশ পালনকারী সংস্থা নয়, তারা এখন গণতন্ত্রের অতন্দ্র প্রহরী। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার ভাষ্যমতে, এবারের নির্বাচনে ব্যালট ছিনতাই বা অনিয়ম করার কোনো সুযোগ নেই। যদি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো তাদের পেশাদারিত্ব ও শপথ রক্ষা করতে পারে, তবে ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ হবে বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম উজ্জ্বল একটি দিন।
১৬ কোটি মানুষের নজর এখন উর্দিধারী এ সাহসী সন্তানদের দিকে, যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষের ভোটাধিকার রক্ষা করতে মাঠে নেমেছেন।









































