জামায়াত-এনসিপি জোট, নয়া সমীকরণ

জানুয়ারি ১৪ ২০২৬, ১৮:৪৭

জামায়াত ও এনসিপির নির্বাচনী সমঝোতা নিয়ে বুদ্ধিজীবী পাড়ায় এখন নানা আলোচনা ও সমালোচনা চলছে। এই সমঝোতার মাধ্যমে একটি সম্ভাবনাময়ী উদীয়মান দলের আশু লাভ-ক্ষতির চুলচেরা বিশ্লেষণ করছেন তাঁরা। বিশেষ করে মধ্যমপন্থী রাজনীতির কথা বলে একটি ডানপন্থী দলের সঙ্গে এনসিপির জোটকে দলের একটি অংশ ভালোভাবে গ্রহণ করছে না। ইতোমধ্যে দল থেকে অনেকের পদত্যাগের ঘোষণাও আসতে দেখা গেছে।

রাজনীতির দ্বিমেরুকরণের বাইরে গিয়ে তরুণদের নেতৃত্বে একটি তৃতীয় শক্তির উত্থানের আশা করেছিলেন অনেকেই। কিন্তু জামায়াত-এনসিপি এবং বিএনপি-গণঅধিকার পরিষদ জোটের ফলে সেই আশায় ইতোমধ্যে ভাটা পড়েছে। অধিকাংশ বুদ্ধিজীবী মনে করেন, এই নির্বাচনী সমঝোতা তৃতীয় শক্তির উত্থানকে সংকটে ফেলবে। এর ফলে তৃতীয় শক্তির বদলে বিএনপি ও জামায়াতই অতিরিক্ত সুবিধা পাবে বলে অনেকে ধারণা করছেন।

তৃণমূল পর্যন্ত অত্যন্ত সংগঠিত ও শক্তিশালী ডানপন্থী দল জামায়াতের সাথে জোটের ফলে এনসিপির প্রতিশ্রুত মধ্যমপন্থার রাজনীতি হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন কেউ কেউ। তাঁদের মতে, এনসিপির রাজনীতি জামায়াতের ডানপন্থী আদর্শের গহ্বরে বিলীন হতে পারে। অন্যদিকে এনসিপির অসংগঠিত তৃণমূল ও নির্বাচনী অনভিজ্ঞতার দরুন জোটবদ্ধ হয়ে ক্ষমতার শরিক হওয়াকে দল গোছানোর উত্তম প্রয়াস হিসেবে দেখছেন এনসিপির একটি বড় অংশ। যার ফলে তাঁরা গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সিদ্ধান্ত নিয়ে নির্বাচনী সমঝোতার দিকেই এগোচ্ছেন।

জোটসঙ্গী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে এনসিপির অনেক শীর্ষ নেতৃত্ব মনে করেন, জামায়াতের শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো থাকায় নির্বাচনী আসনে এনসিপি প্রার্থীরা বিএনপির তুলনায় জামায়াত থেকেই সর্বোচ্চ সহযোগিতা পাবেন। সম্প্রতি জামায়াত-এনসিপি জোট ঘোষণার পর এনসিপির জন্য ছেড়ে দেওয়া আসনে পূর্বঘোষিত জামায়াত প্রার্থীরা প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে জোট মনোনীত প্রার্থীকে সাদরে গ্রহণ করার মাধ্যমে এক অভূতপূর্ব নজির স্থাপন করেছেন।

অন্যদিকে বিএনপির জোটসঙ্গীদের ছেড়ে দেওয়া আসনগুলোতে বিশৃঙ্খলা ও বিদ্রোহী প্রার্থী দাঁড়ানোর মতো ঘটনা ঘটছে, যার ফলে বিএনপি ইতোমধ্যে কয়েকজনকে বহিষ্কারও করেছে। পূর্ব অনুমিত এই আশঙ্কা থেকেই এনসিপি মূলত জামায়াতকে বেছে নিয়েছে। তবে এনসিপি, গণঅধিকার পরিষদ, এবি পার্টিসহ অন্যান্য মধ্যমপন্থীদের সমন্বয়ে তৃতীয় শক্তি গঠিত হলে তারা তরুণ ও বাম-মধ্যমপন্থীদের একটি বড় অংশের ভোট পেত।

নির্বাচনী সমঝোতার ফলে সেই পুরোনো মেরুকরণে থিতু হওয়ায় বাম-মধ্যমপন্থী ভোটগুলো বিএনপির ঘরে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এক্ষেত্রে জামায়াত-এনসিপি জোটে বিএনপিও যে পরোক্ষভাবে উপকৃত হয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সংশ্লিষ্টদের মতে, জুলাই সনদের বাস্তবায়ন ও রাষ্ট্রীয় সংস্কারের প্রশ্নে বিপ্লবের সুফল হিসেবে এই জোট সংগঠিত হয়েছে। জোটের অন্যতম লক্ষ্য হলো এই বিপ্লবের রাজনৈতিক সুফল ঘরে তোলা এবং ভোটের মাঠে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করা।

জোটসঙ্গী বাছাইয়ের প্রশ্নে এনসিপির কেন্দ্রীয় সদস্য ইয়াহিয়া জিসান বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় আমরা জামায়াতের জোটে গিয়েছি। আমাদের কাছে তিনটি বিকল্প ছিল বিএনপির সাথে জোট, জামায়াতের সাথে জোট অথবা স্বতন্ত্র থাকা। দলের অধিকাংশ কেন্দ্রীয় সদস্য জোটের পক্ষে ছিলেন। সেক্ষেত্রে আমাদের জামায়াত বা বিএনপির জোটেই যেতে হতো। বিচার, সংস্কার, ভারতীয় আধিপত্যবিরোধিতা এবং সার্বভৌমত্বের প্রশ্নটি আমরা জোট করার ক্ষেত্রে প্রাধান্য দিয়েছি।

তিনি আরও জানান যে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটকেই এই প্রশ্নগুলোর ক্ষেত্রে বেশি অনুকূল মনে হয়েছে। এ কারণেই কেন্দ্রীয় সদস্যদের দুই-তৃতীয়াংশের মতামতের ভিত্তিতে এনসিপি জামায়াতের জোটে যেতে সম্মত হয়েছে। তবে সাধারণ ভোটারদের মাঝে এই জোট নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। কেউ কেউ মনে করছেন ভোটের মাঠে ঐক্যবদ্ধ শক্তি হিসেবে তাঁরা প্রভাব ফেলতে পারবেন, আবার কেউ কেউ এনসিপির জামায়াতে বিলীন হওয়াকে নেতিবাচক হিসেবে দেখছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতে ইসলামী যেভাবে সুসংগঠিতভাবে এগোচ্ছে, তাতে তারা নির্বাচনকে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করে তুলছে। প্রাথমিকভাবে এনসিপি নেতাদের সঙ্গে জামায়াত নেতাদের কিছু বিষয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য থাকলেও বর্তমানে তাঁরা অভিন্ন নির্বাচনী লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছেন। তাঁদের মূল উদ্দেশ্য হলো ইসলামী ও সমমনা শক্তিগুলোকে এক করে নির্বাচনকে প্রভাবশালী করা। জামায়াতপন্থী বুদ্ধিজীবীরা এই জোটকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জামায়াতে ইসলামী অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে এগোচ্ছে। তারা এনসিপির মতো নতুন দলগুলোকে সঙ্গে নিয়ে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াচ্ছে। তবে এই জোটে এনসিপি রাজনৈতিকভাবে কতটা লাভবান হবে তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। ভোটারদের মধ্যে এই জোট নিয়ে মিশ্র আবেগ কাজ করলেও এবারের নির্বাচনে প্রায় ৪০ শতাংশ তরুণ ভোটারের সিদ্ধান্তে এই জোট ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে বুদ্ধিজীবীরা মনে করেন।

বিশেষ করে ইতোপূর্বে পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রশিবিরের অভূতপূর্ব জয় নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করতে পারে বলে অনেকের ধারণা। তবে এ জোটের দরুন জাতীয় নাগরিক পার্টির স্বতন্ত্র রাজনীতির উত্থান বাধাগ্রস্ত হবে কি না সেটিই এখন দেখার বিষয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন....

আমাদের ফেসবুক পাতা

আজকের আবহাওয়া

পুরাতন সংবাদ খুঁজুন

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১৩১৫
১৬১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭  

এক্সক্লুসিভ আরও