গোপন নথি ফাঁস: মার্কিন চাপেই ক্ষমতা হারিয়েছেন ইমরান খান!
আগস্ট ১০ ২০২৩, ২০:৪৯
নিজস্ব প্রতিবেদক, বরিশাল: বিগত এক বছর ধরেই উত্তাল পাকিস্তানের রাজনীতিতে আলোচিত নাম সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। পাকিস্তানের পার্লামেন্টে অনাস্থা ভোটে হেরে বিদায় নেয়ার আগ থেকেই ইমরান খান বলে আসছিলেন বিদেশী শক্তির হস্তক্ষেপে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। পরবর্তীতে তিনি বেশ স্পষ্ট করেই বিদেশি শক্তি হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাম নেন।
এরপরও ক্ষমতাচ্যুত হলেও জন সমর্থনের কারণে তাকে গ্রেফতার করতে বেশ বেগ পেতে হয় পাকিস্তানকে। এক্ষেত্রে সামরিক বাহিনীর সরাসরি হস্তক্ষেপের বিষয়টিও ছিলো বেশ স্পষ্ট। সবশেষ তোশাখানা মামলায় দুর্নীতির অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হয়ে কারাগারে আছেন পাকিস্তানের জনপ্রিয় ক্রিকেট তারকা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী।
সম্প্রতি মার্কিনভিত্তিক সংবাদ মাধ্যম ‘দ্য ইন্টারসেপ্ট’ ইমরানের ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার বিষয়ে এক গোপন নথি ফাঁস করেছে। সেখানে আরও একবাল প্রতিধ্বনিত হলো ইমরান খানের দেয়া বক্তব্য। সেই সঙ্গে প্রশ্ন ওঠে, তবে কী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নগ্ন হস্তক্ষেপেই ইমরান খানের পতন হয়!
পাকিস্তানের সংবাদ মাধ্যম ডনের প্রতিবেদনে বলা হয়, ক্ষমতায় থাকাকালীন ইমরান খান রাশিয়া সফর করে আমেরিকার তোপের মুখে পড়ে। প্রকাশ হওয়া নথি অনুযায়ী, তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত ইসলামাবাদকে এ বিষয় অবগত করলে ইমরান খান ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার কারণ স্বরুপ সেটিকে মার্কিন ষড়যন্ত্রের প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। ফাঁস হওয়া নথিতে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক ব্যুরোর সহকারী সেক্রেটারি অব স্টেট ডোনাল্ড লু এবং পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূত আসাদ মাজিদ খানসহ মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের কর্মকর্তাদের মধ্যকার একটি বৈঠকের বিবরণ রয়েছে।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দফতরের মুখপাত্র মুমতাজ জাহরা বালোচ ডনকে বলেন, ফাঁস হওয়া নথির বিষয়ে আমাদের কোনো মন্তব্য নেই। তথ্যমন্ত্রী মরিয়ম আওরঙ্গজেব এবং পরিকল্পনামন্ত্রী আহসান ইকবালও কোনো মন্তব্য করেননি। অপরদিকে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর প্রকাশিত নথির সত্যতা সম্পর্কে মন্তব্য করেনি। তারা বলেছে, নথির বিষয়বস্তুতে এরকম কোনো কিছু ছিল না, যা দেখে মনে হতে পারে পাকিস্তানের ক্ষমতায় কে আসবে তাতে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ভূমিকা থাকতে পারে।
ফাঁস হওয়া নথি অনুযায়ী, ইউক্রেন যুদ্ধের বিষয়ে ইমরান খানের পররাষ্ট্র নীতিতে যুক্তরাষ্ট্র আপত্তি জানায় তৎকালীন সময়। ডোনাল্ড লু ইউক্রেন সঙ্কটে পাকিস্তানের অবস্থানের কথা উল্লেখ করেছেন এবং বলেছেন, এখানকার এবং ইউরোপের লোকেরা যুদ্ধে ইউক্রেনের বিষয়ে পাকিস্তানের এমন আক্রমণাত্মক নিরপেক্ষ অবস্থানের বিষয়ে খুবই উদ্বিগ্ন ছিল। আমাদের কাছে পাকিস্তানের অবস্থানকে নিরপেক্ষ বলে মনে হয়নি। এনএসসির সঙ্গে তার আলোচনায় বেশ স্পষ্ট বলে মনে হয়েছে এটি ইমরান খানের নীতি।
জবাবে আসাদ মাজিদ খান বলেছিলেন, এটি পরিস্থিতির সঠিক তথ্য নয় কারণ ইউক্রেনের বিষয়ে পাকিস্তানের অবস্থান তীব্র আন্তঃসংস্থা আলোচনার ফলেই এসেছিল। আমি লু কে জিজ্ঞাসা করেছিলাম যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর প্রতিক্রিয়ার কারণ কি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভোটদান থেকে পাকিস্তানের বিরত থাকা? তিনি স্পষ্টভাবে না বলে দিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন, এটি কেবল প্রধানমন্ত্রীর (ইমরান খান) মস্কো সফরের কারণে হয়েছিল।
ফাঁস হওয়া নথি অনুসারে এই আলোচনায় এর পর লু বলেছিলেন, ‘আমি মনে করি যদি প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অনাস্থা ভোট সফল হয় তবে ওয়াশিংটন সবাইকে ক্ষমা করবে। কারণ রাশিয়া সফরকে শুধু প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে। অন্যথায়, আমার ধারণা এটি এগিয়ে যাওয়া কঠিন হবে।’
ডনের প্রতিবেদন অনুসারে, এই ধরনের মন্তব্য এটাই প্রমাণ করে, ইমরান খান তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য যে মার্কিন অভিযোগ এনেছিলেন তা অমূলক নয়। লুর কথাগুলো স্পষ্টতই এক ধরনের হুমকি ছিল। এটি নিশ্চিতভাবেই জেনেভা কনভেনশন অনুসারেও কোন সঠিক কূটনৈতিক আচরণ নয়। পাকিস্তানের সিনিয়র এক কূটনীতিকের মতে, ‘অবশ্যই কোন ষড়যন্ত্র ছিল না, তবে একজন মার্কিন কর্মকর্তার কাছ থেকে এ জাতীয় শব্দের ব্যবহার অগ্রহণযোগ্য। কেননা লু বলেছিলেন যদি অনাস্থা ভোট সফল হয় তবে সব ক্ষমা করা হবে।’
আসাদ মাজিদ খান মার্কিন কূটনীতিককে আরও জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে ইউক্রেনের বিষয়ে পাকিস্তানের অবস্থান যদি ওয়াশিংটনের কাছে এতই গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তবে কেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের রাশিয়া সফরের আগে ইসলামাবাদের সঙ্গে তা নিয়ে আলোচনা হয়নি। জবাবে ডোনাল্ড লু বলেন, ‘ওয়াশিংটনের চিন্তাভাবনা ছিল, পাকিস্তানের বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতার পরিপ্রেক্ষিতে। এই ধরনের পরিস্থিতিতে এটি সঠিক সময় ছিল না। এর জন্য পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থির হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা উচিত।’
নথি ফাঁস হওয়ার পর সেটির উল্লেখ করে আসাদ মাজিদ খান বলেন, লু হোয়াইট হাউজের স্পষ্ট অনুমোদন ব্যতীত এমন একটি জোরালো অনুভূতি প্রকাশ করতে পারতেন না, যা তিনি বারবার উল্লেখ করেছেন।
যদিও ‘দ্য ইন্টারসেপ্ট’ তার প্রতিবেদনে দাবি করেছে, তাদের নথিটি পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর একটি বেনামী উৎস থেকে পাওয়া। তবে তিনি বলেছিলেন, ইমরান খান বা তার দলের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। অনেকের ধারণা নথি ফাঁসের উৎস পিটিআই নিজেই হতে পারে। এখানে নথি ফাঁস হওয়ার সময়টি অত্যন্ত গুরত্বপূর্ণ। কেননা তোশাখানা মামলার রায়ের পরেই তা প্রকাশ্যে এসেছে।
প্রোটোকল অনুসারে, শুধু গুটিকয়েক গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের গোপন নথি সংরক্ষণে রাখার অনুমতি ছিল। এর মধ্যে ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী ও সেনাপ্রধান। ইসলামাবাদে একটি জনসভায় ইমরান খানের মাধ্যমে নথিটির অস্তিত্ব প্রথম প্রকাশ করার পরে পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির এক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সভাতে গোপন নথির বিষয়বস্তু নিয়ে অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়।
এদিকে নথি ফাঁস হওয়ার পর পরোক্ষ স্বীকারোক্তিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রানা সানাউল্লাহ বলেছেন, ‘যদিও এই গল্পে নতুন কিছু নেই, তবে তথ্যের সত্যতা প্রতিষ্ঠা কিংবা নথির উৎস জানার জন্য তদন্ত করা দরকার। সম্ভবত এটি একটি অত্যন্ত অশুভ, বিশ্বাসঘাতক এবং রাষ্ট্রদ্রোহী কাজ।’
এদিকে ফাঁস হওয়া এই নথি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বুধবার এক ব্রিফিংয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের মুখপাত্র ম্যাথিউ মিলার জানান, ওয়াশিংটন পাকিস্তান সরকারের কাছে ব্যক্তিগতভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। তারপরে প্রকাশ্যে প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের দিনেই মস্কোতে সফর করে একই কাজ করেছিলেন। তবে তিনি ফাঁস হওয়া নথির সত্যতা নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
মিলার বলেন, এই বিষয়গুলো কখনোই এটা প্রমাণ করে না যে, পাকিস্তানের ক্ষমতায় কে বসবে তা যুক্তরাষ্ট্র নির্ধারণ করতে পারে। আমি মনে করি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী যে নীতি গ্রহণ করছে তা নিয়ে মার্কিন সরকার উদ্বেগ প্রকাশ করেছে মাত্র। পাকিস্তানের নেতৃত্বের বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা।
বিষয়টিকে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট সরাসরি অস্বীকার করেনি। সেই সঙ্গে লু এর অকূটনৈতিক বক্তব্য নিয়েও স্পষ্ট করে কোন কথা বলা হয়নি এই আলোচনায়। যে কারণেই অনেকেই মনে করছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কথায় পাকিস্তান সেনা বাহিনী বাধ্য হয় ইমরান খানকে পদচ্যুত করার ব্যবস্থা করতে। সেই সঙ্গে আসন্ন নির্বাচনে ইমরান খান যেনো অংশগ্রহণ করতে না পারে সেই প্রক্রিয়া শেষ করতেই তার বিরুদ্ধে মামলা প্রদান করে রায় দেয়া হয়েছে। এরই মধ্যে নির্বাচনের প্রস্তুতি নেয়া শুরু করেছে দেশটি। ডন।








































