শ্রীলঙ্কায় আর্থিক সংকটে স্কুল থেকে ঝরে পড়ছে শিক্ষার্থীরা

জানুয়ারি ০৫ ২০২৩, ১৩:৫৭

নিজস্ব প্রতিবেদক, বরিশাল: প্রায় এক বছর ধরে চরম অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে রয়েছে শ্রীলঙ্কা। পরিস্থিতি এতোটাই খারাপ যে, একাধিক সন্তানের মধ্যে একজনকে স্কুলে পাঠানোর জন্য অন্যদের বাড়িতে রাখতে বাধ্য হচ্ছেন অভিভাবকরা।

আর তাই আর্থিক সংকটের জেরে সৃষ্ট এই পরিস্থিতিতে অনেক শিক্ষার্থী স্কুল থেকে ঝরে পড়ছে। বৃহস্পতিবার (৫ জানুয়ারি) এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দশ বছর বয়সী মালকি তার বিছানায় বসে থাকা অবস্থায়ই বেশ উত্তেজিত। সে তার দুই বোন এবং দুই ভাইয়ের এক ঘণ্টা আগে ঘুম থেকে উঠেছে যাতে সে তার নখ থেকে কিছু উজ্জ্বল লাল বস্তু সরিয়ে ফেলতে পারে। আজ স্কুলে তার প্রথম দিন এবং সে এ বিষয়ে নিখুঁত হতে চায়।

তবে তার ভাইবোনদের অবশ্যই বাড়িতে থাকতে হবে। কারণ মালকির পরিবার কেবল তাকেই স্কুলে পাঠানোর সামর্থ্য রাখে।

ছয় মাস আগে, শ্রীলঙ্কা সবচেয়ে খারাপ অর্থনৈতিক সংকটের সাক্ষী হয়েছে। যদিও বর্তমান সময়ে দ্বীপরাষ্ট্রটিতে অনেকটা শান্ত। তবে গণ বেকারত্ব এবং পণ্য-দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধির সম্পূর্ণ প্রভাব এখনও অনেক পরিবারের মধ্যে দৃশ্যমান।

বিবিসি বলছে, মালকির মা প্রিয়ন্তিকাকে তার বাচ্চাদের স্কুলে পড়া বন্ধ করতে হয়েছে, যাতে তারা আতশবাজি বিক্রি করে পরিবারের জন্য অর্থ উপার্জন করতে পারে।

অর্থনৈতিক সংকটের কারণে শ্রীলঙ্কায় খাদ্যের দাম রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং একইসময়ে মুদ্রাস্ফীতিও সর্বকালের সর্বোচ্চ ৯৫ শতাংশে পৌঁছেছে।

বেশ কিছু দিন ধরে মালকির পরিবারের কেউ (প্রয়োজন মতো) খাবার খেতে পায় না। শ্রীলঙ্কায় স্কুলে বিনামূল্যে পড়ার সুযোগ থাকলেও সেখানে খাবার দেওয়া হয় না।

এর সঙ্গে ইউনিফর্ম এবং পরিবহনের খরচ যোগ করলে, দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশটিতে শিক্ষা এখন একটি বিলাসবহুল বিষয়, যা মালকির মা প্রিয়ন্তিকা আর বহন করতে পারছেন না।

প্রিয়ন্তিকা বলছেন, যদি তারা স্কুলে ফিরে যেতে চায় তার জন্য প্রতিদিন প্রায় ৪০০ রুপি প্রয়োজন। নিজের এক বেড-রুমের ঘরে সজল চোখে তিনি বলেন, ‘এই সব বাচ্চারা প্রতিদিন স্কুলে যেত। এখন তাদের (স্কুলে) পাঠানোর টাকা আমার কাছে নেই।’

১০ বছর বয়সী মালকি এখন স্কুলে যেতে পারছে কারণ তার জুতা এবং ইউনিফর্ম এখনও মানানসই। কিন্তু মালকির ছোট বোন দুলাঞ্জলি বিছানায় শুয়ে কাঁদছে, মন খারাপ করে আছে। কারণ সে স্কুলে যেতে পারছে না।

(দুলাঞ্জলিকে) প্রিয়ন্তিকা বলছেন, ‘আমার প্রিয়তম, কেঁদো না। আমি চেষ্টা করব, কাল তোমাকে নিয়ে যাব।’

প্রক্রমা ওয়েরাসিংহেও সেন্ট্রাল সেকেন্ডারি কলেজের অধ্যক্ষ। তিনি প্রতিদিন (শিক্ষার্থীদের) এই অর্থনৈতিক দুরবস্থা দেখেন।

তিনি বলছেন, ‘স্কুলের দিন যখন আমরা সকালের সমাবেশ করি, তখন শিশুরা ক্ষুধায় অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।’

সরকার বলছে, তারা স্কুলে চাল বিতরণ শুরু করেছে, কিন্তু বিবিসি যোগাযোগ করেছে এমন বেশ কয়েকটি স্কুল বলছে- তারা কোনও সাহায্য পায়নি।

ওয়েরাসিংহে বলছেন, স্কুলে ছাত্রদের উপস্থিতি ৪০ শতাংশের মতো কমে গেছে। আর তাই শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফিরে আসা অব্যাহত রাখতে শিক্ষকদের অতিরিক্ত খাবার আনতে বাধ্য করেছিলেন তিনি।

জোসেফ স্ট্যালিন সিলন শিক্ষক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক। তিনি বিশ্বাস করেন, খরচের কারণে শিক্ষা ছেড়ে দেওয়া পরিবারের ক্রমবর্ধমান সংখ্যা সম্পর্কে সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে অসচেতন।

তিনি বলেন, ‘আমাদের শিক্ষকরাই খালি লাঞ্চ বক্স দেখেন। কিন্তু এই অর্থনৈতিক সংকটের প্রকৃত শিকার শিশুরা। (সরকার) এই ইস্যুটির উত্তর খুঁজছে না। এটি শ্রীলঙ্কা সরকারের পরিবর্তে ইউনিসেফ এবং অন্যরা দেখেছে ও শনাক্ত করেছে।’

ইউনিসেফ বলেছে, সামনের মাসগুলোতে নিজেদের খাওয়ানোই মানুষের জন্য কঠিন হয়ে উঠবে। কারণ চালের মতো মৌলিক খাদ্য পণ্যের মূল্যস্ফীতি পরিবারগুলোকে কার্যত পঙ্গু করে চলেছে।

শ্রীলঙ্কার সরকার পরিস্থিতি পরিচালনা করতে আপাতদৃষ্টিতে অক্ষম হওয়ায় দাতব্য সংস্থাগুলোকে বাধ্য হয়ে পদক্ষেপ নিতে হয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন....

আমাদের ফেসবুক পাতা

আজকের আবহাওয়া


এক্সক্লুসিভ আরও