স্বজনহারা জেলে পরিবারের আপনজন ছাড়া ঈদ আনন্দ
মার্চ ২১ ২০২৬, ২৩:০৯
পাথরঘাটা (বরগুনা): কেউ বাবার, কেউ ভাইয়ের, কেউ সন্তানের আবার কেউ স্বামীর জন্য অপেক্ষায়, এই বুঝি আসছে। শহরের মতো দরজার কড়া নাড়া নয় গ্রামের বাড়ির সামনে (দরজায়) এসে ডাক দিচ্ছে এমন মুহূর্ত, ক্ষণ অতিবাহিত করছে উপকূলের জেলে পরিবারের সদস্যরা। হারানো স্বজনদের স্মৃতিই বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন তাদের।
যার চলে যায় সেই বুঝে না পাওয়ার বেদনা।
স্বজনহারা কষ্টে বুক ফেটে যায়। স্বজনহারা পরিবারের সদস্যদের এমনিতেই দিনক্ষণ চলছে কষ্টে এরপর যদি আসে ঈদ। আর সেই ঈদ যদি হয় স্বজন ছাড়া।
অবুঝ শিশুর চাহনি যেন আকাশ ভেঙে পড়ে।
ঠিক এমন চিত্র উপকূলীয় উপজেলা পাথরঘাটায়। এখানে অধিকাংশ জেলে পরিবারে নেই ঈদ আনন্দ। একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যদের হারিয়ে অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটে এসব পরিবারের সদস্যদের। বরাবরের মতো এ বছর ঈদেও কোনো কোনো পরিবারে ঈদের সেমাই কেনা হয়নি, আবার কোনো পরিবারে অন্যের সাহায্যে কেনা হলেও সেসবে নেই কোনো আনন্দ।
পাথরঘাটা সদর ইউনিয়নের রুহিতা, পদ্মা, চরলাঠিমারা, জিনতলা, টেংরা, চরদুয়ানী ইউনিয়নের দক্ষিণ চরদুয়ানী, তাফালবাড়িয়া, জ্ঞানপাড়া, গাববাড়িয়াসহ একাধিক গ্রামের অসংখ্য জেলে পরিবারে নেই ঈদ আনন্দ। একে তো কর্মক্ষম ব্যক্তি বছরের পর বছর ধরে সাগরে গিয়ে নিখোঁজ অপরদিকে অভাবের সংসারের টানাপড়েন এমন অবস্থায় ঈদ তাদের জন্য আদার ব্যাপারির জাহাজের খোঁজ নেওয়ার মতো অবস্থা।
উপকূলের জেলে জীবনে ঈদের খোঁজ খবর নিতে সরেজমিনে রুহিতা গ্রামে গিয়ে জানা যায়- ২০২৩ সালের ১৭ নভেম্বরে সাগরে মাছ শিকার করতে গিয়েছিলেন কালু মাঝি, ঘূর্ণিঝড় মিধিলির কবলে পড়ে নিখোঁজ হন ২৫ জেলে। নিখোঁজ জেলে পরিবারের সদস্যদের আর্তনাদ এখনো থামছে না। প্রতি বছর সাগরে জেলে নিখোঁজ হয়, সাগরে ডুবে মারা যায়। দিন দিন এর সংখ্যা বাড়ছেই।
উপার্জনক্ষম ব্যক্তিদের হারিয়ে তারা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তারা আদৌ বেঁচে আছেন কি-না, জানেন না স্বজনেরা। তবু প্রিয়জনের আশায় বুক বেঁধে নীরব অপেক্ষায় দিন কাটছে এসব জেলের পরিবারের সদস্যদের।
২০২৩ সালে নিখোঁজ জেলেরা হলেন- আবু কালাম (৬০), মজিবর চাপরাশি (৪৫), ইউসুফ আলী (৩৫), মো. জাফর (৩৫), আব্দুস সত্তার (৬৫), নাদিম (২০), মো. বেল্লাল (২৫), মো. ইয়াসিন (২৫), আউয়াল বিশ্বাস (৪৮), সফিকুল ইসলাম (৪০), মো. ফারুক (৩৫), আব্দুল খালেক (৫০), মো. নান্টু মিয়া (৩৫), মাহতাব (৪৫), সিদ্দিক মৃধা (৪৩), কালু মিয়া (৪০), মো. মনির হোসেন (৪৫), সহিদুল ইসলাম (৪০), মো. সুবাহান খাঁ (৭১), মো. ইউনুস সরদার (৭৩), মো. খলিল (৬১), আব্দুর রব (৬০), মো. আল আমিন (৩৫), মো. লিটন (৪১) ও মো. কালাম (৩৬)। তাদের মতো অসংখ্য জেলে সাগরে গিয়ে নিখোঁজ রয়েছে।
রুহিতা গ্রামের কালু মাঝির মেয়ে রাইসা মনি ও ফাহিমা রিমু বলেন, বাবা ছাড়া তিনটা ঈদ। বাবা থাকলে আমরাও সুন্দর একটা ঈদ উদযাপন করতে পারতাম। এই তিন ঈদে নাস্তা খাইনি। প্রতি মুহূর্তে বাবার জন্য মন কাঁদে। মাঝে মধ্যে নিজের অজান্তে বাবাকে ডাক দিই। বাড়ির দরজায় দৌড়ে আসি, এই বুঝি বাবা আসছেন। এতোদিন কীভাবে কেটেছে, আমাদের সঙ্গে না থাকলে কেউ বুঝবে না। প্রায় দিনই না খেয়ে থাকি। সংসার কীভাবে চলে কেউ খোঁজ নেয় না। কয়টা ঈদ বাবা ছাড়া, বাবাহীন ঈদ কতো কষ্টের যাদের কষ্ট তারাই বোঝে।
নিখোঁজ ইউসুফের ছোট ভাই ইয়াকুব আলী বলেন, ভাই দুই সন্তান রেখে সাগরে যান। আর ফিরে এলেন না। সন্তানদের মুখের দিকে তাকালে নিজের চোখের পানি ধরে রাখতে পারি না। সারাদিন বাবা বাবা বলে কান্না করে। অনেক খোঁজাখুঁজি করেছি, আজও ভাইকে পাইনি। জীবিত আছেন না মারা গেছেন, তা-ও জানি না।
উপকূলের জেলে অধিকার নিয়ে কাজ করছেন উপকূল অনুসন্ধানী সাংবাদিক ও গবেষক শফিকুল ইসলাম খোকন। তিনি বলেন, ঈদ এলে অনেকের খোঁজ নিলেও এক শ্রেণীর মানুষদের কেউ খোঁজ নেয় না। উপকূলের জেলেদের নিয়ে কেউ ভাবে না, তাদের খোঁজও নেয় না। প্রতিনিয়ত পরিবার হারাচ্ছে উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে। প্রতিনিয়ত স্বজনহারা এসব পরিবার দুশ্চিন্তায়, অর্ধাহারে অনাহারে থাকে এর পরেও আসে ঈদ। আর এই ঈদ তো তাদের জন্য আরও বেদনার।
তিনি আরও বলেন, পাথরঘাটায় ১৯৯৩ সাল থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত নিখোঁজ জেলেদের তালিকা সংবলিত স্মৃতিফলক করা হয়েছে। আমরা চেষ্টা করছি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জেলে পরিবারে সহযোগিতা করতে এ নিয়ে প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করছি।








































