জ্বালানি খাতে নতুন চ্যালেঞ্জ
মার্চ ১৪ ২০২৬, ০২:০৯
গ্লোবাল এনার্জি মনিটরের এশিয়া গ্যাস ট্র্যাকার অনুসারে, দক্ষিণ এশিয়া বর্তমানে বিশ্বের নির্মাণাধীন এলএনজি সক্ষমতার প্রায় ১৭ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করছে। তবে এই সমপ্রসারণ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে, দক্ষিণ এশিয়ার সক্ষমতা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাবে।
যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলে বাধা দক্ষিণ এশিয়ার এলএনজি সরবরাহ ব্যবস্থায় সরাসরি প্রভাব ফেলেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং এই অস্থিরতার মধ্যে এলএনজি-এর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা বাংলাদেশের অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। জিইএম-এর বিশ্লেষক রবার্ট রোজানস্কি বলেন, “উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো, বিশেষ করে বাংলাদেশ, যেখানে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাত প্রায় সম্পূর্ণভাবে আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল, তারা এমন পরিস্থিতিতে মূল্য ধাক্কা এবং সরবরাহ সংকট মোকাবিলা করতে হিমশিম খাবে।”
এলএনজি প্রকল্পের ইতিহাস এবং ব্যর্থতার ঝুঁকি
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, গত এক দশকে ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে যে পরিমাণ এলএনজি সক্ষমতা চালু হয়েছে, তার চেয়ে দুই থেকে তিন গুণ বেশি প্রকল্প বাতিল বা স্থগিত হয়েছে। জিইএম-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ায় এলএনজি প্রকল্পের ব্যর্থতার হার ইউরোপের তুলনায় অনেক বেশি। এর ফলে, এই অঞ্চলে বিনিয়োগ করা বড় এলএনজি অবকাঠামোর আর্থিক ও নীতিগত ঝুঁকির ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই ঝুঁকি আরও প্রকট। দেশটির বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প খাত, এবং জ্বালানি নিরাপত্তা মূলত আমদানিকৃত গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। এলএনজি সরবরাহ বিঘ্নিত হলে, শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়, শিল্প খাত, পরিবহন খাত এবং দৈনন্দিন জীবনের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমেও বিশাল প্রভাব পড়তে পারে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিকল্প
জিইএম প্রতিবেদনে বাংলাদেশের নতুন সরকারের জন্য এলএনজি নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে স্থানান্তরের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। জুই জলি, জিইএম-এর তেল-গ্যাস কর্মসূচীর পরিচালক, বলেন, “নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎস দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সক্ষম। এলএনজি যে ঝুঁকি তৈরি করছে, তা নবায়নযোগ্য উৎস থেকে এড়ানো সম্ভব।” আইইএফএ-এর বাংলাদেশের লিড এনার্জি অ্যানালিস্ট শফিকুল আলমও উল্লেখ করেছেন, “বাংলাদেশে এলএনজি-এর অভিজ্ঞতা অত্যন্ত অস্থির ও অনিশ্চিত। এটি দেশের অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি।”
দক্ষিণ এশিয়ার নবায়নযোগ্য জ্বালানি বৃদ্ধির উদাহরণ
দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলো ইতিমধ্যেই নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বড় বিনিয়োগ করছে। পাকিস্তানে গত তিন বছরে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন তিন গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। ভারত ২০৩০ সালের মধ্যে মোট চাহিদার ৪০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে মেটানোর পরিকল্পনা করছে। এই ধারার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ালে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হতে পারে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রভাব
এলএনজি-তে অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা শুধু জ্বালানি নিরাপত্তার ঝুঁকি নয়, অর্থনৈতিক চাপও সৃষ্টি করে। এলএনজি আমদানির জন্য বৈদেশিক মুদ্রার ব্যাপক ব্যয় হয়, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং দেশের মুদ্রানীতি প্রভাবিত করে। এছাড়া, জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পায়, যা শিল্প খাতের উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দামে প্রতিফলিত হয়। এই পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় শিল্প ও ভোক্তাদের জন্য চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা
জিইএম বিশেষভাবে উল্লেখ করেছে যে, এলএনজি অবকাঠামোর দ্রুত সমপ্রসারণের ক্ষেত্রে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা অপরিহার্য। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ যেমন ভারত ও পাকিস্তান প্রায়ই এই ঝুঁকির মুখোমুখি হয়েছে। প্রকল্পের ব্যর্থতার ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের আর্থিক ক্ষতি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন প্রকট। বাংলাদেশের জন্য এটি একটি সতর্কবার্তা যে, এলএনজি অবকাঠামো সমপ্রসারণকে স্বাভাবিক ভাবেই নেওয়া উচিত নয়। সরকারের উচিত এলএনজি নির্ভরতার পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিকল্প এবং স্থানীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দেয়া।








































