বাতিল তিন হাজার কোটি টাকার প্রকল্প !

জুন ০২ ২০২৬, ০২:৩৩

নিজস্ব প্রতিবেদক: ২০১২ সালে যখন হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গাজীপুরের শিববাড়ি পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ দেশের প্রথম বিআরটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছিল, তখন দেশবাসীকে এক স্বপ্নের যাতায়াত ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছিল।

পরিকল্পনায় বলা হয়েছিল, এই ব্যবস্থা চালু হলে যে সুবিধাগুলো পাওয়া যাবে- ১. প্রতিদিন অন্তত ২৫ হাজার যাত্রী কোনো যানজট ছাড়াই আধুনিক বাসে যাতায়াত করতে পারবেন। ২. সড়কের মাঝখানের বিশেষ লেন দিয়ে শুধু বিআরটি বাস চলবে, যা কোনো ট্রাফিক সিগন্যাল বা অন্য কোনো যানবাহনের বাধায় পড়বে না। ৩. বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পৌঁছানো যাবে মাত্র ২০-২৫ মিনিটে।

প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০১৬ সালের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করে ২০১৭ সাল থেকে স্বয়ংক্রিয় দরজার বিশেষ বাস চালুর কথা ছিল। কিন্তু চার বছরের প্রকল্প ১৪ বছরে পদার্পণ করলেও আজ পর্যন্ত সড়কে কোনো বিশেষ বাস নামেনি, বরং এই দীর্ঘ সময়ে ওই রুটের নিয়মিত যাতায়াতকারীদের জন্য প্রকল্পটি পরিণত হয়েছে এক জীবন্ত নরকে। শুরুতে এই প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ হাজার ৪০ কোটি টাকা। তবে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও দক্ষতার অভাবে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে না পারায় প্রকল্প প্রস্তাব মোট তিনবার সংশোধন করা হয়। প্রতিটি সংশোধনীতেই বাড়ানো হয়েছে সময় এবং বাজেট।

তৃতীয় সংশোধনী পর্যন্ত ব্যয় ৪,২৬৮ কোটি টাকা (যার মধ্যে এখন পর্যন্ত খরচ হয়েছে ২,৮১১ কোটি টাকা)। চতুর্থ সংশোধনের প্রস্তাব (২০২৫): গত বছর সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ প্রকল্পটির ব্যয় আরও বাড়িয়ে ৬,৫৯৮ কোটি টাকা করার এবং মেয়াদ ২০২৯ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়। তবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) এই চতুর্থ সংশোধনী প্রস্তাবটি সরাসরি নাকচ করে দেয়। একনেক থেকে প্রকল্পটির বিকল্প ব্যবহার খুঁজে বের করতে এবং নকশাগত ত্রুটির জন্য দায়ীদের চিহ্নিত করার নির্দেশ দেয়া হয়।

একনেকের নির্দেশনার পর সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের অনুরোধে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হকের নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষজ্ঞ দল পুরো প্রকল্পটি পর্যালোচনা করে। গত মাসে মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়া তাদের প্রতিবেদনে বিআরটি প্রকল্পকে দেশের অবকাঠামো খাতের এক চরম ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার উদাহরণ হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়েছে।

বুয়েটের প্রতিবেদনে উঠে আসা প্রধান ত্রুটিগুলো হলো- ভুল নকশা ও ভৌগোলিক বাস্তবতা: বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী সাধারণত ১২ থেকে ১৪ লেনের মহাসড়কে বিআরটি লেন করা সফল হয়। কিন্তু গাজীপুর অংশে সড়কটি মাত্র চার লেনের এবং বিমানবন্দর অংশে ছয় লেনের। এত সংকীর্ণ সড়কে মাঝখান থেকে দুটি লেন কেটে নেয়ার সিদ্ধান্তটি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ছিল। মিশ্র অবকাঠামো: পুরো পথটির কোথাও উড়ালসড়ক আবার কোথাও সমতল সড়ক করা হয়েছে। এই মিশ্র প্রকৃতির কারণে বাসের গতি ব্যাহত হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি করতেই হতো, তবে পুরো ২০ কিলোমিটার পথই উড়ালসড়ক করা উচিত ছিল। সড়ক ও ফুটপাত সংকোচন: বিআরটি স্টেশনের কারণে মূল সড়ক অনেক জায়গায় সরু হয়ে গেছে। পথচারী সেতুগুলোর নামার অংশ সরাসরি ফুটপাত দখল করে নেয়ায় সাধারণ মানুষের হাঁটার পথ বন্ধ হয়ে গেছে।

ভবিষ্যতের পথ রুদ্ধ করা: আব্দুল্লাহপুর, ভোগরা ও গাজীপুর চৌরাস্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে যেভাবে স্টেশন ও পিলারের নকশা করা হয়েছে, তাতে ভবিষ্যতে ওইসব এলাকায় অন্য কোনো বড় পরিবহন অবকাঠামো বা ফ্লাইওভার নির্মাণ করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

বিশেষজ্ঞ দল তাদের ১৭টি সুপারিশের মধ্যে সাফ জানিয়েছে, এই বিআরটি কার্যক্রম পুরোপুরি বাতিল করা উচিত এবং বিদ্যমান অবকাঠামোকে ভেঙে বা সংস্কার করে সাধারণ উন্নত মহাসড়ক হিসেবে ব্যবহার করা উচিত। অধ্যাপক সামছুল হক বলেন, (প্রধান, বুয়েট বিশেষজ্ঞ দল) ‘বিআরটি একটি চাপানো প্রকল্প ছিল। নকশায় ত্রুটি ছিল, সম্ভাব্যতা যাচাই ঠিক ছিল না। কিন্তু এসব অসংগতি বাস্তবায়নকারী সংস্থা, পরামর্শক, এমনকি পরিকল্পনা কমিশনও ধরেনি। এটি আমাদের অবকাঠামো খাতের অত্যন্ত বাজে একটি দৃষ্টান্ত।’

সরেজমিন বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, প্রকল্পের আওতায় ২০ কিলোমিটারের মধ্যে ১৫টি স্টেশন অবকাঠামো আংশিক তৈরি করা হয়েছে (মোট ২৫টি স্টেশন হওয়ার কথা ছিল)। তবে কোনোটির কাজই পুরোপুরি শেষ হয়নি।

স্টেশনগুলোতে যাত্রীদের ওঠানামার জন্য কোটি কোটি টাকা খরচ করে যেসব চলন্ত সিঁড়ি (এস্কেলেটর) ও লিফট বসানো হয়েছিল, রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেগুলোর যন্ত্রপাতিতে জং ধরছে। উত্তরার একটি চলন্ত সিঁড়ি কিছুদিন পরীক্ষামূলকভাবে চালানো হলেও বর্তমানে তা সম্পূর্ণ অচল। অনেক জায়গায় স্টেশনের লোহার বেষ্টনী বা ফেন্সিং ভেঙে গেছে।

বর্তমানে বিশেষ লেনের মাঝখানের প্রতিরোধকগুলো ভেঙে সব ধরনের যানবাহন চলাচল করছে। ফলে পুরো সড়কটি একটি বিশৃঙ্খল অবস্থায় রূপ নিয়েছে। কোথাও সড়ক উচুঁ, কোথাও নিচু, কোনো রোড সাইন বা সিগন্যাল নেই। উত্তরার পোশাক কারখানাগুলোর সামনে প্রতিদিন হাজার হাজার শ্রমিক ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হচ্ছেন, যেখানে পাহারাদাররা লাল পতাকা হাতে গাড়ি থামাতে বাধ্য হচ্ছেন। বিগত ১৪ বছরে এই প্রকল্পের অব্যবস্থাপনা এবং ক্রেন দুর্ঘটনার কারণে অন্তত ৭ জন সাধারণ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে।

বর্তমান সরকারের সড়ক, রেল ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানিয়েছেন, প্রকল্পটি নিয়ে সরকার বড় ধরনের উভয়সংকটে পড়েছে। বিকল্প ১ (বাতিল ও অপসারণ): যদি বুয়েটের পরামর্শ মেনে প্রকল্প পুরোপুরি বাতিল করা হয়, তবে সড়কের মাঝখানের ১ ফুট উঁচু সিমেন্টের ডিভাইডার এবং স্টেশনগুলো ভাঙতে হবে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)-এর মতে, মাত্র ৩ শতাংশ কাজ বাকি থাকা অবস্থায় এই স্থাপনাগুলো ভাঙতে এবং ঠিকাদারদের ক্ষতিপূরণ দিতে গেলে সরকারের আরও প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার বেশি অপচয় হবে। বিকল্প ২ (চালু করার চেষ্টা): যদি প্রকল্পটি চালু করতে হয়, তবে নতুন করে বাস কেনা, ডিপো তৈরি এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনার জন্য সরকারের আরও অন্তত সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন। কিন্তু বুয়েটের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন বিনিয়োগ করার পরও ভুল নকশার কারণে এই প্রকল্প যানজট কমাতে পারবে না, ফলে সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকাও ভেস্তে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ঋণের টাকায় গড়ে ওঠা এই প্রকল্প তাই এখন মন্ত্রণালয়ের কাছে একটি বড় ‘গলার কাঁটা’। এ বিষয়ে মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, ‘প্রকল্পটি বাতিল করার পক্ষে জোরালো মত আছে। আবার বাতিল না করে আরও কিছু টাকা খরচ করে কিছু সুবিধা পাওয়ার পক্ষেও মত আছে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে সব পক্ষকে নিয়ে বৈঠক করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে তা মন্ত্রিসভায় তোলা হবে।’

বিমানবন্দর-গাজীপুর বিআরটি প্রকল্প বাংলাদেশের উন্নয়ন ইতিহাসের এক অন্ধকার অধ্যায় হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। বিদেশি ঋণ (এডিবি, এএফডি) এবং জনগণের ট্যাক্সের প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের পর প্রকল্পটির এই পরিণতি প্রমাণ করে- যথাযথ সমীক্ষা, কারিগরি সক্ষমতা এবং জবাবদিহিতা ছাড়া শুধু রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক চাপিয়ে দেয়া প্রকল্প কীভাবে রাষ্ট্রের জন্য স্থায়ী বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।

যদি সরকার এটি শেষ পর্যন্ত বাতিলই করে, তবে এই বিপুল আর্থিক ক্ষতি ও ১৪ বছরের জনদুর্ভোগের দায় কার, তা সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা অত্যন্ত জরুরি। বুয়েটের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইকারী পরামর্শক প্রতিষ্ঠান, নকশাকার এবং সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ), সেতু বিভাগ ও এলজিইডির যেসব কর্মকর্তা এই আত্মঘাতী পরিকল্পনার সাথে যুক্ত ছিলেন, তাদের কঠোর জবাবদিহিতার আওতায় আনা উচিত। অন্যথায়, উন্নয়ন প্রকল্পের নামে রাষ্ট্রীয় অর্থের এমন অপচয় ভবিষ্যতেও ঘটতেই থাকবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন....

আমাদের ফেসবুক পাতা

আজকের আবহাওয়া

পুরাতন সংবাদ খুঁজুন

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
১০১১১৩
১৫১৬১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭
৩০  

এক্সক্লুসিভ আরও