বিশ্ব রাজনীতিতে চরম উত্তেজনা
জুলাই ০৯ ২০২৬, ০২:০৪
মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপজুড়ে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এক অভূতপূর্ব রূপ ধারণ করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে ‘সমাপ্ত’ বলে ঘোষণা করেছেন এবং তেহরানের সঙ্গে যেকোনো ধরনের আলোচনাকে ‘সময়ের অপচয়, হিসেবে অভিহিত করেছেন। এই ঘোষণার পরপরই মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে ইরানের উপর্যুপরি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং ন্যাটোর আঙ্কারা শীর্ষ সম্মেলনের সাইডলাইনে স্পেনের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের আকস্মিক বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা জারি বিশ্বজুড়ে তীব্র চাঞ্চল্য তৈরি করেছে।
ইরান-ইউএস যুদ্ধবিরতি চুক্তি বাতিল, ট্রাম্পের কঠোর অবস্থান : গত এপ্রিল মাসে শুরু হওয়া একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি এবং পরে গত জুন মাসে সই হওয়া একটি সমঝোতা স্মারকের ওপর ভিত্তি করে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ৬০ দিনের একটি আলোচনা প্রক্রিয়া চলছিল। তবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গতকাল স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, এই চুক্তি এখন অতীত এবং ইরানের সঙ্গে বসা সম্পূর্ণ অর্থহীন। ট্রাম্পের এই কঠোর অবস্থানের মূল কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে হরমুজ প্রণালিতে সাম্প্রতিক উত্তেজনাকে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড দাবি করছে, ইরান আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমায় কাতারসহ বেশ কয়েকটি বাণিজ্যিক জাহাজে বেআইনিভাবে হামলা চালিয়ে যুদ্ধবিরতির শর্ত লঙ্ঘন করেছে। এর জবাবে মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের হরমোজগান প্রদেশ এবং কৌশলগত মাহশাহর বন্দর শহরের উপকূলে থাকা ইরানি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, উপকূলীয় নজরদারি কেন্দ্র এবং ড্রোন উৎক্ষেপণ কেন্দ্রসহ ৮০টিরও বেশি সামরিক স্থাপনায় ব্যাপক বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। মার্কিন এই পদক্ষেপের পরই ট্রাম্প আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তি বাতিলের কথা ঘোষণা করেন।
মধ্যপ্রাচ্যে পাল্টা আঘাত, কুয়েত ও বাহরাইনে ইরানের ৮৫টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা : মার্কিন বিমান হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ও দ্রুত পাল্টা জবাব দিয়েছে। ইরান দাবি করেছে যে, তারা বাহরাইন এবং কুয়েতে অবস্থিত অন্তত ৮৫টি মার্কিন সামরিক স্থাপনা ও ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে একযোগে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র অভিযান পরিচালনা করেছে। বাহরাইন ও কুয়েতে সাইরেন, হামলার খবর ছড়িয়ে পড়তেই বাহরাইনের পোর্ট সালমান (মার্কিন পঞ্চম নৌবহর ঘাঁটি) এবং কুয়েতের আলী আল-সালেম বিমান ঘাঁটির আশপাশে অবিরাম বিমান হামলার সতর্কবার্তা বা এয়ার রেড সাইরেন বাজতে শুরু করে।
ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের বক্তব্য, আইআরজিসির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আমেরিকার এই আগ্রাসন ছিল সরাসরি যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন। মার্কিন বাহিনীর ছোঁড়া গোলার আঘাতে ইরানের বন্দর আব্বাস অঞ্চলের সাধারণ মাছ ধরার ট্রলার ও বেসামরিক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর তারা এই ‘প্রাথমিক জবাব’ দিতে বাধ্য হয়েছে। আকাশসীমা প্রতিরক্ষার সময় তারা একটি মার্কিন এমকিউ-৯ ড্রোনও ভূপাতিত করার দাবি করেছে। আঞ্চলিক আতঙ্ক, কুয়েত ও বাহরাইনের সামরিক বাহিনী তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করে বেশ কিছু ‘শত্রুভাবাপন্ন’ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ধ্বংস করার কথা জানালেও, এই আকস্মিক সংঘাত পুরো পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে এক গভীর যুদ্ধ আতঙ্ক তৈরি করেছে।
‘ন্যাটোর আঙ্কারা সম্মেলন এবং স্পেনের ওপর ট্রাম্পের বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা : মধ্যপ্রাচ্যের এই জ্বলন্ত পরিস্থিতির মধ্যেই তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে ন্যাটোর ৩৬তম রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের শীর্ষ সম্মেলন। এই সম্মেলনের ফাঁকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত এবং নাটকীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তিনি ন্যাটো মিত্র স্পেনের সঙ্গে সমস্ত ধরনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করার নির্দেশ দিয়েছেন। ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটের পাশে দাঁড়িয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প অত্যন্ত ক্ষুব্ধ কণ্ঠে মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি (অর্থমন্ত্রী) স্কট বেসেন্টকে অবিলম্বে স্পেনের সঙ্গে সমস্ত বাণিজ্য ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক বন্ধ করার আদেশ দেন।
ট্রাম্প বলেন, আমরা স্পেনের সঙ্গে আর কোনো ব্যবসা বা বাণিজ্য করতে চাই না। ন্যাটোতে স্পেন অত্যন্ত ভয়াবহ এবং অযোগ্য একজন অংশীদার। তারা জোটে অংশ নেয় না, প্রতিরক্ষার জন্য নির্ধারিত অর্থও পরিশোধ করে না। ট্রাম্প আরও স্পষ্ট করেন, ইরান সংকটের সময় ন্যাটো জোটের পক্ষ থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে আশানুরূপ সামরিক ও কৌশলগত সমর্থন পাওয়ার আশা করেছিল, স্পেন তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে ক্ষুব্ধ মার্কিন প্রশাসন স্পেনের জন্য বাণিজ্যিক দরজা পুরোপুরি বন্ধ করার পাশাপাশি দ্বিপাক্ষিক সফর বাতিলেরও নির্দেশ দিয়েছে।
মাদ্রিদের প্রতিক্রিয়া, ‘বিজনেস এজ ইউজুয়াল’ বা স্বাভাবিক পরিস্থিতি : মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই আকস্মিক ও মারমুখী বাণিজ্যিক হুমকির মুখে স্পেন সরকার অত্যন্ত সংযত কিন্তু দৃঢ় প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। স্পেনের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে জারি করা একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে ট্রাম্পের এই আদেশকে খুব একটা পাত্তা না দিয়ে একে ‘বিজনেস এজ ইউজুয়াল’ বা ‘নিয়মিত ঘটনা’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। মাদ্রিদের পক্ষ থেকে বল হয়েছে, আমাদের দেশের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চমৎকার সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। স্পেনের পক্ষ থেকে এই সুসম্পর্কের কোনো পরিবর্তন করার কোনো ইচ্ছা বা পরিকল্পনা নেই।
স্প্যানিশ কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ট্রাম্পের এই ধরনের আকস্মিক ঘোষণা প্রায়ই জোটের অন্য দেশের ওপর চাপ সৃষ্টির কৌশল মাত্র। তবে ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত যদি মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ পুরোপুরি কার্যকর করে, তবে তা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সামগ্রিক অর্থনীতি এবং ন্যাটোর অভ্যন্তরীণ ঐক্যের ওপর একটি বিরাট ধাক্কা হিসেবে প্রমাণিত হবে। বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব : একদিকে হরমুজ প্রণালিতে চরম সামরিক উত্তেজনা ও খামেনির মৃত্যুর পর ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা, অন্যদিকে ন্যাটোর ভেতরে আমেরিকার এই একতরফা বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা এই দুইয়ে মিলে বিশ্ব রাজনীতি এখন এক অনিশ্চিত মোহনায় এসে দাঁড়িয়েছে।
‘জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক ট্যাঙ্কারের ওপর হামলা এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কড়াকড়ির কারণে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম এক লাফে অনেকটাই বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ইতোপূর্বেই বেশ কয়েকটি তেল ও গ্যাস ট্যাঙ্কার রুট পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছে। ন্যাটোর ফাটল, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ইরান সংকটের এই জটিল সময়ে ন্যাটোর শীর্ষ সম্মেলনের মধ্যেই সদস্য রাষ্ট্র স্পেনের ওপর আমেরিকার এই ক্ষোভ প্রকাশ জোটের ভেতরের ফাটলকে জনসমক্ষে নিয়ে এসেছে।
‘বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া, চীন ইতোমধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় পক্ষকেই সামরিক শক্তি প্রদর্শন বন্ধ করে আলোচনার টেবিলে ফেরার আহ্বান জানিয়েছে। তবে ট্রাম্প যেভাবে আলোচনার সম্ভাবনাকে নাকচ করে দিয়েছেন, তাতে অদূর ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হওয়া অসম্ভব কিছু নয়।
বিশ্বনেতারা এখন আঙ্কারার ন্যাটো সম্মেলনের দিকে তাকিয়ে আছেন, যেখানে ট্রাম্পের এই আগ্রাসী নীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের নতুন যুদ্ধ পরিস্থিতি সামাল দিতে কূটনৈতিক আলোচনা পর্দার আড়ালে তীব্র গতিতে চলছে।







































