সৌন্দর্যের লীলাভূমি তারুয়া দ্বীপ

জুন ০৭ ২০২৬, ২২:৫৪

ভোলার দক্ষিণ জনপদের অনন্য সৌন্দর্যের এক নয়নাভিরাম তারুণ্যদ্বীপ্ত নিদর্শন তারুয়া দ্বীপ। ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার সাগর মোহনার ঢালচরের দক্ষিণে অবস্থিত ছোট্ট এ দ্বীপটি যেন প্রকৃতির সু-নিপুণ নিখুঁত এক সৃষ্টি। মন ভোলানো দ্বীপটি যে কেউ একবার দেখলে মুগ্ধ না হয়ে পারেন না।

বঙ্গোপসাগরের বিশাল জলরাশিতে প্রায় চার দশক আগে জেগে ওঠা এ দ্বীপের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য প্রতিনিয়ত ভ্রমণপিয়াসু পর্যটকদের বিমোহিত করে তোলে। সবুজ বনভূমি, সোনালী সৈকতে বালুর ঝলকানি, জলরাশির ঢেউ, লাল কাঁকড়ার বিচরণ- সব মিলিয়ে এ দ্বীপটি যেনো প্রকৃতির এক অনন্য উপহার।

দ্বীপটিতে পৌঁছাতে ভোলা থেকে প্রায় ১৩৫ কিলোমিটার সড়কপথ তারপর ১৫ কিলোমিটার নদীপথ পাড়ি দিলেই চোখে পড়ে তারুয়া দ্বীপের মোহনীয় রূপ। সাগরের গর্জন, বিস্তৃত নীল জলরাশি আর সবুজেঘেরা দ্বীপের নৈসর্গিক দৃশ্য ভুলিয়ে দেয় যাত্রার ক্লান্তি। মনে হয়, প্রকৃতি যেন ভিন্নরুপে গড়া।

প্রায় ৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এ তারুয়া সমুদ্র সৈকতের একপাশে বঙ্গোপসাগর আর অন্যপাশে বিস্তৃর্ণ চারণভূমি। যার শেষ হয়েছে তারুয়া সৈকত সংলগ্ন ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলে। হরিণ, বন্য মহিষ, বানর, লাল কাকড়াসহ বিভিন্ন প্রাণীর বসবাস এ দ্বীপে। প্রকৃতির নিখাদ নির্জনতা এবং মোহনীয়তা মানুষকে আন্দোলিত করে, নতুন করে বেঁচে থাকার উদ্দীপনা জোগায়। প্রকৃতি যেন নিজ হাতে এ সাজিয়েছে, আপন রূপে।

তারুয়া দ্বীপের অন্যতম আকর্ষণ সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত। ভোরের সোনালী আভায় উদ্ভাসিত সূর্য যখন সাগরের বুক থেকে উঁকি দেয়, তখন তা এক স্বপ্নীল দৃশ্যের অবতারণা ঘটিয়ে মন ও মননশীলতাকে উদ্ভাসিত করে তোলে। আবার যখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে পশ্চিম আকাশে রক্তিম আভায় রাঙিয়ে, তখন মনের গহীনে অন্যরকম এক অনুভূতির সঞ্চার হয়।

নামকরণের ইতিহাস:
প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ বছর আগে বঙ্গোপসাগরের বুক চিরে জেগে উঠে সবুজের এ ঢালচর এলাকা। স্থানীয়রা যখন এ এলাকায় মাছ ধরতে আসতেন তখন শত শত তারুয়া নামের এক প্রকার মাছ উঠে আসতো তাদের জালে। ধারণা করা হয়, সে কারণেই এ এলাকাটির নামকরণ করা হয়েছে তারুয়া। কালক্রমে হয়ে উঠে তারুয়া দ্বীপ। যা এখন সবার কাছে তারুয়া সমুদ্র সৈকত নামেই পরিচিত।

অপার সম্ভাবনা:
দ্বীপটি জীববৈচিত্রের এক অপূর্ব ক্ষেত্র। এখানে রয়েছে নানা প্রজাতির বৃক্ষরাজি, হরিণ, কাঠবিড়ালী, বন ষাড় এবং শীতকালীন হরেক প্রজাতির অতিথি পাখি। শীতের সকালে দূরদেশ থেকে আসা পাখিদের কলকাকলিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো  দ্বীপ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তারুয়া দ্বীপে স্থায়ী বসতি এখনো উল্লেখযোগ্য হারে গড়ে ওঠেনি। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পর্যটকদের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা মনে করেন, যদি যথাযথ প্রচার এবং পর্যটনের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে এটি দেশের দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক চিত্র বদলে দিতে পারে। এটি হতে পারে দেশের দ্বিতীয় সেন্ট মার্টিন।

এ দ্বীপে পর্যটন সম্ভাবনা অপরিসীম। পর্যটকদের জন্য ওয়াটার অ্যাডভেঞ্চার, ক্যাম্পিং সুবিধা, এবং পরিবেশবান্ধব রিসোর্ট গড়ে তোলা হলে এটি কক্সবাজার কিংবা কুয়াকাটার মতো আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন কেন্দ্রের মতো আকর্ষণীয় স্পটে পরিণত হতে পারে। তবে এর জন্য প্রয়োজন যথাযথ সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন। সড়কপথে সরাসরি যোগাযোগ ও সি-ট্রাক পরিসেবা চালু করা গেলে এখানে ভ্রমণ আরও সহজতর হবে বলে আগতরা মনে করেন। তারুয়া দ্বীপ শুধু সৌন্দর্যের নয়, সম্ভাবনারও এক বিশাল ক্ষেত্র। সাগরের ঢেউ আর সবুজের মাঝে লুকিয়ে থাকা এ দ্বীপ বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পে এক নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। সঠিক পরিকল্পনা ও উদ্যোগের মাধ্যমে তারুয়াকে দেশের পর্যটন মানচিত্রে উজ্জ্বল এক অনন্য স্থানে পরিণত করা সম্ভব।

উপভোগ্য:
তারুয়া সমুদ্র সৈকতে পর্যটকরা একসঙ্গে উপভোগ করতে পারেন বিশাল সমুদ্রের জলরাশি হরেক রকম পরিযায়ী পাখিদের কলকাকলি, বালুকাময় মরুপথ আর ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের ছায়াঘন মনকাড়া নিবিড় পরিবেশে সময় কাটানোর সুযোগ, বৈচিত্রময় প্রাণী আর সাগরের উত্তাল গর্জন। বর্তমানে তারুয়া দ্বীপটি বাংলাদেশের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

ব্যস্তময় জীবনের একঘেয়েমি থেকে অবকাশ যাপনের ইচ্ছায় ঘুরে আসার মতো একটি স্থান তারুয়া সমুদ্র সৈকত। উত্তাল ঢেউয়ের গর্জন, কেওড়ার শ্বাসমূল, নির্মল বাতাস, সমুদ্রের তাজা মাছ দেখে যে কেও তারুয়ার প্রেমে পড়ে যাবে। প্রকৃতি প্রেমীরা ঘুরে এলেও তাদের মন পড়ে থাকবে সেখানেই।

তারুয়া সৈকতে ঘুরতে আসা পর্যটক আমিরুল ইসলাম জানান, বৈচিত্রের লীলাভূমি তারুয়া সৈকত। বিশাল সমুদ্র সৈকতে জলরাশিতে বিমুগ্ধকর করে তোলে ঘুরতে আসা পর্যটকদের।

পর্যটক মিল্লাত হোসেন বলেন, ‘‘ছুটিতে প্রত্যেক শীতেই আমি পরিবার-পরিজন নিয়ে ঘুরতে আসি তারুয়া দ্বীপে। এ যেন এক অন্যরকম অনুভূতি। বিচ্ছিন্ন এলাকায় এমন সমুদ্র সৈকত আর বিশাল জলরাশি আমাদেরকে মুগ্ধ করেছে।

কীভাবে যাবেন তারুয়া:
ঢাকা সদরঘাট থেকে প্রতিদিন একাধিক লঞ্চ চরফ্যাশনের বেতুয়ার উদ্দেশে ছেড়ে যায়। লঞ্চগুলো ভোরবেলায় ঘাটে পৌঁছায়। লঞ্চে ভাড়া ৩৫০ থেকে শুরু করে ১২’শ টাকা। চরফ্যাশনের বেতুয়া ঘাটে নেমে ইজিবাইকে করে ৩০ টাকা দিয়ে চরফ্যাশন বাজারে যেতে হবে। সেখান থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে কচ্ছপিয়া নামক এলাকা পর্যন্ত  ব্যাটারিচালিত রিকশা ভাড়া ৮০ টাকা। এসব জায়গায় মোটরসাইকেলও চলে, তবে সেক্ষেত্রে ভাড়া গুনতে হবে দ্বিগুণ।

কচ্ছপিয়া ঘাট থেকে ইঞ্জিনচালিত ট্রলারে (ভাড়া ১০০ টাকা) ঢালচর যেতে হবে। যাওয়ার পথে ছোট ছোট নদ নদী পারাপারের সময় সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন।

ঢালচর লঞ্চঘাট থেকে সমুদ্র সৈকতে যাওয়ার পথ দুটি। এর মধ্যে একটি উপায় হচ্ছে- বনের ভেতর দিয়ে হেঁটে যাওয়া যায়। তবে সেখানে কোনো মসৃণ রাস্তা নেই। বেশিরভাগ জায়গা জুড়ে কেওড়া বাগান। কারও পক্ষে হাঁটা ততটা সহজ নয়। অপরদিকে ট্রলার দিয়ে তারুয়া সমুদ্র সৈকতে যেতে পারবেন। এ একই ভ্রমণে পর্যটকরা চর কুকরি-মুকরি ইকোপার্কও ঘুরে আসতে পারবেন।

থাকা-খাওয়া:
এ সমুদ্র সৈকতে থাকার কোনো আবাসিক হোটেল বা ডাকবাংলো নেই। তবে এখানে বেশকিছু বাসায় থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। এসব ঘরে জনপ্রতি ২০০ থেকে ২৫০ টাকায় থাকা যায়। এছাড়া স্থানীয়দের কাছ থেকে তাবু ভাড়া নিয়ে খোলা আকাশের নিচে থাকা যায়। ক্যাম্পিংয়ের জন্য আদর্শ জায়গা বলা যেতে পারে এ সমুদ্র সৈকতকে।

এ দ্বীপে দেশীয় প্রজাতির মাছ পাওয়া যায়। এছাড়া নদী ও সাগরের নানা প্রজাতির সুস্বাদু মাছ পাওয়া যায়। তবে এখানকার হাঁসের মাংস ভুনা, মহিষের দুধের দই খুবই জনপ্রিয়।

তারুয়া সমুদ্র সৈকত, ম্যানগ্রোভ বন, গো চারণভূমি, স্পীডবোট ও জেলে নৌকায় চড়ে মৎসাভিযান,বনের মহিষ, শেয়ালের হুক্কা-হুয়া কোরাস, হাজারও অতিথি পাখি। তারুয়া সমুদ্র সৈকতে প্রায় ৩০০ ফুট দীর্ঘ, ল্যান্ডিং স্টেশন বানানো হয়েছে যেখানে ট্রলার ও ছোট লঞ্চ ভিড়তে পারবে। এছাড়া সৈকতের বিস্তীর্ণ প্রান্তর-জুড়ে লাল কাঁকড়ার ছোটাছুটি ভিন্ন সৌন্দর্যের লীলাভূমিতে পরিণত হয়েছে তারুয়া দ্বীপটি।

এখানে কোনো হোটেল বা রেস্টুরেন্ট নেই। তবে স্থানীয়দের সহায়তায় ইচ্ছেমতো রান্না করিয়ে খেতে পারবেন। অথবা নিজেরা রান্না করে খেতে হবে।

পর্যটকদের নির্বিশেষে ভ্রমণের জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেওয়া আছে। সেখানে পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্য সার্বক্ষণিক পুলিশি টহল রাখা হয়েছে।

পর্যটন সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এখন সময় এসেছে তারুয়া দ্বীপকে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন কেন্দ্রে রূপান্তরিত করার। প্রকৃতির অমূল্য এ রত্নকে পর্যটকদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত করতে পারলে এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের এক নতুন দিগন্তের সূচনা করবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন....

আমাদের ফেসবুক পাতা

আজকের আবহাওয়া

পুরাতন সংবাদ খুঁজুন

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
১০১১১৩
১৫১৬১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭
৩০  

এক্সক্লুসিভ আরও