বরিশালে দৌরাত্ম্য বাড়ছে হানিট্র্যাপ চক্রের
মে ২২ ২০২৬, ০৪:৩৮
আরিফ হোসেন ॥ বরিশাল নগরজুড়ে বাড়ছে ‘হানিট্র্যাপ’ আতঙ্ক। আবাসিক হোটেল, ভাড়া বাসা, পার্কের নির্জন স্থান, ভাসমান নৌকা ব্যবহার করে চলছে এসব বাণিজ্য। এমনকি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে ব্যবহার করে গড়ে উঠেছে এদের সংঘবদ্ধ চক্র। আর এদের পাতা ফাঁদে পা দিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে অসংখ্য নিরীহ মানুষ।
গত তিনমাসে বরিশাল মহানগরীতে অন্তত অর্ধশত হানিট্র্যাপের ঘটনা ঘটেছে। এরমধ্যে ১০/১২টি আলোচিত হানিট্র্যাপ ঘটনার তথ্য সামনে এসেছে। এসব ঘটনায় নারী সদস্যদের ব্যবহার করে টার্গেট ব্যক্তিকে আপত্তিকর পরিস্থিতিতে ফেলে ভিডিও ধারণ, পরে ব্ল্যাকমেইল ও চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে নতুন করে উঠেছে বিতর্কিত প্রশ্ন, শুধু চক্রের সদস্যদেরই নয়, অসামাজিক উদ্দেশ্য নিয়ে সেখানে যাওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত বলে দাবী করেছেন সচেতন নাগরিকদের অনেকে। তাদের যুক্তি হচ্ছে, এতে করে এসব অনৈতিক কর্মকা- লোভীদেরও একটা শিক্ষা হবে।
সর্বশেষ গত ২০ মে বৃহস্পতিবার রাতে নগরীর বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে বরিশাল কোতোয়ালি মডেল থানা পুলিশ ৪ নারীসহ নয়জন হানিট্র্যাপ সদস্যকে আটক করে। আটককৃত চারজন নারী সদস্যরা হচ্ছেন – মাহফুজা বেগম (৪৬), সুমী (৩০), ছোয়া আক্তার সোনিয়া (২৬) ও আখি আক্তার (৩৮) এবং আটককৃত পাঁচজন পুরুষ সদস্য যথাক্রমে- ইসতিয়াক আহমেদ বুলেট (৫০), হোসেন শাহীন (৪৫), সাকিব চৌধুরী (৩৮), ফেরদৌস (২৯), এবং মামুন মৃধা (৩৮)।
পুলিশ বলছে, দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ চক্র নগরীর বিভিন্ন হোটেল ও নির্জন বাসা ব্যবহার করে এ ধরনের প্রতারণা চালিয়ে আসছিল। এরা সবাই ঐ চক্রের সদস্য। এ ঘটনায় নগরজুড়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
গত ফেব্রুয়ারিতে বরিশালে চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করে কোতোয়ালি মডেল থানা পুলিশ। অভিযোগ ছিল, এক ব্যক্তিকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে নগরীর একটি বাসায় নিয়ে আপত্তিকর ভিডিও ধারণ করে ৫০ হাজার টাকা আদায় করা হয়। পরে ভুক্তভোগীর অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এরপর মার্চের শুরুতে নগরীর গির্জামহল্লা এলাকার একটি আবাসিক হোটেলে অভিযান চালিয়ে এক তরুণীসহ দুইজনকে আটক করে পুলিশ। মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, পূর্বপরিকল্পিতভাবে এক ব্যক্তিকে হোটেলে ডেকে নিয়ে তার আপত্তিকর ভিডিও ধারণ করা হয় এবং তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে টাকা দাবি করা হয়। এ ঘটনায় হোটেল মালিক, ব্যবস্থাপকসহ ১১ জনকে আসামি করা হয়।
পুলিশ সূত্র বলছে, গত তিনমাসে বরিশাল মহানগরীতে অন্তত ১২ থেকে ১৫ জনকে টার্গেট করে হানিট্র্যাপের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এরমধ্যে কয়েকটি ঘটনায় মামলা হয়েছে, আবার অনেক ভুক্তভোগী সামাজিকভাবে সম্মানহানির ভয়ে প্রকাশ্যে আসেননি। যদিও সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি।
এ ঘটনার তদন্ত সংশ্লিষ্ট বরিশাল মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আল মামুন উল ইসলাম বলছেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে চক্রগুলো প্রথমে মোবাইল ফোন বা ফেসবুকের মাধ্যমে যোগাযোগ করে। এরপর বন্ধুত্ব বা প্রেমের সম্পর্কের অভিনয় করে নির্জন স্থানে ডেকে নেয়া হয়। সেখানে আগে থেকেই অবস্থান নেয় চক্রের অন্য সদস্যরা। পরে আপত্তিকর ছবি বা ভিডিও ধারণ করে টাকা আদায় করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় কিছু হোটেল বা অসাধু কর্মচারীর সম্পৃক্ততার অভিযোগও উঠেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ভুক্তভোগী জানান, একদিন সকালে তার ফোনে একটি ভিডিও কল আসে। তিনি রিসিভ করতেই ওপ্রান্তে প্রায় নগ্ন এক নারী শরীরের একাংশ দেখিয়ে কথা বলে ও তাকে প্রলোভিত করে। পরে নগরীর চাঁদমারি খেয়াঘাটে তার সাথে সরাসরি আলাপ ও নৌকা নিয়ে ভ্রমণ এর প্রস্তাব দেন। ওপারে নির্জন স্থানে নৌকা থামিয়ে ঘনিষ্ঠ হতে গেলেই পাঁচ-ছয়জন কিশোর তাদের ঘীরে ফেলে ও ভিডিও ধারণ করে টাকা দাবী করে। তখন সে বুঝতে পারে এটি পরিকল্পিত ফাঁদ ছিলো।
বরিশাল কাউনিয়া, বিমানবন্দর ও মডেল থানায় এ নিয়ে অসংখ্য অভিযোগ দায়ের হয়েছে বলে স্বীকার করেন দায়িত্বরত কর্মকর্তারা। শুধু মডেল থানাতেই রয়েছে প্রায় অর্ধশত অভিযোগ।
ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আল মামুন জানালেন, গত তিনমাসে প্রায় দুই ডজন হানিট্র্যাপ সদস্য আটক হয়েছে মডেল থানায়। সর্বশেষ ২০ মে রাতে নগরীর বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে ৯ জনকে আটক করা হয়েছে। পুলিশের এই অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি।
এদিকে বরিশালের সচেতন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিসহ একাধিক মানুষের দাবী, শুধু প্রতারণাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেই হবে না; যারা অনৈতিক উদ্দেশ্যে এসব স্থানে যান, নারীকণ্ঠ শুনলেই লোভী হয়ে ওঠে তাদের বিরুদ্ধেও সামাজিক ও আইনি জবাবদিহিতা থাকা প্রয়োজন। তাদের মতে, মানুষের নৈতিক অবক্ষয়ের কারণেই এ ধরনের অপরাধচক্রের বিস্তার লাভ করছে।
তবে মানবাধিকার সংগঠন ও কর্মীদের একাংশ বলছেন, অপরাধের শিকার ব্যক্তিকে দ্বিতীয়বার সামাজিকভাবে হেয় না করে মূল অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
এ বিষয়ে পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলেন, নগরীর আবাসিক হোটেলগুলোতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। সন্দেহভাজন চক্রগুলোর তথ্য সংগ্রহ চলছে এবং প্রযুক্তিগত নজরদারিও জোরদার করা হয়েছে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে সংঘটিত অপরাধ প্রতিরোধে সাইবার মনিটরিং বাড়ানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান অনুষদের চেয়ারম্যান দিলআফরোজ খানম বলেন, আমি প্রথমেই মনে করি যিনি এই ফাঁদে পড়ছেন তিনিও সমান দোষী। তাকেও শাস্তির আওতায় আনা জরুরী।
তিনি বলেন, আমাদের লোভ ও নৈতিক অবক্ষয়ের কারণেই সমাজে এসব ট্র্যাপ, হানিট্র্যাপ ইত্যাদি অপকর্ম বৃদ্ধি পেয়েছে। এর পিছনে প্রথম ও প্রধান কারণ হচ্ছে, সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়। এছাড়াও বেকারত্ব, দ্রুত অর্থ আয়ের প্রবণতা প্রযুক্তির অপব্যবহার, সব মিলিয়ে বরিশাল শুধু নয় সারাদেশে হানিট্র্যাপ এখন নতুন ধরনের সংগঠিত অপরাধে রূপ নিচ্ছে। এরসাথে যুক্ত হয়েছে মাদকের সহজলভ্যতা। মাদক এখন সমাজের মহামারী। তরুণ ও যুবসমাজকে এ থেকে মুক্ত রাখার একটাই উপায় তাদের কর্মব্যস্ত করে তোলা।
তিনি আরো বলেন, ধৃত অপরাধীদের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। সময়মতো কঠোর ব্যবস্থা না নিলে এটি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।









































