ঢাকা: ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৭নং ওয়ার্ডের মানিকনগর এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা ছিলেন রহিমা বদরুদ্দিন। তিনি মারা গেছেন ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে। সিটি করপোরেশন থেকে তার মৃত্যুসনদও নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু গত ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটার তালিকা তার নাম ছিল। তার স্বজনরা মানিকনগর উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দিতে গিয়ে তালিকায় তার নাম দেখে অবাক হয়েছেন। তাদের প্রশ্ন, প্রায় একবছর আগে মৃত ব্যক্তির মৃত্যুসনদ নেওয়ার পরও ভোটার তালিকায় তার নাম থাকে কীভাবে।
একইভাবে ঢাকা-৬ আসনের একটি ভোটকেন্দ্রে ভোট দিতে গিয়ে তালিকায় দুই বছর আগে মৃত বাবার নাম পেয়েছেন এক ভোটার। তার বাবা মারা গেছেন ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। নিয়ম অনুযায়ী সিটি করপোরেশন থেকে বাবার মৃত্যুসনদও নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ভোটার তালিকায় পরিবারের অন্যদের সঙ্গে মৃত বাবার নামও দেখতে পেয়েছেন তিনি। কেবল রাজধানী ঢাকা নয়, অনুসন্ধান চালালে দেশজুড়েই এমন ঘটনার বহু উদাহরণ মিলবে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বর মারা যান চাঁদপুরের শাহরাস্তি থানার বাসিন্দা আমির হোসেন। মৃত্যুর পর স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ থেকে আমির হোসেনের মৃত্যুসনদ নেওয়া হয়েছিল। তারপরও ভোটার তালিকায় তার নামটি ঠিকই রয়ে যায়।
মৃত্যু নিবন্ধন ও সনদ নেওয়ার পরও মৃত মানুষরা কীভাবে ভোটার তালিকায় থেকে যাচ্ছে তা অনুসন্ধানে জানা যায়, মূলত নির্বাচন কমিশনের সার্ভারের সঙ্গে রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ের সার্ভারের মধ্যে সমন্বয় না থাকায় এমনটি হচ্ছে। রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ের সার্ভারে কোনো ব্যক্তি মৃত হিসেবে নিবন্ধিত হলেও সেই তথ্য ইসিতে হালনাগাদ করার কোনো ব্যবস্থা এখন পর্যন্ত গড়ে তোলা হয়নি।
বাংলাদেশে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের দায়িত্বে রয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীন রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়। আর ভোটার নিবন্ধন ও ভোটার তালিকা হালনাগাদের কাজ করে নির্বাচন কমিশনের জাতীয় পরিচয়পত্র (এআইডি) শাখা। স্থানীয় সরকারের ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের মাধ্যমে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের কাজ সম্পন্ন হয়। সরাসরি এসব কার্যালয়ে গিয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র (এনআইডি, হাসপাতাল সনদ) জমা দিয়ে নিবন্ধন করে জন্ম ও মৃত্যুর সনদ সংগ্রহ করা যায়। অথবা ওয়েবাসইটে আবেদন জমা দিয়ে তার প্রিন্ট কপি এসব কার্যালয়ে গিয়ে ১৫ দিনের মধ্যে জমা দিতে হয়।
সরকারি ভাতাসহ উত্তরাধিকার, পারিবারিক সম্পত্তির বণ্টন, পেনশন প্রাপ্তি, জমিজমা বা সম্পত্তির নামজারিসহ নানা প্রয়োজনে মৃত্যু নিবন্ধন সনদ প্রয়োজন। কোনো মৃত ব্যক্তির যদি জন্মনিবন্ধন না থাকে, তাহলে তার মৃত্যুর পর মৃত্যুনিবন্ধন করার আগে জন্মনিবন্ধন করিয়ে নিতে হয়। জন্ম ও মৃত্যুর ৪৫ দিনের মধ্যে নিবন্ধন করলে কোনো ফি লাগে না। ৪৫ দিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে করলে ২৫ টাকা এবং পাঁচ বছর পর করালে ৫০ টাকা ফি লাগে। তথ্য সংশোধনের জন্য ১০০ টাকা লাগে।
দেশের সব মানুষকে জন্ম নিবন্ধনের আওতায় আনতে ২০০১ সালে ইউনিসেফ-বাংলাদেশের সহায়তায় প্রকল্প নেওয়া হয়। তখন হাতে লেখা জন্ম ও মৃত্যুসনদ দেওয়া হতো। এরপর আইন সংশোধন করে ২০০৪ সালে ‘জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন আইন’ করা হয়। সেটি ২০০৬ সালের ৩ জুলাই নতুন কার্যকর হয়। ২০১০ থেকে অনলাইনে জন্মনিবন্ধন শুরু হয়। নিবন্ধনের পুরোনো সফটওয়্যারটি নানা সমস্যায় জর্জরিত ছিল। ২০১৯ সালে বার্থ-ডেথ রেজিস্ট্রেশন ইনফরমেশন সিস্টেম (বিডিআরআইএস) নামে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের নতুন সফটওয়্যার চালু করা হয়।
জানতে চাইলে ইসির এনআইডি অনুবিভাগের এক কর্মকর্তা নিজেদের সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে বলেন, দেশের বিদ্যমান সিস্টেমে মৃত মানুষের তালিকা নানা জায়গায় নানাভাবে যুক্ত হচ্ছে। যেমন- হাসপাতাল, কবরস্থান, সিটি করপোরেশনসহ ইউনিয়ন পরিষদ ও ময়নাদন্তের রিপোর্ট। কিন্তু এসব জায়গা থেকে সরাসরি এনআইডিতে মৃত্যুর ডেটা আপডেট হচ্ছে না। ভোটের আগে বাড়ি বাড়ি গিয়ে যে ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা হয়, সেখানে বাড়ির মানুষকে জিজ্ঞাসা করেই নতুন ভোটার তালিকা প্রণয়ন করা হয়। এতে করে তথ্যের গরমিল থেকে যায় এবং অনেক সময় দুর্গম এলাকার মানুষের মৃত্যুর তথ্য গণনার বাইরে থেকে যাচ্ছে।
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের আঞ্চলিক অফিস, কবরস্থানসহ স্থানীয় সরকারের অধীনে থাকা রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয় ঘুরে জানা যায়, একজন মানুষ মারা গেলে উল্লিখিত জায়গাগুলো থেকে যে মৃত্যুসনদ বা সার্টিফিকেট দেওয়া হয় সেটা এনআইডি সার্ভারে আপডেট হচ্ছে না। সরেজমিন ঢাকার সায়েদাবাদ আঞ্চলিক কার্যালয় অঞ্চল-৫ এবং খিলগাঁওয়ের আঞ্চলিক কার্যালয় অঞ্চল-২ অফিসে দেখা গেছে, সেখানে মৃত ব্যক্তিদের স্বজনরা মৃত্যুসনদ নিতে এলে সিটি করপোরেশনের প্যাডে লিখে তা দেওয়া হচ্ছে। সেটা ন্যাশনাল সার্ভারে আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে দেওয়ার কথা থাকলেও সার্ভার ডাউনের দোহাই দিয়ে মাঝে মাঝেই আঞ্চলিক অফিসের প্যাডেই অ্যানালগ সিস্টেমের মৃত্যুসনদ দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ডিএসসিসির কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করা শর্তে বলেন, সার্ভার ডাউনের জন্যই প্রায়ই এমনটি হয়।
এদিকে রেজিস্ট্রার জেনারেল কার্যালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ন্যাশনাল সার্ভারে মৃত্যুর হিসাব না উঠলে সেটা হিসাবের মধ্যে আনা যায় না, ফলে মৃত্যুর সঠিক গণনায় বড় ধরনের গরমিল থেকে যায়। নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে জন্ম নিবন্ধনের তথ্য বিনিময়ের ব্যবস্থা আছে। কিন্তু মৃত্যু নিবন্ধনের ক্ষেত্রে ছিল না বলে জানান রেজিস্ট্রার জেনারেল (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ড. আবু নছর মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ। তিনি জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, ‘মৃত্যু নিবন্ধনের ডেটা এক্সচেঞ্জের জন্য দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা চলছে। বিষয়টি নিয়ে নির্বাচনের আগে একাধিকবার বৈঠক হয়েছে। দুই পক্ষের মধ্যে একটা সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হলে মৃত্যু নিবন্ধনের তথ্যও বিনিময় হবে।’
সরকারি বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত, জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্টের ডেটাবেজের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও সমন্বয়ের অভাবে জন্ম ও মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে হিসাবের গরমিল থেকে যাচ্ছে। বিবিএসের স্যাম্পল ভাইটাল রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম (এসভিআরএস) ২০২৩-এর প্রতিবেদনের তথ্যমতে, দেশের জনসংখ্যা ১৭ কোটি ২৯ লাখ ২০ হাজার। সংস্থাটির ২০২৩ সালে প্রকাশিত তথ্য বলছে, দেশে প্রতি বছর গড়ে ১০ লাখ ৪১ হাজার ৩৩১ জন মৃত্যুবরণ করে। অন্যদিকে রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ের জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন তথ্যমতে, ২০২৩ সালে ৭ লাখ ৩০ হাজার ৯৩৬ জন বা অন্তত ৭০ শতাংশ মানুষের মৃত্যু নিবন্ধন করা হয়েছে। ফলে ৩ লাখ ১০ হাজার ৩৯৫ জন বা প্রায় ৩০ শতাংশ মৃত ব্যক্তি মৃত্যু নিবন্ধনের বাইরে রয়ে গেছে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ভোটার তালিকা হালনাগাদের সময় ২১ লাখের মতো মৃত ব্যক্তির নাম ভোটার তালিকা থেকে কর্তন করা হয়। বর্তমানে বাড়ি বাড়ি যাওয়া ছাড়া ভোটার তালিকা থেকে মৃতদের নাম বাদ দেওয়ার কোনো প্রক্রিয়া নেই। এ কারণে মানুষ মরে গিয়েও ভোটার তালিকায় জীবিত থেকে যাচ্ছে। বহু বছর পরে হলেও রেজিস্ট্রার জেনারেলের সার্ভার থেকে তথ্য নিয়েও মৃতদের নামের তালিকা হালনাগাদ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসি। তা হলে বছরের যেকোনো সময় মৃতদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া যাবে। এ জন্য আজ মঙ্গলবার এনআইডি মহাপরিচালক এ এস এম হুমায়ুন কবীরের সভাপতিত্বে নির্বাচন ভবনে বৈঠক হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের (এনআইডি) মহাপরিচালক এ এস এম হুমায়ুন কবীর জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, ‘আমরা যখন ভোটার নিবন্ধন বাড়ি বাড়ি গিয়ে করি তখনই শুধু মৃত ব্যক্তির তথ্য কালেক্ট করতে পারি। এর বাইরে মৃত ব্যক্তির তথ্য কালেক্ট করার আমাদের আর কোনো প্রসেস বর্তমানে নেই। তবে যিনি মারা যান তার আত্মীয়স্বজন বা কাছের কেউ যদি আমাদের ইনফর্ম করেন তখন তাদের নাম আমরা সার্ভার থেকে বাদ দেই। এই বিষয়টা নিয়ে আমরা একটা স্থায়ী সিস্টেম ডেভেলপ করার চেষ্টা করছি, যেন মৃত ব্যক্তির নাম খুব সহজে বাদ দেওয়া যায়।’
ন্যাশনাল সার্ভার বা সিটি করপোরেশন থেকে মৃত মানুষের ডেটা কালেক্ট করার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি যে সিস্টেমটার কথা বললাম সেটার মধ্যেই ন্যাশনাল সার্ভার আর সিটি করপোরেশনের তথ্যও সংযুক্ত করা হবে। আমাদের যেহেতু ভোটার তালিকা বানাতে হয় এবং মৃত ব্যক্তিকে কখনই ভোটার বলতে পারি না। তাই মৃত ব্যক্তিকে বাদ দেওয়ার বিষয়টিও আমাদের দায়। এখন বর্তমানে মৃত্যুসনদ দেওয়া নিয়ে যারা যারাই কাজ করছে তাদের তথ্যও আমরা নেব। কারণ তথ্য অথেনটিকের একটা বিষয় আছে।’








































