কাঁপছে বিশ্ব জ্বালানি সংকটে
মার্চ ০৯ ২০২৬, ০২:২৮
কুয়েত সীমান্তে রক্তক্ষয় ও বিমানবন্দরের ধ্বংসযজ্ঞ
গতকাল রোববার সকালে কুয়েত কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে যে, দেশটির সীমান্তে ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় দুই সীমান্তরক্ষী নিহত হয়েছেন। কুয়েতের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বর্তমানে ‘একঝাঁক শত্রুপক্ষীয় ড্রোন’ মোকাবিলা করছে। সবচেয়ে বড় আঘাতটি এসেছে কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। ড্রোন হামলায় বিমানবন্দরের জ্বালানি ট্যাংক এবং পাবলিক ইনস্টিটিউশন ফর সোশ্যাল সিকিউরিটির প্রধান ভবনে ভয়াবহ আগুন ধরে গেছে। বর্তমানে ফায়ার সার্ভিসের কয়েক ডজন ইউনিট সেখানে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালাচ্ছে।
পরিস্থিতি বিবেচনায় কুয়েতের জাতীয় তেল কোম্পানি তাদের অপরিশোধিত তেল উত্তোলন ‘সতর্কতামূলক ব্যবস্থা’ হিসেবে কমিয়ে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এই ঘোষণার পরপরই বিশ্ববাজারে তেলের দাম নতুন করে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সৌদি আরব ও কাতারে ড্রোনের বৃষ্টি
কুয়েতের পাশাপাশি সৌদি আরবের রিয়াদেও নজিরবিহীন হামলা চালানো হয়েছে। সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি অনুযায়ী, গতকাল সকালে রিয়াদের কূটনৈতিকপাড়ায় চালানো একটি ড্রোন হামলা তারা প্রতিহত করেছে। এর আগে গত রাতে অন্তত ১৫টি ড্রোন ভূপাতিত করার কথা জানিয়েছিল মন্ত্রণালয়। গতকাল রিয়াদের কাছে আরও তিনটি ড্রোন ধ্বংসের খবর পাওয়া গেছে। অন্যদিকে, কাতারও নতুন করে হামলার শিকার হওয়ার খবর দিয়েছে। যদিও দেশটি সীমিত পরিসরে তাদের আকাশপথ খোলা রাখার চেষ্টা করছে, কিন্তু ক্রমাগত হামলার আতঙ্কে জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে।
তেহরানের তেল শোধনাগারে ইসরাইলি আঘাত
ইরানের রাজধানী তেহরানে গতকাল এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ইসরাইলি বিমান বাহিনীর হামলায় তেহরানের একটি বিশাল তেল শোধনাগারে আগুন লেগে গেছে। আকাশজুড়ে আগুনের লেলিহান শিখা আর ধোঁয়ার কুণ্ডলী প্রমাণ করছে যে, এই যুদ্ধের রূপ বদলে যাচ্ছে। ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর (আইডিএফ) দাবি, এই শোধনাগারটি ইরানি সেনাবাহিনী তাদের বিভিন্ন সামরিক সংস্থায় জ্বালানি সরবরাহের কাজে ব্যবহার করত। যুদ্ধের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো বড় বেসামরিক শিল্প অবকাঠামোকে সরাসরি লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। এই শোধনাগারটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পুরো উত্তর ইরানে জ্বালানি সরবরাহে বিপর্যয় নেমে আসার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের ‘প্রতিরোধের শপথ’
দেশের ওপর ক্রমাগত হামলার মুখে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, ইরান প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক চায়, কিন্তু অন্য কোনো দেশের ভূখণ্ড (ইরাক বা সিরিয়া) ব্যবহার করে যদি ইরানের ওপর হামলা চালানো হয়, তবে তার উপযুক্ত জবাব দেয়া হবে।
পেজেশকিয়ান বলেন, ‘ইরান শত্রুকে তার এক ইঞ্চি জমিও দখল করতে দেবে না। জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে আমরা আমাদের মাটি ও পানি রক্ষা করব।’
একই সময়ে ইরানের বিপ্লবী গার্ড কোরের (আইআরজিসি) মুখপাত্র আলি মোহাম্মদ নাইনি দাবি করেছেন যে, ইরানের বর্তমান গতির এই তীব্র যুদ্ধ আরও অন্তত ছয় মাস চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা রয়েছে। এই বক্তব্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবির ঠিক বিপরীত, যিনি দাবি করেছিলেন যে মার্কিন অভিযানে ইরানের ‘শয়তানি সাম্রাজ্য’ গুঁড়িয়ে গেছে।
ট্রাম্পের ‘অহংকার’ ও যুক্তরাজ্যের প্রতি তাচ্ছিল্য
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সামপ্রতিক মন্তব্যে যুক্তরাজ্যের মতো ঘনিষ্ঠ মিত্রকেও খোঁচা দিতে ছাড়েননি। যুক্তরাজ্যের পক্ষ থেকে তাদের বিমানবাহী রণতরি ‘এইচএমএস প্রিন্স অব ওয়েলস’ মোতায়েনের প্রস্তাবের জবাবে ট্রাম্প বলেন, এই যুদ্ধে যুক্তরাজ্যের আর কোনো দরকার নেই। তিনি ব্যঙ্গ করে লেখেন, ‘আমরা জিতে যাওয়ার পর যারা যোগ দিতে চায়, আমাদের তাদের প্রয়োজন নেই।’ ট্রাম্পের এই একপাক্ষিক ও উদ্ধত আচরণ আন্তর্জাতিক মহলে মিত্র দেশগুলোর মধ্যে ফাটল তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
লেবাননে মানবিক বিপর্যয় : ৪১ প্রাণহানি
লেবাননের বৈরুত এবং বেকা উপত্যকায় ইসরাইলি বাহিনীর বিশেষ অভিযানে অন্তত ৪১ জন নিহত হয়েছেন। এদের মধ্যে তিনটি শিশু এবং লেবাননের তিন সেনাসদস্যও রয়েছেন। ইসরাইলি দাবি অনুযায়ী, ৪০ বছর আগে নিখোঁজ হওয়া এক সামরিক পাইলটের দেহাবশেষ উদ্ধারের জন্য এই অভিযান চালানো হয়েছিল। কিন্তু স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, একটি পুরোনো কবর খুঁড়েও ইসরাইলিরা কিছুই পায়নি, বরং অহেতুক বেসামরিক প্রাণহানি ঘটেছে।
বিশ্বশান্তি ও অর্থনীতির ভবিষ্যৎ
মধ্যপ্রাচ্যের এই অগ্নিকাণ্ড এখন আর কেবল আঞ্চলিক সংকট নেই। কুয়েত ও সৌদি আরবের মতো তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো আক্রান্ত হওয়ায় বিশ্বজুড়ে খাদ্য ও জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হতে শুরু করেছে। নরওয়েতে মার্কিন দূতাবাসের কাছে বিকট বিস্ফোরণ এবং জর্ডানের আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, যুদ্ধের আঁচ ইউরোপ ও অন্যান্য আরব দেশগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ছে।
২০২৬ সালের ৮ মার্চের এই দিনটি মানবসভ্যতার জন্য এক চরম সতর্কবাণী।
একদিকে ইরানের অদম্য জেদ, অন্যদিকে ট্রাম্পের রণংদেহী অহংকার এই দুইয়ের জাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে সাধারণ মানুষ। যদি এখনই কোনো কূটনৈতিক সমাধান না আসে, তবে এই ‘ছয় মাসের সক্ষমতার’ লড়াই পুরো পৃথিবীকে এক মহা-দুর্ভিক্ষের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
বারুদের গন্ধ আর লাশের মিছিল ছাপিয়ে শান্তি কবে ফিরবে, সেই উত্তর আজ কারোরই জানা নেই।









































