মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিতে নতুন মোড়

মার্চ ১০ ২০২৬, ০২:৫৯

ইরানের ধর্মীয় নেতৃত্ব সর্বশেষ পদক্ষেপে সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনিকে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। এই পদক্ষেপ শুধুমাত্র অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিকদের কাছে একটি স্পষ্ট বার্তা পাঠিয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সরাসরি উপেক্ষা করে মোজতবা খামেনির নিয়োগ কার্যকর করা হয়েছে।

উত্তরাধিকার এবং ক্ষমতার স্থানান্তর : ইরানের বিশেষজ্ঞ পর্ষদ মোজতবা খামেনিকে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত করেছে। তেহরান সূত্রের মতে, মোজতবা কট্টরপন্থি নেতাদের সমর্থন পেয়েছেন, যারা দেশের ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক কাঠামোর ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে আগ্রহী। এই পদক্ষেপ ইরানের চলমান যুদ্ধ এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যৌথ আগ্রাসনের মধ্যে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যকে নতুনভাবে প্রভাবিত করতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষক অ্যালেক্স ভাতাঙ্কা বলেছেন, ‘মোজতবা খামেনিকে ক্ষমতায় আনাটা আগের কৌশলের পুনরাবৃত্তি। যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর তার বাবার জায়গায় মোজতবাকে বসানো হয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য স্পষ্ট অপমান।’

অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ ও চাপ : ইরানের অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে, মোজতবা খামেনি জনগণের অসন্তোষ, চলমান সংঘাত এবং অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় বড় চাপের মুখোমুখি হবেন। এই চাপের মধ্যে রয়েছে ধসে যাওয়া অর্থনীতি, মূল্যস্ফীতি, মুদ্রার পতন এবং দরিদ্রতা বৃদ্ধি। তবে তিনি দ্রুত ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার দিকে এগোবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ধর্মীয় শাসনব্যবস্থায় সর্বোচ্চ নেতা ইরানের রাজনৈতিক ও পারমাণবিক নীতি নির্ধারণে সর্বোচ্চ ক্ষমতা রাখেন। মোজতবা খামেনি নির্বাচিত হয়েছেনকট্টরপন্থি নেতা হিসেবে, যার লক্ষ্য দেশের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা কঠোরভাবে বজায় রাখা।

কট্টরপন্থি নীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা : বিশ্লেষকরা মনে করেন, মোজতবা খামেনি ইরানের বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি)-এর ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে পারেন। অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করা হবে এবং ভিন্নমত দমন করা হবে। তেহরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ আঞ্চলিক সূত্র জানিয়েছে, ‘মোজতবা খামেনির অধীনে দেশ আরও কঠোর ও কট্টর হয়ে যাবে। যুদ্ধ শেষ হলেও অভ্যন্তরীণ দমননীতি অব্যাহত থাকবে।’ মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের কিছু সরকার এই নিয়োগকে যুক্তরাষ্ট্রকে একটি সরাসরি বার্তা হিসেবে দেখছে- ইরান কোনো অবস্থাতেই পিছু হটবে না এবং শেষ পর্যন্ত লড়াই চালাবে।

মোজতবার রাজনৈতিক পরিচিতি : মোজতবা খামেনি ৫৬ বছর বয়সি, তিনি ইরানের মধ্যম ও ক্ষমতাশালী ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ঘনিষ্ঠ ছিলেন। বিশেষ করে সংস্কারপন্থিদের বিরোধী ছিলেন, যারা পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সংযোগ বাড়াতে আগ্রহী। মোজতবা তার বাবার শাসনের সময় নিরাপত্তা ও ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করেছেন।

তিনি কুম শহরের সেমিনারিতে পড়াশোনা করেছেন এবং হুজ্জাতুল ইসলাম মর্যাদা অর্জন করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ ২০১৯ সালে তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, কারণ তিনি সরকারি পদে না থাকলেও সর্বোচ্চ নেতার পক্ষে সরকারিভাবে প্রতিনিধিত্ব করতেন।

আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রভাব : মোজতবা খামেনির নিয়োগ ইরানের অভ্যন্তরীণ শক্তি পুনর্বিন্যস্ত করার সাথে সাথে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক প্রভাবেও প্রভাব ফেলবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার পর, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা উপসাগরীয় দেশগুলোতে বৃদ্ধি পেয়েছে। এ পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতকে আরও বিস্তৃত করছে।

বিশ্লেষক পল সালেম উল্লেখ করেন, মোজতবা খামেনি সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি বা কূটনৈতিক সমাধানে আগ্রহী হবেন না। তার পদক্ষেপ দেশকে আরও কট্টরপন্থার পথে পরিচালিত করবে। তিনি বলেন, ‘দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি ভয়াবহ এবং অত্যন্ত অস্থিতিশীল।’

যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনকে বার্তা : মোজতবা খামেনির নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্রকে একটি স্পষ্ট বার্তা পাঠিয়েছে যে, ইরান তাদের শাসনব্যবস্থা রক্ষা করতে কোনো আপস করবে না। এই বার্তাটি নতুন সমঝোতা বা শান্তি প্রক্রিয়ার জন্য খুবই চ্যালেঞ্জিং। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের মধ্যে মোজতবা খামেনির নেতৃত্ব মধ্যপ্রাচ্যে আরও তীব্র প্রতিক্রিয়া এবং সংঘাত বাড়াবে।

জনগণের দৃষ্টিভঙ্গি : ইরানের জনগণ বর্তমানে জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি। মূল্যস্ফীতি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট, খাদ্যপণ্য ঘাটতি এবং দৈনন্দিন জীবন যাপন কঠিন হয়ে উঠেছে। নতুন নেতৃত্বের অধীনে এই চ্যালেঞ্জ আরও জটিল হবে। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশ ও আন্তর্জাতিক সমপ্রদায় বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে, কারণ মোজতবা খামেনির নেতৃত্বে ইরানের কৌশলগত সিদ্ধান্তগুলো আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করবে।

মোজতবা খামেনির সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নিয়োগ ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক কাঠামোর পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিত দেয়। এটি যুক্তরাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ, আঞ্চলিক দেশগুলোকে সতর্ক এবং ইরানের জনগণকে কঠোর অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণের প্রস্তুতি নিতে নির্দেশ করছে। চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে মোজতবা খামেনির পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্য ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে নতুনভাবে চ্যালেঞ্জ করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদন ছাড়া কোনো নেতা টিকবে না : ট্রাম্প

ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে আবারও কড়া অবস্থান প্রকাশ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদন ছাড়া ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা দীর্ঘদিন ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারবেন না।

গত রোববার দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এমন মন্তব্য করেন, যখন ইরানের বিশেষ পরিষদ অংংবসনষু ড়ভ ঊীঢ়বৎঃং নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়া চালাচ্ছিল। কয়েক ঘণ্টা পরই পরিষদটি গড়লঃধনধ কযধসবহবর-কে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত করে।

মোজতবা খামেনি হলেন সাবেক সর্বোচ্চ নেতা অষর কযধসবহবর-এর ছেলে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ অভিযানে তিনি নিহত হন বলে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হয়েছে। ওই ঘটনার পর থেকেই ইরানের নেতৃত্ব নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।

এবিসি নিউজকে দেয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ইরানের নতুন নেতা নির্বাচনের ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের মতামত গুরুত্বপূর্ণ। তার ভাষায়, ‘যে কেউ এই পদে আসতে চাইবেন, তাকে আমাদের কাছ থেকে অনুমোদন নিতে হবে। যদি সে অনুমোদন না পান, তাহলে তিনি বেশিদিন টিকতে পারবেন না।’

ট্রাম্প আরও বলেন, ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রকে আবারও একই ধরনের সংকট মোকাবিলা করতে হোক- তিনি তা চান না। তার মতে, পরিস্থিতি এমনভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা দরকার যাতে কয়েক বছর পর আবার নতুন করে সামরিক অভিযান বা সংঘাতের প্রয়োজন না পড়ে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট সতর্ক করে বলেন, সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো ইরানের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র চলে যাওয়ার সম্ভাবনা। তিনি বলেন, এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে তা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, পুরো বিশ্বের জন্যই বড় নিরাপত্তা ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াবে। তবে ট্রাম্পের এই মন্তব্যের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে তেহরান। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অননধং অৎধমযপযর বলেছেন, দেশের সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং এতে বাইরের কোনো শক্তির হস্তক্ষেপ গ্রহণযোগ্য নয়।

তিনি বলেন, ইরানের জনগণ নির্বাচনের মাধ্যমে অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টসের সদস্যদের নির্বাচিত করেন এবং তারাই সর্বোচ্চ নেতা নির্ধারণের সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করেন। ফলে এই প্রক্রিয়ায় বিদেশি কোনো দেশের প্রভাব খাটানোর সুযোগ নেই। এদিকে বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

তেহরানের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি পুতিনের : ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর গড়লঃধনধ কযধসবহবর-কে অভিনন্দন জানিয়েছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ঠষধফরসরৎ চঁঃরহ। একই সঙ্গে তিনি ইরানের প্রতি রাশিয়ার ‘অটল সমর্থন’ অব্যাহত থাকবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন।

সোমবার পাঠানো এক বার্তায় পুতিন বলেন, তেহরানের সঙ্গে মস্কোর ঐতিহাসিক সম্পর্ক ভবিষ্যতেও অটুট থাকবে। তিনি উল্লেখ করেন, ইরান সব সময় রাশিয়ার ওপর আস্থা রাখতে পারে এবং দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারিত্ব আরও শক্তিশালী হবে।

মার্কিন ও ইসরাইলি বিমান হামলায় সাবেক সর্বোচ্চ নেতা অষর কযধসবহবর নিহত হওয়ার পর তার ছেলে মুজতবা খামেনিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত করা হয়। এরপরই তাকে অভিনন্দন জানিয়ে সমর্থনের বার্তা পাঠায় মস্কো।

পুতিন তার বার্তায় বলেন, বর্তমান অস্থির পরিস্থিতিতে ইরানের নেতৃত্ব গ্রহণ করা বড় দায়িত্বের বিষয়। তার ভাষায়, ‘ইরান যখন সশস্ত্র আগ্রাসনের মুখোমুখি, তখন এই গুরুত্বপূর্ণ পদে আপনার দায়িত্ব গ্রহণ সাহস ও দৃঢ়তার পরিচয় দেয়।’

রুশ প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, রাশিয়া অতীতের মতো ভবিষ্যতেও ইরানের নির্ভরযোগ্য অংশীদার হয়ে থাকবে। আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও কৌশলগত সহযোগিতার ক্ষেত্রে দুই দেশ একসঙ্গে কাজ চালিয়ে যাবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

তবে পুতিনের এই সমর্থনের বার্তা যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের সম্পূর্ণ বিপরীত। মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড়হধষফ ঞৎঁসঢ় ইতোমধ্যে মুজতবা খামেনিকে ইরানের নতুন নেতা হিসেবে মেনে নেয়ার বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন....

আমাদের ফেসবুক পাতা

আজকের আবহাওয়া

পুরাতন সংবাদ খুঁজুন

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১৩১৫
১৬১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭
৩০৩১  

এক্সক্লুসিভ আরও