ঢাকা: দেশের প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র চাষিদের প্রণোদনাসহ বিভিন্ন সুবিধা নিশ্চিত করতে টিসিবির ফ্যামিলি কার্ডের আদলে সারাদেশে চালু হতে যাচ্ছে ‘কৃষক কার্ড’ কার্যক্রম। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার আলোকে ১৮০ দিনের মধ্যে দেশের ৯টি জেলার ৯টি উপজেলায় প্রি-পাইলটিং কার্যক্রম চলতি সপ্তাহেই শুরু করা হবে বলে কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ‘পার্টনার প্রকল্প-প্রোগ্রাম অন অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড রুরাল ট্রান্সফরমেশন ফর নিউট্রিশন, এন্টারপ্রেনারশিপ অ্যান্ড রেসিলিয়েন্স কাজ করছে।
কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, তিনটি পর্যায়ে এ কার্ড দেওয়া হবে। এগুলো হলো— ভূমিহীন, প্রান্তিক এবং ক্ষুদ্র কৃষক। দেশের ৯টি জেলার ৯ ব্লক হলো— চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ, টাঙ্গাইল সদর, জামালপুরের ইসলামপুর, কক্সবাজারের টেকনাফ, পিরোজপুরের নেছারাবাদ, কুমিল্লার আদর্শনগর, পঞ্চগড় সদর, মৌলভীবাজারের জুড়ী এবং ঝিনাইদহের শৈলকুপার প্রায় ২০ হাজার পরিবার এ কৃষি কার্ডের আওতায় আসছে।
এ বিষয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব রফিকুল আই মোহামেদ বলেন, ‘ফ্যামিলি কার্ড এবং কৃষি কার্ড সম্পূর্ণ আলাদা দুটি বিষয়। ক্ষুদ্র কৃষককে কৃষি উৎপাদনের জন্য সহযোগিতা দেওয়া হবে এই কার্ডের মাধ্যমে। ফ্যামিলি কার্ডের মতোই এখানেও কৃষককে নগদ সহযোগিতা দেওয়ার চিন্তা রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘কৃষি কার্ড নিয়ে প্রথমেই প্রি-পাইলটিং করার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয়েছে। এখানে প্রায় ২০ হাজার কৃষককে পরীক্ষামূলকভাবে কার্ড প্রদান করা হবে। কার্ডে সহায়তা প্রদানের মধ্য দিয়ে তাদেরকে উৎপাদনে সহযোগিতা করা হচ্ছে সরকারের মূল লক্ষ্য।’
সূত্র আরও জানায়, প্রাক-পাইলট ও পাইলট পর্ব সফল হলে আগামী ৪ বছরের মধ্যে দেশব্যাপী এই কার্ডের মাধ্যমে ডিজিটাল কৃষি সেবা চালু করা হবে। এই কার্ডের মাধ্যমে কৃষকের পরিচয় ডিজিটাল করা হবে, যা ফ্যামিলি কার্ডের মতো কাজ করবে। মাছ চাষি, পশুপালক ও দুগ্ধ খামারিরাও এই কার্ডের সুবিধা পাবেন। ফ্যামিলি কার্ড সাধারণত পরিবারের নারীদেরকে প্রাধান্য দিয়ে বাস্তবায়ন করা হলেও কৃষি কার্ড পুরুষ কৃষকদের নামে করা হবে বলে কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। একই পরিবারে একসঙ্গে কৃষি কার্ড এবং ফ্যামিলি কার্ড থাকতে পারে এবং তাতে প্রক্রিয়াগত কোনো ত্রুটি থাকবে না বলে জানা যায়।
এ বিষয়ে সম্প্রতি তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন জানান, কৃষক কার্ড হবে ফ্যামিলি কার্ডের আদলে। তবে এটি শুধু একটি শারীরিক কার্ডে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ভার্চুয়াল ও মোবাইল অ্যাপভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কৃষকের সব তথ্য সংরক্ষিত থাকবে। জমির পরিমাণ, চাষ করা ফসলের ধরন, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) অ্যাকাউন্ট— সব কিছু এক প্ল্যাটফর্মে যুক্ত থাকবে। এর মাধ্যমে কৃষক সহজেই সার, বীজ, কীটনাশক ও কৃষিযন্ত্রপাতির মতো উপকরণ পেতে পারবেন। পাশাপাশি আবহাওয়া ও বাজার পরিস্থিতি সম্পর্কিত তথ্যও পাবেন। এতে করে উৎপাদন পরিকল্পনা করা হবে আরও সহজ ও কার্যকর। প্রণোদনা, ভর্তুকি কিংবা দুর্যোগকালীন সহায়তা সরাসরি কৃষকের অ্যাকাউন্টে পৌঁছে যাবে। ফলে মধ্যস্বত্বভোগীদের সুযোগ কমে আসবে এবং প্রকৃত কৃষকই উপকৃত হবেন।
পার্টনার প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশা অনুযায়ী আমরা কাজ করছি আমাদের সহায়তা করছে পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (আরডিএ) বগুড়া। প্রাথমিকভাবে এখন পর্যন্ত ৯টি জেলার ৯টি উপজেলা নিয়ে এ কার্যক্রম শুরু হচ্ছে, যা আগামী ৬ মাস বা আগামী ১৮০ দিনের মধ্যে এসব উপজেলায় পাইলটিং কার্যক্রম শুরু করা নির্দেশনা রয়েছে। এখন প্রতি মুহর্তেই নতুন নতুন বিষয় যুক্ত করার হচ্ছে। ফলে এখনই কোনো সিদ্ধান্তে আসা যাবে না তবে আমরা কাজ করছি। প্রাথমিকভাবে ক্ষুদ্র কৃষকদের বছরভিত্তিক এককালীন প্রণোদনা দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। যেটি স্যোশাল সেফটিনেট হিসেবে কাজ করবে। এ প্রি-পাইলটিংয়ের ৯টি ব্লকে প্রায় ২০ হাজার পরিবারের জন্য ভর্তুকিসহ সব নিয়ে খরচ হবে প্রায় ৭ কোটি টাকা। স্মার্ট কৃষক কার্ড হলো বাংলাদেশ সরকারের কৃষি মন্ত্রণালয়ের একটি অত্যাধুনিক ডিজিটাল উদ্যোগ, যার মাধ্যমে দেশের প্রতিটি প্রকৃত কৃষকের বিস্তারিত তথ্য সংবলিত একটি ইলেকট্রনিক ডেটাবেজ তৈরি করা হচ্ছে। সহজ কথায়, এটি টিসিবির ফ্যামিলি কার্ড বা স্মার্ট এনআইডির মতোই একটি পরিচয়পত্র, যা বিশেষভাবে কৃষি সেবাকে ডিজিটাল করার জন্য তৈরি।
কৃষকের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, সরকারি ভর্তুকি সরাসরি প্রকৃত চাষির হাতে পৌঁছে দিতে সরকারের এই উদ্যোগ। প্রকল্পটি ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হলেও নতুন সরকার এটি দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে।
জানা গেছে, এই প্রকল্পের আওতায় দেশের ৬৪ জেলার ৪৯৫ উপজেলায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরসহ সাতটি সংস্থা কার্ড বিতরণ এবং ডেটাবেজ তৈরির কাজ করার কথা থাকলেও দ্রুত ত্বরান্বিত করা হচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, দুই কোটি ২৭ লাখ কৃষক পরিবারকে এই কার্ড দেওয়া হবে। এ কার্ডধারীরা ন্যায্যমূল্যে সার, বীজ ও কৃষি উপকরণ পাবেন। কম সুদে বা সহজ শর্তে কৃষিঋণ। সরকারি ভর্তুকি সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে। কৃষি যান্ত্রিকীকরণে সহায়তা। কৃষি বিমা ও মাঠ পর্যায়ে প্রশিক্ষণ সুবিধা পাবেন।
তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন জানান, প্রথমে পরীক্ষামূলকভাবে কয়েকটি এলাকায় কৃষক কার্ড বিতরণ করা হবে। পরে পর্যায়ক্রমে সারা দেশে তা চালু করা হবে। সরকারের আশা, এই উদ্যোগ কৃষি খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়াবে এবং কৃষকের আর্থিক নিরাপত্তা জোরদার করবে। কৃষক কার্ড শুধু একটি প্রশাসনিক উদ্যোগ নয়— এটি কৃষি খাতে ডিজিটাল রূপান্তরেরও বড় পদক্ষেপ। এখন দেখার বিষয়, কত দ্রুত এবং কতটা কার্যকরভাবে এই পরিকল্পনা বাস্তবে রূপ পায়।









































