এবার হবে যোগ্যতার লড়াই, নেই প্রতীক
জুন ২১ ২০২৬, ০১:৪৩
নিজস্ব প্রতিবেদক: আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে কোনো দলীয় প্রতীক ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা না থাকায় তৃণমূল পর্যায়ে রাজনীতির চিরাচরিত সমীকরণ পুরোপুরি পাল্টে গেছে। সাধারণত দলীয় প্রতীকের ছায়ায় প্রার্থীরা যে রাজনৈতিক সুরক্ষা বা সুবিধা পেতেন, এবার তার সুযোগ নেই। ফলে প্রতিটি প্রার্থীকে এখন নিজের যোগ্যতা, সততা এবং ব্যক্তিগত ইমেজের শক্তিতে ভোটারদের মন জয় করতে হবে।
সরকার আগামী সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাস থেকে পর্যায়ক্রমে সারা দেশে এই নির্বাচনগুলো শুরু করার ইঙ্গিত দিয়েছে। আগামী এক বছরের মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা, জেলা পরিষদ এবং সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন সম্পন্ন করার লক্ষ্যে রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন সাজ সাজ রব।
দলীয় প্রতীক না থাকার এই সুযোগকে বড় দলগুলো যেমন চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে, তেমনি মাঝারি ও ছোট দলগুলো এটিকে তাদের সাংগঠনিক শক্তিবৃদ্ধির সুযোগ হিসেবে দেখছে। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি এবার আর জোটবদ্ধভাবে নয়, বরং এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেয়ার কৌশল গ্রহণ করেছে।
এনসিপির দৃষ্টিভঙ্গি: এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মুনিরা শারমিনের মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন মানেই তৃণমূলের মানুষের সেন্টিমেন্টের প্রতিফলন। তারা প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে প্রার্থীর সামাজিক অবস্থান এবং মানুষের সাথে তার পূর্বের সুসম্পর্ককে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছেন।
জামায়াতের অবস্থান: দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ মনে করেন, প্রতীক না থাকায় রাজনীতির বাইরে থাকা মেধাবী ও সৎ ব্যক্তিদের জন্য মাঠ উন্মুক্ত হয়েছে। তারা মনে করেন, স্থানীয় উন্নয়নে যারা দক্ষ, তারাই যেন যোগ্যতার ভিত্তিতে জনপ্রতিনিধি হতে পারেন।
বিএনপির কৌশল: বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান জানিয়েছেন যে, তারা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে প্রার্থী যাচাই করছেন। যারা যোগ্য, কেবল তারাই দলের আস্থা পাবেন। এমনকি বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে যারা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, তাদের মধ্য থেকেও স্বচ্ছ ইমেজের ব্যক্তিদের মনোনয়ন দেয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামের চায়ের দোকানগুলো এখন আগাম নির্বাচনি আলোচনায় সরগরম। যেহেতু প্রতীক নেই, তাই ভোটারদের নজর এখন প্রার্থীর অতীত রেকর্ড এবং কর্মতৎপরতার দিকে। গ্রামে-পাড়ায় নির্বাচনের হাওয়া বইতে শুরু করায় স্থানীয় নেতারা এখন ভোটারদের দোরগোড়ায় জনসংযোগ বাড়িয়েছেন। এই নির্বাচন কেবল জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের মাধ্যম নয়, এটি বরং স্থানীয় পর্যায়ে এক ধরনের ‘গণভোট’ বা জনপ্রিয়তার অগ্নিপরীক্ষা হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে।
বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের বক্তব্যে একটি বিষয় পরিষ্কার- অতীতে যারা ফ্যাসিবাদী শাসনের দোসর ছিল, যারা দুর্নীতি ও জনবিচ্ছিন্ন রাজনীতির সাথে জড়িত ছিল, তারা যাতে কোনোভাবেই জনগণের প্রতিনিধি হতে না পারে। নেতারা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন, যদি এমন কেউ নির্বাচনে দাঁড়ানোর ধৃষ্টতা দেখায়, তবে স্থানীয় জনগণ তাদের ব্যালটের মাধ্যমে উপযুক্ত জবাব দেবে।
বিশ্লেষকদের মতে, দলীয় প্রতীকহীন এই নির্বাচন স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক সংঘাত কমিয়ে আনবে বলে আশা করা যায়। অতীতে প্রতীকী নির্বাচনের কারণে মারামারি, কেন্দ্র দখল এবং দলীয় কোন্দল যে হারে বৃদ্ধি পেয়েছিল, এবার তা অনেকটাই হ্রাস পাবে। কারণ, এখন লড়াই হবে ব্যক্তির সাথে ব্যক্তির, দলের সাথে দলের নয়। ভোটাররা এখন প্রার্থীর গুণমান দেখে ভোট দেয়ার সুযোগ পাবেন, যা গণতন্ত্রের ভিতকে তৃণমূল থেকে মজবুত করবে।
নির্বাচন কমিশন ও সরকারের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো একটি স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করা। যেহেতু স্থানীয় পর্যায়ে পেশীশক্তি ও কালো টাকার প্রভাব থাকে, তাই নির্বাচন কমিশনকে প্রতিটি ধাপে নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে হবে। প্রশাসনিক কোনো হস্তক্ষেপ ছাড়াই ভোটাররা যেন তাদের পছন্দের প্রার্থীকে নির্বাচন করতে পারেন, সে পরিবেশ নিশ্চিত করাই এখন সরকারের বড় কাজ।
২০২৬ সালের এই প্রতীকবিহীন স্থানীয় সরকার নির্বাচন বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য একটি বড় মাইলফলক হতে যাচ্ছে। দলীয় প্রতীকের ঊর্ধ্বে উঠে প্রার্থীর ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি ও যোগ্যতাকে প্রাধান্য দেয়ার এই সংস্কৃতি যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ এমন এক ঝাঁক জনপ্রতিনিধি পাবে, যারা কেবল দলের অনুগত নয়, বরং জনগণের সেবক হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করবেন।
সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হতে যাওয়া এই নির্বাচনগুলো আগামী দিনে আমাদের স্থানীয় শাসনের চেহারা বদলে দেবে এমনটাই প্রত্যাশা করছেন রাজনীতির কারিগর ও সাধারণ ভোটাররা। সবশেষে, জনগণের সচেতনতাই পারে দুর্নীতিমুক্ত ও যোগ্য নেতৃত্ব নিশ্চিত করতে, যা একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার অন্যতম পূর্বশর্ত।








































