ঈদে ছুটিতে নাড়ির টানে বাড়ি ছুটছে মানুষ
মে ২৪ ২০২৬, ০৪:৩১
নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজধানীর যান্ত্রিক কোলাহল আর ব্যস্ত জীবন পেছনে ফেলে নাড়ির টানে শেকড়ে ফিরতে শুরু করেছে মানুষ। আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে প্রিয়জনদের সঙ্গে উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে রেলপথে শুরু হয়েছে ঘরমুখো মানুষের ঢল।
ঈদের আনুষ্ঠানিক ছুটি শুরু হতে এখনো বেশ কয়েক দিন বাকি। তবে শেষ মুহূর্তের উপচেপড়া ভিড় এবং যাত্রাপথের সীমাহীন দুর্ভোগ এড়াতে অনেকেই আগেভাগে ঢাকা ছাড়ছেন। বিশেষ করে চাকরিজীবীরা তাদের স্ত্রী-সন্তান, বয়োবৃদ্ধ মা-বাবা এবং ভাই-বোনদের আগেই নিরাপদে গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। গতকাল সকাল থেকেই কমলাপুর স্টেশনে যাত্রীদের আনাগোনা ছিল চোখে পড়ার মতো।
শুক্রবারের তুলনায় গতকাল স্টেশনে যাত্রীর চাপ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। প্ল্যাটফর্মগুলোতে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। বিশাল ব্যাগ, ট্রলি এবং পরিবারের ছোট সদস্যদের হাত ধরে যাত্রীরা নিজেদের নির্ধারিত ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছেন। স্টেশনের প্রতিটি কোণায় যেন বাজছে উৎসবের আগাম আগমনী বার্তা।
অঞ্চলভেদে ভিড়ের তারতম্য- উত্তরাঞ্চলগামী ট্রেন: উত্তরবঙ্গের ট্রেনগুলোতে যাত্রীদের ভিড় তুলনামূলক অনেক বেশি। এই রুটের যাত্রীরা সাধারণত দীর্ঘ পথ পাড়ি দেন বলে তারা ট্রেনের ওপর বেশি নির্ভরশীল। পূর্বাঞ্চলগামী ট্রেন: অন্যদিকে, চট্টগ্রাম বা সিলেটসহ পূর্বাঞ্চলের ট্রেনগুলোতে যাত্রীর চাপ থাকলেও তা তুলনামূলকভাবে সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে এবং যাত্রীরা বেশ স্বস্তিতেই ভ্রমণ করতে পারছেন। সকাল থেকে ঢাকা ছেড়ে যাওয়া কয়েকটি ট্রেনের ক্ষেত্রে কিছুটা শিডিউল বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে চট্টগ্রামগামী মহানগর প্রভাতী এবং উত্তরবঙ্গগামী চিলাহাটী নীলসাগর এক্সপ্রেসসহ কয়েকটি ট্রেন নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বেশ কিছুটা দেরিতে স্টেশন ত্যাগ করেছে।
সাধারণত ট্রেনের দেরিতে যাত্রীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হলেও ঈদযাত্রার এই বিশেষ সময়ে তাদের মনোভাব ছিল অনেকটাই নমনীয়। যাত্রীরা মনে করছেন, ঈদ যত ঘনিয়ে আসবে, ট্রেনের ভিড় ও চাপ তত বাড়বে। শেষ মুহূর্তের সেই দমবন্ধ করা পরিবেশ এবং ঝক্কিঝামেলা থেকে রক্ষা পেতেই তারা আগেভাগে যাত্রা শুরু করেছেন।
‘স্বাভাবিক সময়েও এই ট্রেনগুলো এমন বিলম্ব করে থাকে। এটা আমাদের কাছে নতুন কিছু নয়। তবে এই ভিড়ের মাঝে নিরাপদে এবং সুস্থ শরীরে পরিবারের কাছে পৌঁছাতে পারলেই আমরা খুশি’- প্ল্যাটফর্মে অপেক্ষমাণ এক যাত্রীর ভাষ্য।
স্টেশনে অপেক্ষমাণ যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের আগাম যাত্রার পেছনের গল্প। যানজটমুক্ত ও অপেক্ষাকৃত নিরাপদ যাত্রার জন্যই তারা ট্রেনকে বেছে নিয়েছেন। পরিবার নিয়ে আগেভাগেই বাড়ি ফিরছেন গৃহিণী শরিফা খাতুন। ট্রেনের জন্য অপেক্ষারত অবস্থায় তিনি বলেন, ‘আমার স্বামীর অফিস ছুটি হতে আরও কয়েকদিন বাকি। ঈদের ঠিক আগে যে ভয়াবহ ভিড় হয়, তাতে ছোট বাচ্চাদের নিয়ে ভ্রমণ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। তাই বাচ্চাদের নিয়ে আমি আগেই বাড়ি চলে যাচ্ছি। ট্রেন ছাড়তে একটু দেরি হচ্ছে ঠিকই, তবে বাসের চেয়ে ট্রেনের যাত্রা অনেকটা নিরাপদ ও আরামদায়ক মনে হয়।’
অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থী সুলতানও ব্যাগপত্র গুছিয়ে বসে আছেন ট্রেনের অপেক্ষায়। তিনি জানান, ‘আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ঈদের ছুটি আগেই হয়ে গেছে। ঢাকায় অযথা সময় নষ্ট না করে তাই বাড়ি চলে যাচ্ছি। দেরি করলে স্টেশনে এবং ট্রেনে মানুষের চাপ বহুগুণ বেড়ে যাবে, তখন আর শান্তিতে যাওয়ার সুযোগ থাকবে না।’
ঈদযাত্রাকে নির্বিঘ্ন করতে বাংলাদেশ রেলওয়ে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। রেলওয়ের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, যাত্রীদের চাপ সামাল দিতে বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। গতকাল দিনব্যাপী কমলাপুর স্টেশন থেকে যে পরিমাণ ট্রেন ছেড়ে যায় তার একটি পরিসংখ্যান দেয়া হলো— আন্তঃনগর ট্রেন ৪৬টি, লোকাল, মেইল ও কমিউটার ট্রেন ২৩টি, সিটের যাত্রী ধারণক্ষমতা- সারাদিনে প্রায় ৪৫ হাজার যাত্রী নির্ধারিত আসনে বসে ভ্রমণ করবেন। স্ট্যান্ডিং টিকিটের যাত্রী: দাঁড়িয়ে যাওয়ার জন্য প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার যাত্রীর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
ঈদযাত্রায় যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং যে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে স্টেশনে ৩ স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। টিকিট কালোবাজারি রোধ, বিনা টিকিটে ভ্রমণ এবং ট্রেনের ছাদে ওঠা ঠেকাতে রেলওয়ে পুলিশ (জিআরপি), আরএনবি এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যৌথভাবে কাজ করছে। কমলাপুর রেলস্টেশন পরিদর্শনে এসে সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব ফাহিমুল ইসলাম।
তিনি সাংবাদিকদের এবং যাত্রীদের আশ্বস্ত করে বলেন, ‘শিডিউল বিপর্যয় ঠেকাতে আমাদের সব ধরনের কারিগরি ও ব্যবস্থাপনাগত প্রস্তুতি রয়েছে। এবারের ঈদযাত্রায় বড় ধরনের কোনো শিডিউল বিপর্যয়ের আশঙ্কা নেই বলে আমরা বিশ্বাস করি। এছাড়া জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কেউ যেন ট্রেনের ছাদে উঠতে না পারে, তা রোধ করতে আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।’
ঈদযাত্রায় বাস টার্মিনালেও প্রচন্ড ভিড়: ঈদের এখনো পাঁচদিন বাকি। তবে সাধারণ ছুটির সঙ্গে সমন্বয় করে এবং যাত্রাপথের বিড়ম্বনা এড়াতে গতকাল সকাল থেকেই সপরিবারে ঢাকা ছাড়ছেন অনেকে। রাজধানীর গাবতলী, মহাখালী এবং সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, প্রতিটি কাউন্টারেই যাত্রীদের ভিড় বাড়ছে। গাবতলী বাস টার্মিনাল: দেশের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলগামী যাত্রীদের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র গাবতলীতে সকাল থেকেই দূরপাল্লার বাসগুলোর কাউন্টারে ভিড় দেখা গেছে। যাত্রীরা নিজেদের ব্যাগপত্র নিয়ে বাসের জন্য অপেক্ষা করছেন।
মহাখালী বাসটার্মিনাল: বৃহত্তর ময়মনসিংহ ও উত্তরাঞ্চলের কিছু জেলার যাত্রীদের চাপ এখানে বেশি। বাস মালিক ও শ্রমিকদের ব্যস্ততা চোখে পড়ার মতো। সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল: চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগ এবং দক্ষিণাঞ্চলের কিছু রুটের যাত্রীরা এখান থেকে যাতায়াত করছেন। এখানেও সকাল থেকে যাত্রীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।
বেশিরভাগ যাত্রী জানিয়েছেন, দূরপাল্লার বাসগুলো এখন পর্যন্ত নির্ধারিত সময়েই টার্মিনাল ছেড়ে যাচ্ছে। তবে কিছু নির্দিষ্ট রুটে যাত্রীর অতিরিক্ত চাপের কারণে হালকা ভোগান্তির অভিযোগও তুলেছেন কেউ কেউ।
ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন, নিরাপদ এবং হয়রানিমুক্ত রাখতে বাস টার্মিনাল ও মহাসড়কগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। যাত্রীদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থা মাঠে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। মহাখালী বাস টার্মিনালের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর ওমর ফারুক বর্তমান নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পর্কে জানান, ‘যাত্রাপথে যে কোনো ধরনের চাঁদাবাজি, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় এবং মহাসড়কের যানজট নিয়ন্ত্রণে আমাদের কঠোর নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। যাত্রীদের নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করতে ট্রাফিক পুলিশ সার্বক্ষণিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে।’
এছাড়া, পরিবহনমন্ত্রীর পক্ষ থেকেও আশ্বস্ত করে জানানো হয়েছে যে, এবারের ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে সরকারের সর্বোচ্চ প্রস্তুতি রয়েছে। সড়ক ও মহাসড়কের সংস্কার কাজ দ্রুত সম্পন্ন করা হয়েছে এবং হাইওয়ে পুলিশকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে।
ঈদ মানেই আনন্দ, ঈদ মানেই পরিবারের সবার সঙ্গে মিলিত হওয়া। যান্ত্রিক শহরের একঘেয়েমি আর কংক্রিটের দেয়াল পেরিয়ে শেকড়ের টানে মানুষের এই ছুটে চলা যুগে যুগে এক চিরচেনা দৃশ্য। স্টেশনের ভিড়, টিকিট কাটার যুদ্ধ, কিংবা ট্রেন ছাড়তে কিছুটা বিলম্ব- সবকিছুই ম্লান হয়ে যায় যখন একজন মানুষ তার গন্তব্যে পৌঁছে প্রিয়জনের হাসিমুখ দেখতে পান।
রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের যথাযথ নজরদারি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নিরাপত্তার কারণে এবারের ঈদযাত্রা বিগত বছরগুলোর তুলনায় আরও বেশি স্বস্তিদায়ক হবে বলেই সবার প্রত্যাশা। সব ক্লান্তি আর অপেক্ষার শেষে প্রতিটি যাত্রীর ঈদযাত্রা হোক নিরাপদ ও আনন্দময়, কমলাপুর রেলস্টেশনের আজকের এই উচ্ছ্বসিত চিত্র যেন সেই প্রত্যাশারই প্রতিফলন।









































