কাটছে না দুদকে অস্থিরতা

মার্চ ৩০ ২০২৬, ০২:১৫

বাংলাদেশের সরকারি সংস্থা দুদক (দুর্নীতি দমন কমিশন) একদিকে দেশের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরে অস্থিরতা যেন অব্যাহত রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে কর্মকর্তাদের মধ্যে মনোমালিন্য, শূন্যপদ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্বের অভিযোগ সামনে এসেছে। এর ফলে কমিশনের সাধারণ কার্যক্রমে প্রভাব পড়ছে এবং নীতি ও প্রক্রিয়ার বাস্তবায়নে বাধা তৈরি হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি সুসংগঠিত ও স্থিতিশীল দুদক সরকারের স্বচ্ছতা নীতি কার্যকর করতে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সংস্থার অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে শুধুমাত্র কমিশনের কার্যকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, বরং জনগণের আস্থা ও বিশ্বাসও ক্ষয় হতে পারে। কর্মকর্তাদের দায়িত্ব ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা পুনর্গঠন এবং অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ সমাধান না হলে দুদকের উদ্যোগগুলো সময়মতো সম্পন্ন করা কঠিন হয়ে পড়বে। এ অবস্থায় সরকারের নজরদারি, অভ্যন্তরীণ সংস্কার এবং কার্যকর নেতৃত্বের ওপর গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে। আইন ও নীতিমালা অনুযায়ী দায়িত্ব পালন নিশ্চিত করা এবং রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক চাপ থেকে সংস্থাকে স্বাধীন রাখা দুদকের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে।

সূচনা থেকে বর্তমান, প্রত্যাশা বনাম বাস্তবতা : ২০০৪ সালে দুর্নীতি দমন ব্যুরোর পরিবর্তে স্বাধীন কমিশন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় দুদক। সেই সময় লক্ষ্য ছিল- রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি খাতে দুর্নীতি প্রতিরোধ, তদন্ত ও বিচারের একটি শক্তিশালী, নিরপেক্ষ কাঠামো তৈরি করা। কিন্তু প্রতিষ্ঠার পর থেকে নানা সময়ে রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা এবং নেতৃত্বের অস্থিরতা সংস্থাটির কার্যকারিতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। গত দুই দশকে গঠিত সাতটি কমিশনের মধ্যে মাত্র তিনটি কমিশন পূর্ণ মেয়াদ সম্পন্ন করতে পেরেছে। বাকি চারটি কমিশন মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই বিভিন্ন কারণে বিদায় নিয়েছে। ফলে একটি ধারাবাহিক নীতিমালা বা দীর্ঘমেয়াদি কৌশল বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

হঠাৎ পদত্যাগে নতুন করে বিতর্ক : সবশেষ গত ৩ মার্চ কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই পদত্যাগ করেন দুদকের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেন এবং তার সঙ্গে থাকা দুই কমিশনার। এই আকস্মিক পদত্যাগ দেশজুড়ে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিদায়ী চেয়ারম্যান দাবি করেছেন, নতুন সরকারের জন্য কাজের পথ সুগম করতেই তারা স্বেচ্ছায় দায়িত্ব ছেড়েছেন। তবে বিষয়টিকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছে না দুর্নীতি পর্যবেক্ষণকারী সংগঠনগুলো। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) মনে করছে, এটি বাংলাদেশের পুরনো রাজনৈতিক সংস্কৃতিরই বহিঃপ্রকাশ, যেখানে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষ পদেও পরিবর্তন আসে।

বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ, স্বাধীনতা কতটা নিশ্চিত : টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এই পদত্যাগকে ‘হতাশাজনক’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, কোনো কমিশনের কার্যকারিতা মূল্যায়নের জন্য তাদের পূর্ণ মেয়াদে কাজ করার সুযোগ থাকা জরুরি। তিনি বলেন, একটি কমিশনের আংশিক মেয়াদ দেখে তার সাফল্য বা ব্যর্থতা বিচার করা সম্ভব নয়। এতে প্রতিষ্ঠান হিসেবে দুদকের বিশ্বাসযোগ্যতা ও জবাবদিহিতা দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

সাফল্য আছে, তবে ধারাবাহিকতা নেই : মোমেন কমিশনের স্বল্প ১৫ মাসের মেয়াদকালে দুদকের কার্যক্রম একেবারে নিষ্ক্রিয় ছিল না। বরং এই সময় সংস্থাটিতে জমা পড়ে প্রায় ১৫ হাজার অভিযোগ। তদন্তের আওতায় আসে বহু প্রভাবশালী ব্যক্তি। ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিবারের সদস্য থেকে শুরু করে সাবেক মন্ত্রী, আমলা এবং বিভিন্ন খাতের উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিরা তদন্তের আওতায় আসেন। মোট প্রায় সাড়ে তিন হাজার ভিআইপি এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হন বলে জানা যায়। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যা সাফল্যের অভাবে নয় বরং সেই সাফল্য ধরে রাখতে না পারার মধ্যে।

প্রভাবমুক্ত পরিবেশের অভাব : দুদকের সাবেক মহাপরিচালক মঈদুল ইসলাম মনে করেন, শুধু যোগ্য ব্যক্তি নিয়োগ দিলেই হবে না; তাদের কাজ করার জন্য একটি প্রভাবমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। তার ভাষায়, ‘স্বাধীনচেতা ও যোগ্য মানুষকে দায়িত্বে আনতে হবে, কিন্তু তাদের কাজের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ থাকলে কোনো ফল আসবে না।’ এই মন্তব্য থেকে স্পষ্ট- দুদকের প্রধান চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো এর কার্যক্রমে বাইরের প্রভাব কমানো।

রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রভাব : বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রবণতা দেখা যায়- সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাগুলোর নেতৃত্বেও পরিবর্তন আসে। এই প্রবণতা দুদকের মতো একটি সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানের জন্য বিশেষভাবে ক্ষতিকর বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কারণ, দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। এখানে ধারাবাহিক তদন্ত, তথ্যসংগ্রহ, বিচারিক প্রক্রিয়া- সবকিছুই সময়সাপেক্ষ। নেতৃত্ব পরিবর্তনের ফলে অনেক সময় চলমান তদন্ত বা পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হয়।

কাঠামোগত দুর্বলতা : বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, দুদকের কাঠামোগত কিছু দুর্বলতাও রয়েছে। যেমন- পর্যাপ্ত দক্ষ জনবল সংকট, আধুনিক তদন্ত প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা, বিচারিক প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়ের অভাব। এসব সমস্যা সমাধান না হলে শুধু নেতৃত্ব পরিবর্তন করে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না।

জনআস্থা সংকট : দুদকের কার্যক্রম নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যেও মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। বড় বড় অভিযানের খবর শিরোনামে এলেও শেষ পর্যন্ত কতগুলো মামলা নিষ্পত্তি হয়, কতজন দোষী সাব্যস্ত হয়- এই প্রশ্নগুলোর স্পষ্ট উত্তর অনেক সময় পাওয়া যায় না। এর ফলে সংস্থাটির ওপর জনআস্থা পুরোপুরি গড়ে উঠতে পারছে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আস্থা পুনরুদ্ধার করা এখন দুদকের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

দ্রুত নিয়োগের দাবি : বর্তমানে দুদকের শীর্ষ পদগুলো কার্যত শূন্য হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিকে ‘অভিভাবকশূন্য’ হিসেবে উল্লেখ করছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, দ্রুত নতুন কমিশন নিয়োগ না দিলে সংস্থাটির কার্যক্রম আরও ধীর হয়ে পড়বে। একই সঙ্গে তারা জোর দিচ্ছেন- নিয়োগ প্রক্রিয়াটি যেন স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ এবং যোগ্যতাভিত্তিক হয়।

কী হতে পারে সমাধান : বিশেষজ্ঞরা দুদকের কার্যকারিতা বাড়াতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করেছেন- ১. পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা : দুদককে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত রাখতে আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা জোরদার করতে হবে। ২. নেতৃত্বের স্থায়িত্ব : কমিশনারদের পূর্ণ মেয়াদ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারেন। ৩. দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন : তদন্ত কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও আন্তর্জাতিক মানের অনুসন্ধান পদ্ধতি প্রয়োগ জরুরি। ৪. জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধি : দুদকের কার্যক্রম সম্পর্কে নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ ও জনসাধারণের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে হবে। ৫. বিচারিক প্রক্রিয়া দ্রুত করা : দুর্নীতির মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল বা আলাদা ব্যবস্থার কথা ভাবা যেতে পারে।

সামনে পথ কতটা কঠিন : দুদকের সামনে পথ সহজ নয়। একদিকে রাজনৈতিক বাস্তবতা, অন্যদিকে প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা- এই দুইয়ের মাঝে ভারসাম্য রেখে কাজ করতে হবে সংস্থাটিকে। তবে আশার জায়গাও আছে। অতীতে দুদক যে বড় বড় তদন্ত ও অভিযান চালাতে পেরেছে, তা প্রমাণ করে সুযোগ ও স্বাধীনতা পেলে সংস্থাটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম। সর্বোপরি, দুই দশক পার করেও দুদকের ‘থিতু হতে না পারা’ আসলে একটি বৃহত্তর প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের প্রতিফলন। এটি শুধু একটি সংস্থার সমস্যা নয়; বরং রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং জবাবদিহিতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। যদি সত্যিই দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর লড়াই গড়ে তুলতে হয়, তবে দুদককে শক্তিশালী, স্বাধীন এবং স্থিতিশীল একটি প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা ছাড়া বিকল্প নেই। আর সেই লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক সংস্কার এবং জনগণের আস্থা পুনর্গঠন।

সংবাদটি শেয়ার করুন....

আমাদের ফেসবুক পাতা

আজকের আবহাওয়া


এক্সক্লুসিভ আরও