রাহাত-আনোয়ার হাসপাতালে

বরিশালে ডা. তহুরা‘র অবহেলায় প্রসূতি নারী উদ্যোক্তার মৃত্যু !

সেপ্টেম্বর ২৬ ২০২৬, ০১:২১

বরিশালের একটি বেসরকারি হাসপাতালে অ্যানেসথেসিয়া চিকিৎসকের অবহেলায় সন্তান জন্ম দেওয়ার পর নাজিয়া রহমান মাইশা নামের এক নারী উদ্যোক্তার মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে।

বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) বিকেলে বরিশাল নগরের বান্দরোডের রাহাত-আনোয়ার হাসপাতালে এ ঘটনা ঘটে। মাইশা বরিশাল নগরের কালিজিরা এলাকার বাসিন্দা এবং একজন উদীয়মান নারী উদ্যোক্তা ছিলেন। তিনি বরিশাল গণপূর্ত বিভাগের সাবেক কর্মচারী প্রয়াত মো. নাজমুর রহমান বাদলের মেয়ে।

পরিবারের অভিযোগ, অপারেশন থিয়েটারে অ্যানেসথেসিয়া দেওয়ার পরপরই অসুস্থ হয়ে পড়েন মাইশা। কিছুক্ষণ পর অপারেশন টেবিলেই তার মৃত্যু হয়।
এরপর ঘটনা আড়াল করতে নাটকীয়ভাবে নাজিয়াকে শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে পাঠানো হয় বলেও অভিযোগ স্বজনদের।

তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, অস্ত্রোপচারের পর বমি করায় শ্বাসনালিতে খাবার আটকে যায় মাইশার। পরে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর তার মৃত্যু হয়।

স্বজনরা জানান, মাইশা বানারীপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের রেজিস্ট্রার ডা. তহুরা আক্তারের রোগী ছিলেন। অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পর থেকে তার তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা চলছিল। পরে ডা. তহুরা আক্তারের পরামর্শে অস্ত্রোপচারের জন্য বরিশাল নগরের রাহাত-আনোয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয় নাজিয়াকে।

স্বজনরা জানান, বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টার দিকে নাজিয়াকে সিজারিয়ানের জন্য অপারেশন থিয়েটারে নেওয়া হয়। সেখানে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তার একটি কন্যাসন্তান জন্ম নেয়। পরে অপারেশন টেবিলেই মৃত্যু হয় নাজিয়ার।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী নাজিয়ার স্বজন সাজ্জাদ হোসেন নয়ন বলেন, ঘটনার সময় আমি হাসপাতালে ছিলাম। নাজিয়া পুরোপুরি স্বাভাবিক ছিল। সে পায়ে হেঁটে অপারেশন থিয়েটারে গেছে। অপারেশনের শেষ মুহূর্তে আমার সামনেই তার মৃত্যু হয়।

তিনি বলেন, অ্যানেসথেসিয়া চিকিৎসকের অবহেলার কারণে সন্তান জন্ম দেওয়ার পর নাজিয়ার মৃত্যু হয়েছে। নাজিয়াকে অ্যানেসথেসিয়া দেওয়ার পরপরই অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। বারবার বমি করতে থাকেন। তার ওপর শরীরে দেওয়া স্যালাইন ‘ওভারফ্লো’ করে আস্তে আস্তে ফুসফুসে কফ জমে যায়। অপারেশন শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নাজিয়া মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।

এই স্বজন অভিযোগ করেন, অস্ত্রোপচার চলাকালে অ্যানেসথেসিয়া চিকিৎসক সার্বক্ষণিক রোগীর পাশে ছিলেন না। তিনি স্পাইনালে অ্যানেসথেসিয়া দেওয়ার পরপরই অন্য রোগীর কাছে চলে যান। এমনকি রোগীর অবস্থা খারাপের দিকে গেলেও তিনি খোঁজ নেননি। তার অবহেলার পাশাপাশি ডা. তহুরা আক্তারের অসাবধানতার কারণে রোগীর মৃত্যু হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

সাজ্জাদ হোসেন নয়ন আরও জানান, নাজিয়ার অস্ত্রোপচার চলাকালে পাশের অপারেশন থিয়েটারে আরও দুটি অস্ত্রোপচার চলছিল। সেখানকার চারটি অপারেশন থিয়েটারের জন্য একমাত্র ডা. সোহেল মিয়া একাই ছিলেন। এমনকি নাজিয়ার মৃত্যুর পর তাদের অবহেলা ও দোষ আড়াল করতে তড়িঘড়ি করে মৃত নাজিয়াকে শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে রেফার করা হয়। কিন্তু সেখানে নেওয়ার পর চিকিৎসক জানান, হাসপাতালে আনার আগেই তার মৃত্যু হয়েছে। স্যালাইন ‘ওভারফ্লো’ হওয়ার কারণেই এমন দুর্ঘটনা ঘটেছে বলেও হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।

সাজ্জাদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, নাজিয়ার মৃতদেহ আমি নিজে হাসপাতালে নিয়ে আসছি। নিয়ম অনুযায়ী মুমূর্ষু কোনো রোগীকে স্থানান্তর করা হলে সঙ্গে অ্যানেসথেসিয়া চিকিৎসক থাকেন। কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে সেটা হয়নি। এমনকি হাসপাতালে মৃত্যু নিশ্চিত হয়ে ডা. সোহেল মিয়াকে ফোন করে জানালে তিনি বলেন, ‘আমার অন্য ওটি চলে, এখন আসতে পারবো না।

এদিকে ঘটনার পরপরই ডা. তহুরা আক্তার ও ডা. সোহেল মিয়া নিরুদ্দেশ হয়ে যান। তাদের মোবাইল নম্বরও বন্ধ পাওয়া যায়।

তবে স্বজনদের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ডা. রাহাত-আনোয়ার হাসপাতালের ম্যানেজার আহমেদ সাকিব। তিনি বলেন, রোগীর মৃত্যুর জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বা চিকিৎসকরা দায়ী নন। মূলত শ্বাসনালিতে খাবার আটকে গিয়ে নাজিয়া রহমান মাইশা নামের ওই রোগীর মৃত্যু হয়েছে।

সাকিব বলেন, বেলা ১২টার দিকে নাজিয়াকে রাহাত-আনোয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে তাকে নরমাল ডেলিভারির চেষ্টা করেন চিকিৎসক। কিন্তু রোগীর স্বজনরা সিজার করতে বলেন। এজন্য বিকেল ৩টায় তাকে অপারেশন থিয়েটারে নেওয়া হয় এবং সাড়ে ৩টায় অপারেশন শুরু করেন ডা. তহুরা আক্তার।

সাদিকের দাবি, অপারেশন সুন্দরভাবেই হয়েছে। মা ও সন্তান উভয়েই ভালো ছিল। নাজিয়াকে পোস্টঅপারেটিভ ইউনিটে নেওয়ার পর সদ্য ভূমিষ্ঠ কন্যার মুখও দেখেন নাজিয়া। সেখানে তার স্বজনরাও ছিলেন। এরপর হঠাৎ করেই তার বিপি ফল্ট করতে শুরু করে। এমনকি তিনি তিনবার বমি করেন।

তাৎক্ষণিকভাবে ছাকনা দিয়ে মুখের মধ্য থেকে তার বমি পরিষ্কার করা হয়। কিন্তু তাতে অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় দ্রুত তাকে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে নাজিয়ার মৃত্যু হয়। আইসিইউ থেকে আমরা জানতে পেরেছি, বমি করার সময় শ্বাসনালিতে খাবার আটকে গিয়ে শ্বাসরোধ হয়ে নাজিয়ার মৃত্যু হয়েছে।

তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের এমন অভিযোগ ভিত্তিহীন দাবি করে নাজিয়ার স্বজন নয়ন বলেন, অপারেশনের সময় আমি ছাড়াও নাজিয়ার একজন চাচি, যিনি অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র নার্স, তিনিও ছিলেন। এখন নিজেরা রক্ষা পাওয়ার জন্য তারা এমন উল্টাপাল্টা বলছে।

বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের কোতোয়ালি মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ আল মামুন উল ইসলাম বলেন, এমন কোনো অভিযোগ আমাদের কাছে আসেনি। অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন....

আমাদের ফেসবুক পাতা

আজকের আবহাওয়া


এক্সক্লুসিভ আরও