টিকে থাকার লড়াইয়ে ডাক বিভাগ

সেপ্টেম্বর ১৭ ২০২৬, ০২:৪৮

আধুনিক প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষ ও ইন্টারনেটের অদম্য জোয়ারে কাগজের চিঠির যুগ আজ প্রায় সম্পূর্ণ অস্তমিত। একসময়ে ব্যক্তিগত যোগাযোগ, আবেগ কিংবা খবরের প্রধান বাহন হিসেবে যে চিঠিপত্র ও খাম মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল, আজ তা কেবলই অতীত স্মৃতির অংশ। প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে দ্রুতগতির করলেও শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ডাক বিভাগের জীবনরেখায় ডেকে এনেছে চরম অস্তিত্ব সংকট। ব্যক্তিগত চিঠির আদান-প্রদান শূন্যের কোঠায় নেমে যাওয়ায় এবং বিশাল প্রশাসনিক ব্যয়ের চাপে লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়া ডাক বিভাগ আজ অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর এক সাহসী লড়াই শুরু করেছে। চিরায়ত চিঠিপত্র বিতরণের গণ্ডি পেরিয়ে প্রতিষ্ঠানটি এখন ঝুঁকছে আধুনিক লজিস্টিকস, ই-কমার্স পণ্য পরিবহন এবং বহুমুখী বাণিজ্যিক সেবার দিকে।

সময়ের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে ডাক বিভাগ দেশজুড়ে তাদের বিশাল অবকাঠামো ও নেটওয়ার্ককে নতুনভাবে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছে। বর্তমানে দেশের প্রায় ১০ হাজার পোস্ট অফিসের সুদৃঢ় কাঠামোকে কাজে লাগিয়ে অনলাইন ব্যবসা ও এফ-কমার্সের প্রসারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ঘরে ঘরে পণ্য পৌঁছে দেয়ার কাজ শুরু হয়েছে। বিশেষ করে ই-কমার্স খাতের লজিস্টিকস সাপোর্ট দিতে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ ১৪টি অঞ্চলে আধুনিক ফুলফিলমেন্ট সেন্টার চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, যেখান থেকে পণ্যের সংগ্রহ থেকে শুরু করে প্রসেসিং, সংরক্ষণ ও চূড়ান্ত বিলি করার সমস্ত কাজ এক ছাদের নিচে সম্পন্ন হবে।পাশাপাশি, স্থানীয় তরুণ উদ্যোক্তাদের যুক্ত করে পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হয়েছে ফ্র্যাঞ্চাইজি পোস্ট অফিস মডেল, যা প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ডাকসেবাকে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিচ্ছে।

চিঠিপত্রের প্রচলন কমলেও দাপ্তরিক ও আদালতের বিভিন্ন নথিপত্র পরিবহনের পাশাপাশি কৃষিপণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রেও নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে ডাক বিভাগ। চলতি মৌসুমে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শত শত টন মৌসুমি ফল নিরাপদে গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি প্রমাণ করেছে যে, সদিচ্ছা ও আধুনিক পরিকল্পনা থাকলে সরকারি এই সেবা খাত এখনো ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম। যুগের পরিবর্তনে টিকে থাকার এই অদম্য লড়াইয়ে ডাক বিভাগ আজ কেবল একটি চিঠি আদান-প্রদানের মাধ্যম নয়, বরং দেশের উদীয়মান লজিস্টিকস খাতের অন্যতম প্রধান ও আস্থার প্রতীক হয়ে ওঠার প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে চলেছে।

ডাক অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, ডাক বিভাগের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হচ্ছে ১ হাজার ৬০০টি পোস্ট অফিস এবং বাকিগুলো পরিচালিত হচ্ছে এজেন্ট পোস্ট অফিসের মাধ্যমে।

ব্যক্তিগত চিঠির প্রচলন কমে গেলেও সরকারি দাপ্তরিক ডাক এবং অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক চিঠিপত্রের পরিমাণ বিগত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে— ২০২৩-২৪ অর্থবছরে: মোট দাপ্তরিক ও অন্যান্য ডাকের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩ কোটি ৫ লাখ।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৩ কোটি ১০ লাখে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই সংখ্যা আরও বেড়ে প্রায় ৩ কোটি ৬৪ লাখে উন্নীত হয়েছে। চিঠিপত্রের সংখ্যা বাড়ার ফলে ডাক বিভাগের আয়ও সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ডাক বিভাগের বার্ষিক আয় ছিল প্রায় ২১৯ কোটি টাকা, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়ায় ২৫৩ কোটিতে এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা প্রায় ৩৩৬ কোটি টাকায় পৌঁছায়। অর্থাৎ, তিন বছরের ব্যবধানে ডাক বিভাগের আয় প্রায় ১১৭ কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে।

তবে আয়ের এই ঊর্ধ্বমুখী গতির বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক ব্যয়ের পরিমাণ অত্যন্ত চড়া। বর্তমানে ডাক বিভাগের বার্ষিক ব্যয় প্রায় ৮৫০ কোটি টাকা। এই বিপুল ব্যয়ের সিংহভাগ অর্থাৎ প্রায় ৫০০ কোটি টাকা খরচ হয় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতায় এবং ২৬০ কোটি টাকারও বেশি ব্যয় হয় পেনশন ও আনুতোষিক পরিশোধ বাবদ। এর ফলে দেখা যাচ্ছে, ডাক বিভাগের মোট বাজেটের প্রায় ৯৩ শতাংশই চলে যাচ্ছে কেবল বেতন-ভাতা ও প্রশাসনিক খরচে। আয় বাড়লেও ব্যয়ের তুলনায় তা অত্যন্ত কম হওয়ায় লোকসানি এই প্রতিষ্ঠানটিকে টেকসই করতে নতুন আয়ের উৎসের বিকল্প নেই।

বর্তমান যুগের চাহিদা অনুযায়ী ই-কমার্স ও এফ-কমার্সের (সোশ্যাল কমার্স) অবিশ্বাস্য প্রসারকে সামনে রেখে ডাক বিভাগ ঘরে ঘরে পণ্য পৌঁছে দেয়ার মাধ্যমে নিজেদের বাজার অবস্থান শক্ত করতে চাইছে। অনলাইনে কেনাকাটা করা পণ্যের লজিস্টিকস সাপোর্ট দিতে দেশব্যাপী মোট ১৪টি ফুলফিলমেন্ট সেন্টার চালুর সুদূরপ্রসারী উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

এই আধুনিক কেন্দ্রগুলোর মাধ্যমে মূলত অনলাইন বিক্রেতাদের পণ্য সংগ্রহ (পিকআপ), সংরক্ষণ, প্রসেসিং, বুকিং, বাছাই, পরিবহন এবং গ্রাহকের ঠিকানায় চূড়ান্ত বিলি করার সমস্ত কাজ এক ছাদের নিচে সম্পন্ন করা হবে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে রাজধানী ঢাকার তেজগাঁওয়ের পাশাপাশি গোপালগঞ্জ, ঈশ্বরদী, ময়মনসিংহ, খুলনা, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, রাজশাহী, রংপুর, বরিশাল, দিনাজপুর, হবিগঞ্জ, কুষ্টিয়া এবং যশোরে ফুলফিলমেন্ট সেন্টার স্থাপনের কাজ হাতে নেয়া হয়েছে।

পাশাপাশি ডাকসেবার পরিধি ও গতিশীলতা বৃদ্ধি করতে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের যুক্ত করে পরীক্ষামূলকভাবে ‘ফ্র্যাঞ্চাইজি পোস্ট অফিস’ মডেল চালু করা হয়েছে। এসব ফ্র্যাঞ্চাইজি উদ্যোক্তা মূলত স্থানীয় পর্যায় থেকে পণ্য সংগ্রহ ও গ্রাহকের কাছে বিলির কাজ পরিচালনা করবেন। ডাক বিভাগের নির্দিষ্ট নিয়ম ও চুক্তির আওতায় এই উদ্যোক্তাদের যুক্ত করা হচ্ছে এবং সম্পূর্ণ কার্যক্রম সরাসরি কেন্দ্রীয় তত্ত্বাবধানের অধীনে রাখা হচ্ছে। তবে সেবার মান ক্ষুণ্ন হলে বা কোনো ধরনের অনিয়ম প্রমাণিত হলে তাৎক্ষণিকভাবে চুক্তি বাতিল করার কঠোর বিধানও রাখা হয়েছে।

শুধু ই-কমার্স পণ্যই নয়, বর্তমান সময়ে ডাক বিভাগ কৃষিপণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রেও এক নতুন বিপ্লব ঘটিয়েছে। সরকারের নির্ধারিত ১৮০ দিনের বিশেষ কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবে চলতি মৌসুমে দেশের বিভিন্ন উৎস জেলা থেকে ৩১২ টনেরও বেশি মৌসুমি ফল অত্যন্ত সফলভাবে সংগ্রহ করে সরাসরি গ্রাহকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছে ডাক বিভাগ।

রাজশাহীর বিশ্বখ্যাত আম ছাড়াও সাতক্ষীরার আম এবং খাগড়াছড়িসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের উৎপাদিত ফলমূল এই ব্যবস্থার আওতায় পরিবহন করা হয়েছে, যা ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিতকরণে দারুণ ভূমিকা রেখেছে।

এর বাইরেও ডাকসেবায় আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া লাগাতে অনলাইন ট্র্যাকিং ও ট্রেসিং সুবিধা ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। স্পিডপোস্ট ও এক্সপ্রেস মেইল সার্ভিসের পাশাপাশি এখন দেশজুড়ে আধুনিক ‘মেইল প্রসেসিং সেন্টার’ স্থাপন করা হয়েছে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের পর্চা ও খতিয়ান হোম ডেলিভারি এবং পাসপোর্টের বাল্ক ডেলিভারির মতো সফল সেবার পর, বর্তমানে এর সঙ্গে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক মামলা-সংক্রান্ত নথি প্রেরণের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবাগুলোও ডাক বিভাগের পোর্টফোলিওতে যুক্ত করা হয়েছে।

এতসব সম্ভাবনার মাঝেও ডাক বিভাগের পথচলায় সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দীর্ঘদিনের পুরোনো অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, তীব্র জনবল সংকট, কেলেঙ্কারিযুক্ত পুরোনো ব্যবস্থাপনা এবং সেবার মান নিয়ে গ্রাহকদের নানামুখী অভিযোগ।

এই অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করার জন্য বর্তমানে ৩টি বিশেষ মেইল মনিটরিং সফটওয়্যার তৈরির কাজ অত্যন্ত দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। এই সফটওয়্যারগুলোর মাধ্যমে দেশের যেকোনো প্রান্তে পাঠানো মেইল বা পার্সেলের সঠিক গতিপথ, মাঝপথে কোনো বিলম্ব হচ্ছে কি না এবং সামগ্রিক সরবরাহ কার্যক্রম রিয়েল-টাইম নজরদারির আওতায় আনা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে, নতুন ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত অর্থ লেনদেন, পণ্যের নিরাপত্তা এবং গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করতে কঠোর সাইবার ও প্রশাসনিক নজরদারি চালুর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে ডাক অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. জাকির হাসান নূর গণমাধ্যমকে জানান, ডাক বিভাগ মূলত একটি ঐতিহ্যবাহী সরকারি সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠান। সুতরাং, একে কেবল লাভ-লোকসানের বাণিজ্যিক মাপকাঠিতে মূল্যায়ন করা যাবে না।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, আধুনিক প্রযুক্তির প্রভাবে ব্যক্তিগত চিঠিপত্রের আদান-প্রদান কমে গেলেও সরকারি দাপ্তরিক এবং আদালতের চিঠিপত্রের পরিমাণ আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। বর্তমানে সড়ক ও রেলপথের সুচিন্তিত সমন্বয়ের মাধ্যমে ডাক বিভাগে একটি আধুনিক লজিস্টিকস ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন....

আমাদের ফেসবুক পাতা

আজকের আবহাওয়া


এক্সক্লুসিভ আরও