তীব্র গরমে বিপর্যস্ত জনজীবন
আগস্ট ১৩ ২০২৬, ০২:৫১
তীব্র দাবদাহ আর ভ্যাপসা গরমে বর্তমানে বিপর্যস্ত গোটা দেশের জনজীবন। শ্রাবণ মাসের শেষ কিংবা ভাদ্রের প্রাক্কালে বাংলার প্রকৃতি যেন এক বিশাল অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হয়েছে। সূর্যের প্রচণ্ড তেজ আর বাতাসে জলীয় বাষ্পের আধিক্যের কারণে অনুভূত হচ্ছে তীব্র অস্বস্তি।
রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে মফস্বল শহর এবং সুদূর জনবিরল গ্রামাঞ্চল- সবখানেই আজ একই হাহাকার। ঘরের ভেতরে ফ্যান চালিয়েও মিলছে না স্বস্তি সাথে লোডশেডিং, আর বাইরে বের হলে কাঠফাটা রোদে পুড়ছে চামড়া।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, মৌসুমি বায়ুর সক্রিয়তার ঘাটতি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বহুমুখী প্রভাবে এ বছরের গরম অতীতের অনেক রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না থাকায় তাপমাত্রা যেমন ঊর্ধ্বমুখী, তেমনি বাতাসে অতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে ঘাম ঝরছে অঝোরে। এই অসহনীয় আবহাওয়া মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে পুরোপুরি স্থবির করে দিয়েছে।
দৈনন্দিন জীবিকা নির্বাহের তাগিদে যারা ঘরের বাইরে পা রাখছেন, তাদের দুর্ভোগের শেষ নেই। রিকশাচালক, দিনমজুর, ভ্যানচালক থেকে শুরু করে ফুটপাতের ছোট ব্যবসায়ীরা পড়েছেন সবচেয়ে বিপাকে। প্রখর রোদের তাপে রাস্তায় বেশিক্ষণ টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ছে। সামান্য ছায়া বা একটু ঠাণ্ডা পানির খোঁজে মানুষের ছোটাছুটি যেন নিত্যদিনের রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অফিসগামী মানুষ আর স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীরা তীব্র গরম ও জ্যামের যাঁতাকলে পড়ে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।
অন্যদিকে, এই প্রচণ্ড গরমে খেটে খাওয়া মানুষের আয়ের পথ সংকুচিত হয়ে এসেছে, কারণ দুপুরের দিকে স্বাভাবিক কাজকর্ম প্রায় বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। নগরীর কংক্রিটের জঙ্গল এই গরমের তীব্রতা আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। সবুজ গাছপালা ও জলাশয় কমে যাওয়ার কারণে ইট-পাথরের দালানকোঠাগুলো যেন একেকটি চুল্লিতে রূপ নিয়েছে।
এসির অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণেএকদিকে যেমন বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর মাত্রাতিরিক্ত চাপ পড়ছে, অন্যদিকে তা শহরের উষ্ণতা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিত্তবানরা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে কিছুটা স্বস্তি পেলেও নিম্নবিত্ত ও বস্তিবাসীদের দিন কাটছে চরম মানবেতর অবস্থায়। টিনশেড ঘরগুলোতে গরমের তীব্রতা এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে রাতের বেলাও ঘরে টেকা দায় হয়ে পড়ে।
এই চরম আবহাওয়ার সবচেয়ে বড় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে জনস্বাস্থ্যের ওপর। হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতে ডায়রিয়া, হিটস্ট্রোক, জ্বর, সর্দি-কাশি এবং হিট এক্সহশনের রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। তীব্র গরমে দূষিত পানি ও পচা খাবার খাওয়ার ফলে পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে মারাত্মকভাবে। বিশেষ করে শিশু এবং বয়স্করা এই গরমজনিত অসুস্থতার প্রধান শিকড় হয়ে পড়েছেন। অনেক শিশু ও বৃদ্ধ গরমে হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারাচ্ছেন, যা জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য এক বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চিকিৎসকরা জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে না যাওয়ার এবং প্রচুর পরিমাণে বিশুদ্ধ পানি ও তরল খাবার খাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন।
একই সঙ্গে এই তাপপ্রবাহের মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে কৃষি খাতেও। প্রয়োজনীয় বৃষ্টির অভাবে আমন ধানসহ মাঠের বিভিন্ন ফসল শুকিয়ে চিটা হয়ে যাচ্ছে। পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় সেচ কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, যার ফলে কৃষকরা চরম অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। প্রাণিকুলও এই দাবদাহ থেকে রেহাই পাচ্ছে না; পশুপাখি ও গবাদিপশু গরমে অসুস্থ হয়ে পড়ছে। তীব্র গরম ও বিদ্যুৎ সংকটে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের জনজীবন প্রায় থমকে গেছে।
খুলনাঞ্চল: খুলনায় গত এক সপ্তাহ ধরে চলছে ভয়াবহ লোডশেডিং। বিভাগীয় এই শহরে দিন-রাত মিলিয়ে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা এবং গ্রামাঞ্চলে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকছে। তীব্র গরমে বিকল্প কোনো ব্যবস্থা না থাকায় বাসাবাড়ির ফ্রিজে রাখা খাদ্যসামগ্রী ও ওষুধপত্র নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। চট্টগ্রাম ও মাদারীপুর: বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামে দিনে ও রাতে দফায় দফায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকছে। এর ফলে বাসাবাড়ি, বিপণিবিতান, দোকানপাট এবং ছোট ও মাঝারি শিল্পকারখানার স্বাভাবিক উৎপাদন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি শোচনীয় অবস্থা মাদারীপুর জেলার পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির গ্রাহকদের। বিদ্যুৎহীনতার কারণে অনেক কারখানার উৎপাদন নেমে এসেছে অর্ধেকে।
সিলেট ও ময়মনসিংহ: সিলেটের চার জেলার পিডিবি (বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড) আওতাধীন এলাকায় বিদ্যুতের বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। পল্লী বিদ্যুতের গ্রাহকরাও একই রকম ভয়াবহ ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। অন্যদিকে, ময়মনসিংহ নগরীর প্রায় প্রতিটি এলাকায় নিয়মিতভাবে প্রতি এক থেকে দেড় ঘণ্টা পর পর বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটছে।
অন্যান্য জেলাসমূহ: কুমিল্লায় বর্তমানে চাহিদার বিপরীতে বিদ্যুতের ঘাটতি রয়েছে ২৬০ মেগাওয়াট। চট্টগ্রামে ঘাটতির পরিমাণ ১৪১ মেগাওয়াট। নেসকোর আওতাধীন রংপুর মহানগরে ৯৫ থেকে ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম পাওয়া যাচ্ছে। শেরপুরে চাহিদার অর্ধেক এবং নীলফামারীতে তার চেয়েও কম বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। এছাড়া মানিকগঞ্জে ১৯৪ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে বিদ্যুৎ সরবরাহ মিলছে মাত্র ১৩৭ মেগাওয়াট।
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চাহিদার তুলনায় জাতীয় গ্রিড থেকেই সামগ্রিক বিদ্যুৎ সরবরাহ কম হওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তীব্র গরমের কারণে হঠাৎ করেই বিদ্যুতের চাহিদা রেকর্ড পরিমাণে বেড়ে গেছে, কিন্তু সেই তুলনায় উৎপাদন বা আমদানির মাত্রা বাড়েনি। ফলে পুরো সিস্টেমের ভারসাম্য রক্ষা করতে গিয়ে বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোকে বাধ্য হয়ে এলাকাভিত্তিক লোডশেডিং বা শিডিউলভিত্তিক বিদ্যুৎ বন্ধ রাখতে হচ্ছে।
এই সংকটের বিষয়ে ওজোপাডিকো বরিশালের পরিচালন ও সংরক্ষণ সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পরিতোষ চন্দ্র সরকার বলেন, ‘আমরা কেন্দ্রীয়ভাবে চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ পাচ্ছি না। যে কারণে বাধ্য হয়ে লোডশেডিং করতে হচ্ছে। তবে আশা করছি খুব শিগগিরই এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে। বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়লেই লোডশেডিংয়ের মাত্রা কমে আসবে।’
বিদ্যুৎ না থাকায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে শিক্ষার্থীরা। বিশেষ করে গরমের চোটে পড়াশোনায় মনোনিবেশ করতে পারছে না তারা। রাতে অন্ধকার ও ভ্যাপসা গরমে পড়াশোনা তো দূরের কথা, ঘুমানোও দায় হয়ে পড়েছে। সামনে বিভিন্ন পরীক্ষা থাকায় শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। গ্রাম ও উপজেলা পর্যায়ের চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতে লোডশেডিংয়ের কারণে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে।
আইসিইউ বা জরুরি বিভাগগুলোতে জেনারেটরের ব্যবস্থা থাকলেও তা দীর্ঘ সময় সচল রাখা ব্যয়বহুল ও দুরূহ হয়ে পড়েছে। নবজাতক ও বয়স্ক রোগীরা গরমে হিটস্ট্রোকের ঝুঁকিতে রয়েছেন। দোকানপাট ও শপিংমলগুলোতে জেনারেটর বা আইপিএসের ব্যবস্থা না থাকায় ক্রেতাশূন্য হয়ে পড়ছে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো।
এছাড়া ছোট ও মাঝারি শিল্পকারখানা, আইটি ফ্রিল্যান্সার, এবং ওয়েল্ডিং, প্রিন্টিংয়ের মতো ক্ষুদ্র কারখানাগুলো অর্ধেকের বেশি সময় বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এতে হাজার হাজার শ্রমিক কর্মহীন সময় কাটাচ্ছেন এবং মালিকপক্ষ আর্থিকভাবে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়ছে।
তীব্র গরমে লাগাতার লোডশেডিং এখন কেবল একটি সাময়িক সেবা সংকট নয়, এটি জনজীবন ও জাতীয় অর্থনীতির জন্য একটি বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতি কাটানো এবং উৎপাদন কেন্দ্রগুলোকে পূর্ণ সক্ষমতায় সচল রাখার জন্য দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি বলে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।






































