জনপ্রত্যাশার ইশতেহার ঘোষণা
অঞ্চলভিত্তিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও নাগরিক সেবাই আমাদের মূখ্য অঙ্গিকার -পীর সাহেব চরমোনাই
ফেব্রুয়ারি ০৪ ২০২৬, ২০:৩৪
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম, পীর সাহেব চরমোনাই বলেছেন, ইশতেহার জাতির প্রতি আমাদের একটি প্রতিজ্ঞা। সেই ইশতেহারে রাষ্ট্র গঠনের নীতিগত ও প্রশাসনিক সংস্কার, অঞ্চলভিত্তিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের জন্য জরুরী ব্যবস্থা, সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও নাগরিক সেবা-ই আমাদের মূখ্য অঙ্গিকার হিসেবে ঘোষণা করছি। বাংলাদেশের ৯০% মানুষ মুসলমান। তাই রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বত্র শরীয়াহ-র প্রাধান্য নিশ্চিত করা হবে।
আজ ৪ঠা ফেব্রুয়ারি, বুধবার বিকাল তিনটায় উপস্থাপিত ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ইশতেহারের শিরোনাম রাখা হয়েছে “জনপ্রত্যাশার ইশতেহার”। ইশতেহারে মৌলিক ইশতেহার শিরোনামে ৩১ টি বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে রাষ্ট্রের নীতিগত সংস্কার, সুশাসন, বিগত আমলে সংঘঠিত নাগরিক সমস্যার সমাধান ও জরুরী নাগরিক সেবা সম্পর্কিত নানা বিষয়ে দলের অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে। এরপরে বিশেষ কর্মসূচি হিসেবে ১২ দফা ঘোষণা করা হয়েছে।
নিন্মে ইশতেহার তুলে ধরা হলো।
জনপ্রত্যাশার ইশতেহার ভূমিকা
নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রের পরিচালক ও রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণ হয়। আর নির্বাচনের আগে ইশতেহারের মাধ্যমে জাতির সামনে দলের নীতি-ভাবনা ও দেশ গঠনের রুপরেখা উপস্থাপন করা হয়। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ তার নীতি-ভাবনা ও দেশ গঠনের রুপরেখা ও কর্মসূচি উপস্থাপন করার জন্য এই ইশতেহার পেশ করছে।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ইশতেহার জাতির সাথে একটি প্রতিজ্ঞা। আপনাদের সমর্থনে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে এই ইশতেহারের প্রতিটি ধারা বাস্তবায়নে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ দৃঢ় প্রতিজ্ঞ থাকবে; ইনশাআল্লাহ।
২৪ এর জুলাইয়ে শুরু হওয়া এক ছাত্র আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় গণঅভ্যুত্থান সংঘঠিত হয়। দুইহাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু, হাজার হাজার নাগরিকের পঙ্গুত্ব ও অন্ধত্বের বিনিময়ে জুলুমশাহীর পতন ঘটে। আমরা মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ ও জুলাইয়ের গনঅভ্যুত্থানের অংশগ্রহনকারী, আহত ও আত্মউৎসর্গকারীদের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি।
ইশতেহারকে আমরা তিনটি অধ্যায়ে উপস্থাপন করছি;
১. রাষ্ট্র গঠনে আমাদের নীতিগত অবস্থান।
২. রাষ্ট্র সংস্কারে আমাদের পরিকল্পনা।
৩. খাতভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা।
রাষ্ট্র গঠনে নীতিগত ০৮ দফা
১. রাষ্ট্র পরিচালনার সকল ক্ষেত্রে ইসলামের মৌলিক নীতিমালার পরিপালন
ইসলাম প্রচলিত অর্থে ধর্ম বলতে যা বোঝায় তার চেয়েও বিস্তৃত একটি ধারণা। বিশ্বাসের সমষ্টি ও ইবাদতের সাথে সাথে ইসলাম জীবন পরিচালনার সকল ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও নির্দেশনা দেয়। বিশেষ করে মানুষের সবচেয়ে বড় যৌথ প্রকল্প রাষ্ট্র ও শাসন সংক্রান্ত বিষয়ে ইসলামের নির্ধারিত, বিস্তৃত এবং বহু শতাব্দি চর্চিত রীতি-নীতি ও বিধিমালা রয়েছে। যার আলোকে ১৩শ বছর মানবসভ্যতা শান্তি ও সমৃদ্ধির সাথে পরিচালিত হয়েছে। রাষ্ট্র পরিচালনায় ইসলামের মৌলিক নীতিমালার মধ্যে রয়েছে আদালত, ইনসাফ, নাগরিকের স্বার্থের প্রতি সংবেদনশীলতা, দায়বদ্ধতা, সামাজিক নিরাপত্তা ও আইনের শাসন। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে এই মৌলিক নীতিমালার পূর্ণ প্রতিপালন করবে।
২. ক্ষমতার চর্চা ও হস্তান্তরে গণতান্ত্রিক পদ্ধতির ধারণ
একটি ন্যায়ভিত্তিক, নিরাপদ, সুশাসিত ও সাম্যভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা হবে। শাসন ও রাষ্ট্র সংক্রান্ত ইসলামের ধারনায় “ক্ষমতার চর্চা” হয় না বরং “দায়িত্ব পালন” এর মনোভাব প্রধান্য বিস্তার করে। নাগরিকের সাথে শাসকের সম্পর্ক “ক্ষমতার সম্পর্ক”না বরং “দায়িত্ব” এর সম্পর্ক বিরাজ করে। এই নীতিবোধ থেকে রাষ্ট্র পরিচালনা করা হবে এবং দায়িত্ব হস্তান্তরে আগ্রহী দৃষ্টিভঙ্গি লালন করা হবে।
ক্ষমতা হস্তান্তর কেন্দ্রীক অস্থিরতা থেকে দেশকে বের করে আনা হবে। ভোটাধিকার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ চর্চিত হবে।
রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা, ক্ষমতা ও জবাবদিহিতা এবং ক্ষমতার ভারসাম্য সাংবিধানিকভাবে স্পষ্ট করা হবে, যাতে নির্বাহী আধিপত্য ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমে।
জাতীয় স্বার্থ, নাগরিক অধিকার ও রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল আচরণ রক্ষায় সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হবে।
৩. সকল ধর্ম ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্টির অধিকার-সন্মান রক্ষায় প্রতিশ্রুতি
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ দেশের সকল মানুষকে সমান অধিকার ও মর্যাদা সম্পন্ন নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করে। ধর্ম বা জাতি বিবেচনায় কাউকে সংখ্যালঘু বা সংখ্যাগুরু বিবেচনা করবে না।
সকলের ধর্মীয় বিশ্বাস রক্ষা ও পালনের নিরাপদ ও উৎসবমূখর পরিবেশ নিশ্চিত করতে আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।
ক্ষুদ্র নৃগোষ্টির ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি এক ধরণের হুমকি থাকায় তা রক্ষায় বিশেষ কর্মপরিকল্পনা নেয়া হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক সহিংসতা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপট সহনশীলতা ও পরমতসহিষ্ণুতা রক্ষায় কার্যকর ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেয়া হবে।
৪. পারস্পরিক সম্মান ও সহযোগীতামূলক বৈদেশিক সম্পর্ক
ইসলাম প্রতিবেশির সাথে আস্থার ও কল্যাণকামীতার সম্পর্ক গড়ার নির্দেশ দেয়। প্রতিবেশির প্রতি শত্রুতামূলক আচরন থেকে নিষেধ করে। ফলে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ঘোষণা করছে যে,
বাংলাদেশ তার সকল প্রতিবেশি ও বিশ্বের অপরাপর রাষ্ট্রের সাথে পারস্পরিক সন্মান ও সহযোগীতার সম্পর্ক গড়ে তুলবে।
ব্যবসা-বাণিজ্য, প্রযুক্তি-জ্ঞান ও সংস্কৃতির আদান-প্রদানে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করবে। বাংলাদেশের ভূমি ব্যবহার করে কোন দেশের কোন ক্ষতি হতে দেয়া হবে না।
মুসলিম উম্মাহের পারস্পরিক সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে।
বাংলাদেশের আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সম্পর্ককে শান্তিপূর্ণ, ভারসাম্যপূর্ণ ও জাতীয় স্বার্থসংরক্ষণমূখী করা হবে যাতে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, উন্নয়ন ও মর্যাদা সুসংহত থাকে।
৫. সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা
রাষ্ট্র পরিচালনায় সুশাসন, স্বচ্ছতা ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করা হবে। দক্ষ ও নিরপেক্ষ প্রশাসন গড়ে তোলা হবে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহকে পেশাদারিত্ব, নৈতিকতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করতে বাধ্য করা হবে।
রাষ্ট্র পরিচালনায় নাগরিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং জনমতের প্রতি সম্মান নিশ্চিত করা হবে, যাতে নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন জনস্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।
সংবিধানে নির্ধারিত ন্যায়পাল প্রতিষ্ঠান অবিলম্বে কার্যকর করা হবে এবং তাকে প্রকৃত অর্থে স্বাধীন ও ক্ষমতায়ন করা হবে।
সরকারি ও উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দ, ব্যয় ও বাস্তবায়নের অগ্রগতির তথ্য একটি উন্মুক্ত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রকাশ করা হবে।
সব সরকারি দপ্তরের নথি ও ফাইল ব্যবস্থাপনা ধাপে ধাপে সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজেশন করা হবে।
সংসদ সদস্য ও জনপ্রতিনিধিদের সম্পদের হিসাব দায়িত্ব গ্রহণের শুরুতেই এবং পরবর্তী সময়ে নিয়মিতভাবে প্রকাশ করা হবে। ক্ষেত্র বিশেষে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও দুদক এর সঠিকতা যাচাই করবে।
জাতীয় বাজেটের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা হবে এবং স্থানীয় সরকারের বাজেট ও ব্যয়ের বাৎসরিক প্রতিবেদন জনসম্মুখে প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা হবে।
সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির উপকারভোগী তালিকা জনসম্মুখে প্রকাশ নিশ্চিত করা হবে।
নাগরিকদের অভিযোগ, মতামত ও সেবা-সংক্রান্ত সমস্যা জানানোর জন্য একটি কেন্দ্রীয় জবাবদিহিতা পোর্টাল চালু করা হবে।
কর্পোরেট খাতে জবাবদিহিতা এবং এনজিও কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কার্যকর তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।
নাগরিক সংগঠনগুলোর স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে নাগরিক পরিসর সংকুচিত না হয়।
৬. বৈষম্যবিরোধিতা ও ন্যায্যতা
রাষ্ট্রচিন্তা, আইন প্রণয়ন ও নীতিনির্ধারণের প্রতিটি স্তরে পিছিয়ে পড়া ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর বাস্তব অভিজ্ঞতা ও প্রয়োজন প্রতিফলিত করা হবে।
বৈষম্যকে একটি কাঠামোগত সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে তার আইনগত, প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক প্রতিকার নিশ্চিত করা হবে।
পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়ন রাষ্ট্রীয় নীতি ও বাজেট প্রণয়নের কেন্দ্রে রাখা হবে। অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক সমতা নিশ্চিত করা হবে এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের পথে সেবা ও সুযোগপ্রাপ্তির কাঠামোগত বাধা দূর করা হবে।
একটি কার্যকর বৈষম্যবিরোধী আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা হবে।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে স্বাধীন, স¶ম ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা হবে।
তৃতীয় লিঙ্গ/হিজড়া জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়ায় অর্থবহ ও সম্মানজনক প্রতিনিধিত্ব, ভোটার নিবন্ধন, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সুরক্ষায় পূর্ণ, বৈষম্যহীন অভিগম্যতা নিশ্চিত করা হবে।
শরীয়াহ মোতাবেক নারীদের সম্পত্তির উত্তরাধিকার নিশ্চিত করতে আইনগত ও সামাজিক বাস্তবায়ন জোরদার করা হবে।
পথশিশু ও বস্তিবাসীদের জন্য সুনির্দিষ্ট সামাজিক সুরক্ষা ও পুনর্বাসন নীতি অন্তর্ভুক্ত করা হবে। ‘গৃহকর্মী, অনানুষ্ঠানিক ও অবৈতনিক পরিচর্যা কাজে নিয়োজিত নারীদের শ্রমের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে।
৭. দুর্নীতির মূলোৎপাটন
বাংলাদেশের প্রধান সমস্যা হলো দুর্নীতি। ইসলামী আন্দোলন নৈতিক, আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক বহুমাত্রিক কৌশলে ও কর্মপন্থায় দুর্নীতিকে ক্রমান্বয়ে শুণ্যের কোঠায় নামিয়ে আনবে।
দুর্নীতিবিরোধী আইন ও নীতিমালা কাগজে সীমাবদ্ধ না রেখে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা হবে।
রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি প্রতিরোধ করা হবে, আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা জোরদার করা হবে এবং বাজারে প্রবেশ ও কার্যক্রমে ন্যায্য প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে বাজার ও সেবাখাতে সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করা হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নিশ্চিত করা হবে।
সরকারি নিয়োগ ও পদোন্নতিতে ঘুষ, স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক প্রভাবের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতি কার্যকর করা হবে।
রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দুর্নীতির ক্ষেত্রে দৃষ্টান্তমূলক ও প্রকাশ্য শাস্তি নিশ্চিত করা হবে, যাতে আইনের ঊর্ধ্বে কেউ না থাকে।
সেবাখাতে সিন্ডিকেট চক্র বন্ধ করা হবে এবং সেবা প্রদানে ঘুষ ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।
কর ফাঁকি ও আর্থিক খাতের অনিয়ম রোধে কার্যকর নজরদারি ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।
৮. নারীর মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠা
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ নারীর প্রতি দায় বোধ করে। এবং নারীর বিদ্যমান পরিস্থিতি যে সমস্যাজনক তাও স্বীকার করে। সেজন্য নারীর মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় এই ভূমির হাজার বছরের বোধ-বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের আলোকে করণীয় সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। এখানে উল্লেখ্য যে, বিদ্যমান চিন্তাকাঠামোতে শরীয়াহ-ও নারীকে পরস্পর বিরোধী হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
আমরা দৃঢ়তার সাথে বলতে চাই যে, নারীর কর্মসংস্থান, অধিকার, মর্যাদা ও স্বাধীনতার জন্য ইসলাম-ই সবচেয়ে কার্যকর নীতি। আমাদের ইশতেহারের পরতে-পরতে তার প্রতিফলন দেখা যাবে ইনশাআল্লাহ।
রাষ্ট্র গঠনে আমরা ৬ দফা
১. মহান মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রতি দায়বদ্ধতা
ইসলামী আন্দোলন এই ব্যাপারে তার প্রতিজ্ঞা পুর্নব্যক্ত করছে যে, মহান মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রত্যাশা পুরোমাত্রায় বাস্তবায়ন করা হবে। ইসলামী আন্দোলন সংস্কারে যেসকল বিষয়ে উত্থাপন করেছিলো -যেমন পিআর পদ্ধতিতে জাতীয় নির্বাচন আয়োজন করা-সেগুলোও রাষ্ট্রের স্বার্থে প্রয়োজনীয় ধারাক্রম অনুসরণ করে বাস্তবায়ন করা হবে।
২. পিআর পদ্ধতিতে জাতীয় নির্বাচন
বিশ্বের বহুদেশের অনুসৃত বাস্তবতা, বাংলাদেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক অস্থিরতা দুর করতে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মনে করে পিআর পদ্ধতি একটি কার্যকর সমাধান। সেজন্য আমরা ক্ষমতায় গেলে পিআর পদ্ধতি প্রবর্তন করবো।
৩. ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করা
বাংলাদেশে বিগত ১৭ বছরের ফ্যাসিবাস দেশের বিদ্যমান সংবিধান মেনেই ফ্যাসিবাদী হয়ে উঠেছিলো। আমাদের সংবিধানে এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সেই সুযোগ করে দেয়া আছে। রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে ক্ষমতার ভারাসাম্য নষ্ট করে একক ব্যক্তিকে অতিমাত্রায় ক্ষমতায়িত করা আছে। আমরা ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করবো।
৪. সেবাভিত্তিক দক্ষ ও সৎ উন্নত জনপ্রশাসন গড়ে তোলা
বাংলাদেশ উপনিবেশন থেকে দুই-দুইবার স্বাধীনতা অর্জন করেছে। কিন্তু তিক্ত বাস্তবতা হলো, আমাদের জনপ্রশাসন এখনো বিট্রিশ আইন, আচার-প্রথা ও রীতি-নীতিতে পরিচালিত হয়। ফলে জনপ্রশাসনের কর্তব্যরতরা নিজেদেরকে জনতার সেবক না ভেবে প্রভু ভাবেন। আমরা এর আমূল পরিবর্তন আনবো।
জনসেবামুখি, দক্ষতা ও জবাবদিহিতামূলক জনপ্রশাসন গড়ে তুলবো।
উন্নয়ন কর্মকান্ডের উৎকর্ষতা একটি দক্ষ সৎ ও কার্যকর প্রশাসনের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। এ অনুধাবনে প্রণিত হয়ে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত একটি পেশাদারী সরকারী প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।
সেবাপ্রদানকারী সকল সরকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকান্ডে সেবাগ্রহীতাদের কাছে জবাবদিহিতার নিশ্চয়তা বিধানে একটি সুনির্দিষ্ট ফ্রেমওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা করা হবে।
উন্নয়ন প্রশাসনের সকল পর্যায়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূণ্য সহিষ্ণুতার সংস্কৃতি চালু করা হবে। এ সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠায় এ.সি.সি.কে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেয়া হবে।
সরকারী ব্যয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার নিশ্চয়তা বিধানে সরকারী ক্রয়, বিনিয়োগ, বিনিয়োগে অগ্রগতি, টেন্ডার, অর্থব্যয়, প্রজেক্ট সংশ্লিষ্ট সকল তথ্য উন্মুক্ত করা হবে।
সরকারী ব্যয়ের অগ্রাধিকার নির্ধারণ ও ব্যয়ের দক্ষতা ও উৎকর্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ‘পাবলিক এক্সপেন্ডিচার রিভিউ কমিশন’ গঠন করা হবে।
৫. রাজস্ব স্পেস এর সম্প্রসারণ
রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তনের লক্ষ্য হবে রাজস্ব আয়-জিডিপি-র হারের উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি যাতে আগামী পাঁচ বছরে এ হার দক্ষিণ এশিয়ার গড় হারের সমপর্যায়ে (১৪-১৫%) উন্নিত করা সম্ভব হয়।
রাজস্ব ব্যবস্থাপনার উৎকর্ষতা বিধানে এন.বি.আর এর যেসব সংস্কার কার্যক্রম গৃহীত হয়েছে সেগুলির বাস্তবায়ন করা হবে।
সরকারী মালিকানায় যেসব প্রতিষ্ঠান (এস.ও.ই.) আছে সেগুলির কার্যক্রম, অর্থায়ন, আর্থিক অবস্থা ইত্যাদির পরীবিক্ষণ ও মূল্যায়নপূর্বক লভ্যতা ও সামাজিক উপযোগীতার নিরীখে এগুলোর ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।
রাজস্ব আহরণের সকল পর্যায়ে প্রযুক্তিকে প্রাধান্য দিয়ে বিনিয়োগ করা হবে, যাতে সমন্বিতভাবে তথ্য আহোরণ সম্ভব হয়, কর প্রদান সহজতর হয় এবং ব্যয় ও আয়ের সমন্বয় বিধানের মাধ্যমে কর ফাঁকি দূর করা যায়।
৬. স্বনির্ভর শক্তিশালী ও বহুমাত্রিক ডিফেন্স সিস্টেম গড়ে তোলা
বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশ। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় স্বাধীনতা টিকিয়ে রাখা দুস্কর। মতাদর্শগত ভিন্নতার কারণে অন্য দেশের স্বার্ববৌমত্ব লংঘন করার ঘটনা খুবই সাধারণ ঘটনায় পরিনত হয়েছে। সেজন্য আমরা স্বনির্ভর ও শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলবো। আকাশ, নৌ ও স্থল বাহিনীর সক্ষমতা বিশ্বমানের করে তুলবো।
ইশতেহারের মৌলিক অংশ
১. দেশের স্থায়ী শান্তি ও মানবতার সার্বিক মুক্তির লক্ষ্যে রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন।
২. দুর্নীতি, দুঃশাসন, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, মাদকমুক্ত কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা।
৩. সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সুশাসন ও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা।
৪. রাষ্ট্রপরিচালনায় সর্বত্র শরীয়াহ’র প্রধান্য।
৫. কৃষি ও শিল্পবিপ্লব ঘটিয়ে বেকার ও দারিদ্র্যমুক্ত এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধশালী দেশ গঠন।
৬. নৈতিকতায় সমৃদ্ধ কর্মমুখী, বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা।
৭. সার্বজনীন কর্মসংস্থান।
৮. পর্যায়ক্রমিক রাষ্ট্রসংস্কার।
৯. মহান মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রত্যাশার প্রতি দায়বদ্ধতা।
১০. আর্থিক, সামরিক ও কূটনৈতিক স¶মতা বৃদ্ধি।
১১. নারী, শ্রমিক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকারসহ সকল জনগোষ্ঠীর মৌলিক ও মানবাধিকারের সুরক্ষা।
১২. রাষ্ট্র-সমাজ ও অর্থনীতিতে বৈষম্য বিলোপ।
১৩. সকলের জন্য সাশ্রয়ী ও উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থা।
১৪. পরিবেশ দূষণ রোধ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু অভিঘাত ব্যবস্থাপনায় গুরুত্ব।
১৫. ধর্মীয় স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও পারস্পরিক সহাবস্থান।
১৬. শুধু দুর্নীতি-সন্ত্রাস দমন নয়; নির্মূলকরণ কর্মসূচিও গ্রহণ করা হবে।
১৭. শুধু আইনের শাসন নয়; ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠা।
১৮. জনমতের যথার্থ প্রতিফলন, সুষ্ঠু নির্বাচন ও কার্যকর সংসদ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে PR (Proportional Repesentation) পদ্ধতি বাস্তবায়ন।
১৯. মানুষের সার্বিক কল্যাণ প্রতিষ্ঠায় ধর্ম ও রাজনীতির সমন্বয় করা।
২০. দুর্নীতি, সন্ত্রাস, খুন ও অনৈতিক পেশার সাথে জড়িতদের রাজনীতিতে নিষিদ্ধ করণ।
২১. খুন, গুম, মিথ্যা, গায়েবী মামলা, জুলুম, নির্যাতন ও দুঃশাসনের বিলোপ।
২২. জনগণের বাক-স্বাধীনতা এবং গণমাধ্যমের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।
২৩. নারীদের শুধু সমঅধিকার নয়; অগ্রাধিকার প্রতিষ্ঠা করা হবে।
২৪. শিল্পোদ্যোক্তাদের ঋণ প্রদান, গ্যাস, বিদুূৎ, পানি, স্যুয়ারেজ, আমদানী-রফতানী কার্যক্রমে ওয়ানস্টপ সার্ভিস কর্মসূচি গ্রহণ।
২৫. সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে জাতীয়করণ করা।
২৬. মৎস ও প্রাণী সম্পদখাতে বিদ্যমান সমস্যা দুর করে এইখাতে বাংলাদেশকে স্বয়ংসম্পূর্ণ ও বৈশ্বিকমানে উন্নিত করা হবে।
২৭. সড়ককে নিরাপদ করার জন্য প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
২৮. বাংলাদেশকে ১৫ বছরের মধ্যে উন্নত ও কল্যাণরাষ্ট্রে পরিণত করা।
২৯. শ্রমের মর্যাদা ও শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা।
৩০. সরকারী চাকরিজীবীদের জাতীয় পে-স্কেল যুগোপযোগী এবং সর্বোচ্চ সন্মানজনক করা হবে।
১২ দফা বিশেষ কর্মসূচি
বিশেষ কর্মসূচি
১. প্রতি মাসে ৫,০০০/- টাকা হতদরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য নগদ সহায়তা।
২. প্রাথমিক স্তরের সকল শিক্ষার্থীর জন্য প্রতিদিন একবেলা করে পুষ্টিকর খাবার।
৩. ১৮ থেকে ২৪ বছরের যুবদের জন্য সুদমুক্ত, জামানতবিহীন এককালীন ঋণের ব্যবস্থা করা।
৪. সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচি বা স্বাস্থ্যকার্ড, ভর্তুকিমূল্যে কৃষি উপকরণ দেয়া ও বিভিন্ন সেবা সহজে পৌছাতে কৃষিকার্ড চালু করা।
৫. ন্যাশনাল জব পোর্টাল। যেখানে সব পেশার চাকরি প্রার্থীদের জন্য দেশে ও বিদেশে চাকরি খোঁজা, পরামর্শ প্রদান ও প্রশিক্ষণ গ্রহণের সুবিধা থাকবে।
৬. কর্মজীবী মায়েদের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক দিবাযত্ন কেন্দ্র গড়ে তোলা।
৭. ঢাকাসহ সকল নগরে সরকার নিয়ন্ত্রিত ও ফ্রাঞ্চাইজ ভিত্তিক বাস ব্যবস্থাপনা।
৮. সেবাকেন্দ্রিক কর ব্যবস্থা।
৯. সকলের জন্য নির্বিঘ্ন নাগরিক সেবা।
১০. নারী পোষাক কর্মীদের জন্য আবাসন ব্যবস্থা।
১১. দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রনে রাখতে অবৈধ সিন্ডিকেট ভেঙ্গে দেয়া হবে।
১২. কওমি সনদের স্বীকৃতির পুর্ণবাস্তবায়ন ও রাষ্ট্রীয় পদে ওলামায়ে কেরামের পদায়ন।
খাতভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনার ২৮ দফা (শিরোনাম আকারে)
১. অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি
২. মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রন ও ক্রয়সক্ষমতা সংরক্ষণ
৩. বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনা
৪. সুশাসিত আর্থিক খাত ব্যবস্থাপনা
৫. স্বল্পোন্নত দেশ থেকে টেকসই উত্তরণ
৬. বিনিয়োগের স্বর্গ হিসেবে বাংলাদেশকে গড়ে তোলা
৭. জননিরাপত্তা ও আইনের শাসন
৮. নাগরিক সুবিধা সম্বলিত শহর ও গ্রাম
৯. নৈতিকতায় সমৃদ্ধ কর্মমূখি বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা
১০. সার্বজনীন কর্মসংস্থান
দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রম বাজার পরিস্থিতির আলোকে যুবদের জন্য শোভন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি
১১. শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে শিক্ষা ব্যবস্থার সমন্বয় সাধন
অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা
নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি
আইসিটি ও উচ্চ-প্রযুক্তি খাত উন্নয়ন
১২. উৎপাদন-সংরক্ষন ও বিপননকে প্রধান্য দিয়ে সমন্বিত কৃষি ব্যবস্থা
আধুনিক পদ্ধতি ও প্রযুক্তি গ্রহণ এবং অভিযোজন
অর্থায়ন ও প্রণোদনা
ক্ষুদ্র ও পিছিয়ে পড়া কৃষকদের জন্য করণীয়
১৩. প্রবাসী কল্যাণ
অভিবাসন সংশ্লিষ্ট চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা
১৪. সার্বজনীন উন্নত ও সাশ্রয়ী চিকিৎসা ব্যবস্থা
সাশ্রয়ী ও মানসম্মত ওষুধ নিশ্চিতকরণ
অসুবিধাগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবায় বিশেষ উদ্যোগ
সরকারি সেবা ব্যবস্থায় দক্ষতা ও কার্যকারিতা বৃদ্ধি
১৫. সিনিয়র সিটিজেন ম্যানেজমেন্ট
১৬. আঞ্চলিক উন্নয়ন ভারসাম্য
পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল
রংপুর অঞ্চল
বরেন্দ্র অঞ্চল
খুলনা-বরিশাল অঞ্চল
নদীভাঙন ও হাওর অঞ্চল
১৭. “বাংলাদেশ হবে বিশ্ব পর্যটনের রাজধানী”
১৮. নিরাপদ ও বহুমাত্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
১৯. সবার জন্য সাশ্রয়ী ও দূষণমুক্ত জ্বালানির নিশ্চয়তা
অভ্যন্তরীণ প্রাকৃতিক গ্যাসের উন্নয়নে অগ্রাধিকার প্রদান
আর্থিক চাপ হ্রাস এবং জ্বালানি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা
জাতীয় স্বার্থের চাহিদা পূরণে সুপরিকল্পিত ও স্বচ্ছ নীতি প্রণয়ন
২০. পরিবেশ, জলবায়ু ও বন রক্ষায় দেশিয় বাস্তবতা ও আন্তর্জাতিক প্রটোকল অনুসরন করা
২১. গৃহায়ণ ও গণপূর্ত
২২. তথ্য ও সম্প্রচার
২৩. শ্রম ও কর্মসংস্থান
২৪. স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের শক্তিশালীকরণ এবং ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ
২৫. আধুনিক, টেকসই ও স্বাস্থ্যসম্মত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা
২৬. জলবায়ু পরিবর্তন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ
২৭. পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা (Water Resource Management)
২৮. জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও মুক্তিযুদ্ধ
খাতভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনার ২৮ দফা (বিস্তারিত)
০১. অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি
আধুনিক বিশ্বে যে কোন রাষ্ট্রের প্রধান শক্তির জায়গা তার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও শক্তি। আমাদের অর্থনীতি দুর্বল ভিত্তির ওপরে দাড়ানো। রপ্তানি পণ্য একমূখি নিবিরশ্রমের । মুলধনী পন্য-প্রযুক্তি থেকে শুরু করে ভোগ্যপন্য ও নিত্যদিনের খাবার প্রায় সবাই আমদানী করতে হয়। বৈদেশিক মুদ্রার প্রধান যোগান আছে রেমিটেন্স থেকে। বৈদেশিক কর্মসংস্থানের সিংহভাগই নিন্মস্তরের শ্রমনির্ভর। ফলে আমাদের অর্থনীতি খুবই ভঙ্গুর। যে কোন দেশের নিষেধাজ্ঞা বা অতিরিক্ত করারোপের মাধ্যমেই আমাদের অর্থনীতিতে ধ্বসিয়ে দিতে পারবে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ক্ষমতায় গেলে রপ্তানিকে বহুমূখি ও প্রযুক্তি কেন্দ্রিক করা হবে। মুলধনী পন্য আমদানীর বদলে নিজেরাই উৎপাদনের ব্যবস্থা নেয়া হবে। বৈদেশিক কর্মসংস্থানে দক্ষতাকে প্রধান্য দেয়া হবে।
আমাদের অর্থনীতির আরেকটি দিক হলো, অর্থনীতিতে সুশাসনের অভাব। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ক্ষমতায় গেলে ব্যাংকসহ আর্থিকখাতের দুর্নীতি বন্ধ করা হবে। টাকা পাচার পুরোপুরো রোধ করা হবে। অর্থনীতিতে কঠোর সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা হবে।
২. মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রন ও ক্রয়সক্ষমতা সংরক্ষণ
উন্নতর বাজার ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে উৎপাদন, সরবারাহ, আমদানী, সরকারী ক্রয়, স্টক ও খোলাবাজারে বিক্রিসহ সকল পর্যায়ে সঠিক তথ্য প্রাপ্তির নিশ্চয়তা বিধানে সমন্বিত ও হালনাগাদকৃত তথ্য সংগ্রহ ও তথ্য-অভিগম্যতার নিশ্চয়তা বিধান করা হবে।
বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহের কাজে প্রশাসনিক জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করা হবে, এবং এক্ষেত্রে সংসদীয় নজরদারীর ব্যবস্থা করা হবে।
মজুরী ও বেতন কমিশন গঠনের অন্তবর্তী সময়ে মূল্যস্ফীতির হারের নিরীখে বেতন ও মজুরীর সমন্বয় করা হবে।
৩. বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনা
ঋণের শর্ত ক্রমান্বয়ে কঠিন হওয়া ও ঋণের সুদ হারের বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনাকে গুরুত্ব দেয়া হবে এবং এ ক্ষেত্রে ঋণ আলোচনায় দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের উৎকর্ষতা বিধানে উদ্যোগ নেয়া হবে এবং বিশেষতঃ কঠিন শর্তে ঋণ গ্রহনের পূর্বশর্তসমূহ পুনর্বিবেচনা করা হবে।
বৈদেশিক ঋণ-ভিত্তিক উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাই কার্যক্রম স্বচ্ছতা ও জবাদিহিতার ভিত্তিতে করা হবে এবং এক্ষেত্রে অর্থায়ন, আর্থিক ও ফাইনান্সিয়াল রিটার্নের হিসাবসহ প্রকল্প সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য উন্মুক্ত করা হবে।
বাংলাদেশ যাতে কোন প্রকারেই ঋণ-ফাঁদে আটকে না পড়ে সেজন্য বৈদেশিক ঋণ গ্রহণ ও ঋণ পরিষেবার দায়ভার নিয়ে নিয়মিত পার্লামেন্টারী স্ট্যান্ডিং কমিটির কাছে প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হবে।।
৪. সুশাসিত আর্থিক খাত ব্যবস্থাপনা
ব্যাংকিং ও শেয়ার মার্কেট সংশ্লিষ্ট কর্মকান্ডে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের যে কোন ধরণের সংশ্লিষ্টতা জনসম্মুখে প্রকাশ করা হবে।
ব্যাংকিং খাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনভাবে কার্যক্রমের নিশ্চয়তা বিধান, ব্যাংকসমূহের বোর্ড গঠন ইত্যাদিসহ ইতোমধ্যে গৃহীত সংস্কার কর্মসূচী সমূহের বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা হবে।
পাচারকৃত অর্থ পুনরুদ্ধার, খেলাপী ঋণ আদায়সহ অন্তবর্তীকালীন সরকার গৃহীত বিভিন্ন পদ¶েপকে অব্যাহত রাখা হবে, এবং এ সংক্রান্ত তথ্য জনসম্মুখে উপস্থাপন করা হবে।
ব্যাংক কমিশন গঠন করে ব্যাংকিং খাতের সার্বিক ব্যবস্থাপনার উৎকর্ষতা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে এবং সুপারিশ বাস্তবায়নে কি কি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে তা জনসম্মুখে তুলে ধরা হবে।
৫ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে টেকসই উত্তরণ
এল.ডি.সি উত্তরণ বিলম্বের জন্য আবেদন করা হবে কিনা সে সম্বন্ধে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে এবং এ সিদ্ধান্ত নেয়া হলে তার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করা হবে।
লক্ষ নির্দিষ্ট ও সময়াবদ্ধ যেসব সুনির্দিষ্ট কর্মসূচী ‘স্মুথ ট্রানজিশান স্ট্রাটেজী’ তে উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলির বাস্তবায়নের জন্য ও বাস্তবায়ন অগ্রগতি পরিবীক্ষণের জন্য একটি কাঠামো দাঁড় করানো হবে।
বাজার বৈচিত্র্যকরণ, পণ্য বৈচিত্র্যকরণ, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং শ্রম ও পুঁজির দ¶তা বৃদ্ধির মাধ্যমে বাজার-সুবিধা বিলুপ্তি-পরবর্তী সময়ের জন্য প্রস্তুতি নেয়া হবে।
দ্বিপাক্ষিক ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগীতাকে গভীরতর করার লক্ষ্যে এ সম্বন্ধীয় আলোচনা পরিচালনার জন্য দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা হবে।
৬. বিনিয়োগের স্বর্গ হিসেবে বাংলাদেশকে গড়ে তোলা
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা, জ্বালানী সংকট, অবকাঠামোগত সমস্যা, সরকারের নীতি-জটিলতা ও দুর্নীতির কারণে দেশে বিনিয়োগে স্থবিরতা বিরাজ করছে। যার অভিঘাত বহুমাত্রিক হয়ে দেশের উন্নয়নকে ক্ষতিগ্রস্থ করছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেলে এই সমস্যাগুলো দুর করা হবে।
বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য কার্যকর কৌশল গ্রহণ করা হবে ও বিনিয়োগের প্রেক্ষিতে শ্রমবাজারের চাহিদা পূরণের জন্য যুবদের প্রয়োজনীয় দক্ষতা প্রদান করা হবে। বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রকল্প তথ্য, ই-সেবা ও চাহিদা অনুযায়ী ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম প্রতিষ্ঠা করা হবে।
একটি বিশেষায়িত বিনিয়োগকারী সুরক্ষা ও পর্যবেক্ষণ সেবা গড়ে তোলা হবে, যা বিদেশি বিনিয়োগকারীদেরকে নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন, প্রকল্প স্থানের নিশ্চিতকরণ এবং বিনিয়োগ-পরবর্তী সেবা প্রদানসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে সহায়তা করবে।
ম্যানুফ্যাকচারিং, প্রযুক্তি এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য জ্বালানিসহ গুরুত্বপূর্ণ খাতে বিদেশি সরাসরি বিনিয়োগ (ঋউও) আকর্ষণ করার লক্ষ্যে বিনিয়োগ-সংশ্লিষ্ট খাতের চাহিদা মাফিক প্রয়োজনীয় শ্রমশক্তি গড়ে তোলা হবে।
ইলেকট্রনিক্স ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতের চাহিদা পূরণের জন্য বিশেষায়িত ম্যানুফ্যাকচারিং পার্ক বা শিল্পাঞ্চল প্রতিষ্ঠা করা হবে এবং এসব খাতের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ শ্রমিক ও পেশাদারী ব্যবস্থাপক গড়ে তোলা হবে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানী এবং পারমানবিক জ্বালানীর দিকে বাংলাদেশকে নিয়ে যাওয়া হবে। সরকারের নীতি হবে ব্যবসায়ী বান্ধব। দুর্নীতিকে সমূলে উৎখাত করা হবে।
ব্যবসা পরিবেশের উৎকর্ষতা বৃদ্ধি ও বিনিয়োগ-ব্যবসা সংশ্লিষ্ট ব্যয় হ্রাসের লক্ষ্যে লক্ষ্য-নির্দিষ্ট টার্গেট নির্ধারণ করা হবে এবং এ সংক্রান্ত পদক্ষেপসমূহের অগ্রগতির পরীবিক্ষণের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহের জবাবদিহিতার ফ্রেমওয়ার্ক প্রস্তুত করা হবে।
বেসরকারী খাতে বিনিয়োগকে চাঙ্গা করার লক্ষ্যে বিনিয়োগের বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা দূর করা হবে, ওয়ান স্টপ সার্ভিস-এর কার্যকর বাস্তবায়ন করা হবে।
ব্যক্তিখাতের বিনিয়োগের মূল চালিকাশক্তি হবে দক্ষ ও শ্রমবাজারের চাহিদার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ জনশক্তি ও পেশাদারীত্ব ও সুশাসন-ভিত্তিক বিনিয়োগ বান্ধব উন্নয়ন প্রশাসন।
৭. জননিরাপত্তা ও আইনের শাসন
বাংলাদেশের প্রধান নাগরিক সমস্যা হলো জননিরাপত্তা। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজী, হত্যা, গুম, মব সন্ত্রাস, জবর-দখল, ছিনতাইসহ জননিরাপত্তার জন্য হুমকি সকল অপরাধের মূলউৎপাটন করা হবে। আইন-শৃংখলা বাহিনীকে শক্তিশালী ও নৈতিক শক্তিতে বলিয়ান করে তোলা হবে। নাগরিকের ব্যক্তিগত পরিসরে নজরদারী করার বদলে অপরাধীদের নজরদারীতে রাখার নৈতিক ও আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি করা হবে। যে কোন অপরাধের তথ্য আগেই জোগার করার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হবে। কোন অঘটন ঘটে গেলে প্রতিরোধে দ্রুততার সাথে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে;ইনশাআল্লাহ।
ব্যক্তি ও ও জনপরিসরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে এবং মানবাধিকার সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হবে।
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে এবং পেশাদার ও নিরপেক্ষ আইন প্রয়োগকারী সংস্থার স¶মতা ও জবাবদিহিতা জোরদার করা হবে।
ডিজিটাল অপরাধ প্রতিরোধ ও নাগরিক সুরক্ষার জন্য সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে, যাতে ডিজিটাল পরিসর নিরাপদ থাকে এবং অপরাধ দমন কার্যকর হয়।
পরিচয়, পেশা বা সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে সকল নাগরিকের জন্য আইন ও বিচার ব্যবস্থায় সমান ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করা হবে।
নারী নির্যাতন, ধর্ষণ ও শিশু নির্যাতনের ক্ষেত্রে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা হবে এবং বিচার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা ও হয়রানি বন্ধে কার্যকর সংস্কার করা হবে।
নারী, শিশু, সংখ্যালঘু, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষ এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর পূর্ণ সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে।
ইউনিয়ন ও নগর পর্যায়ে সড়ক ও জনপরিসরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। কার্যকর স্ট্রিট লাইটিং ও সিসিটিভি ব্যবস্থার রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে।
কিশোর গ্যাং সহিংসতা প্রতিরোধে প্রতিরোধমূলক সামাজিক ব্যবস্থা জোরদার করা হবে।
পার্বত্য, দুর্গম ও চরাঞ্চলে কমিউনিটি পুলিশিং জোরদার করা হবে এবং জরুরি স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা সেবার নিশ্চয়তা দেয়া হবে।
৮. নাগরিক সুবিধা সম্বলিত শহর ও গ্রাম
বাংলাদেশের শহরগুলো জনসংখ্যার অতিরিক্ত চাপে নুজ্য হয়ে পড়েছে অন্যদিকে গ্রামে কৃষিকাজে শ্রম সংকট দেখা দিয়েছে। কারণ হলো, চাকরি, ব্যবসা, চিকিৎসা, পড়াশোনার মতো জীবনের নিত্য প্রয়োজনীয় নাগরিক সেবাসমূহ শহরে কেন্দ্রিভূত করা হয়েছে। রাজধানী ঢাকা বসবাসের অযোগ্য শহরে পরিনত হয়েছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেলে নাগরিক সুবিধাকে দেশের সকল প্রান্তে সমহারে সমমানে বন্টন করবে।
নাগরিক পরিষেবাকে নির্ভরযোগ্য, মানসম্মত, সহজলভ্য ও জবাবদিহিমূলক করা হবে। পরিবহন ও যোগাযোগ, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ, পানি ও স্যানিটেশন, নগর ও গ্রামীণ অবকাঠামো এবং ডিজিটাল ও প্রশাসনিক সেবার মান উন্নয়নে প্রশাসনিক সংস্কার ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার প্রসার ঘটানো হবে, যাতে নাগরিকরা হয়রানি ছাড়া সেবা পান।
বিদ্যুৎ, পানি, ইন্টারনেট, পরিবহন ও নগর সেবার নিরবচ্ছিন্নতা নিশ্চিত করা হবে, বিশেষ করে প্রান্তিক ও দুর্গম এলাকায়।
সরকারি সেবা-জন্মনিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র ও সামাজিক সুরক্ষা-ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত কার্যকরভাবে ডিজিটালাইজেশন করা হবে।
প্রতিটি নাগরিক সেবার জন্য সেবা পাওয়ার মানদণ্ড, সময়সীমা ও অভিযোগ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া জনসম্মুখে প্রকাশ করা হবে।
দুর্গম, চর ও প্রান্তিক অঞ্চলে সরকারি সেবার ভৌত উপস্থিতি এবং মোবাইল ও ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ করা হবে।
দেশব্যাপী মাল্টি-মোডাল যোগাযোগসহ গণপরিবহন ব্যবস্থা সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন করা হবে, যাতে নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব চলাচল নিশ্চিত হয়।
নগর জনপরিসরে নারী, শিশু, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পিত অবকাঠামো ও সেবাব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।
৯. নৈতিকতায় সমৃদ্ধ কর্মমূখি বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা
বাংলাদেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা আশংকাজনকভাবে বেশি। শিক্ষার সাথে কর্মের কোন সংযোগ নাই। শিল্পায়নের সাথে শিক্ষার সংযোগ নাই। একই সাথে দুর্নীতির সাথে সম্পৃক্ততার বিচার করলে উচ্চশিক্ষিতদেরকেই বেশি সম্পৃক্ত দেখা যায়। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের আলোকে শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো হয় নাই। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেলে শিক্ষাকে শিল্পায়ন ও চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সাথে সংযুক্ত করা হবে যাতে করে বেকারত্ব কমানো যায়। এবং শিক্ষায় নৈতিকতা যুক্ত করা হবে।
মাদ্রাসা শিক্ষাকে তার স্বকীয় ধারায় বিকশিত করা হবে। ধর্মীয় পরিমণ্ডলে কওমী মাদ্রাসার শিক্ষাকে ভিত্তি বিবেচনা করা হবে। কওমী শিক্ষিতের সাধারণ ধারার শিক্ষার সাথে সমন্বয় করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে।
শিক্ষাখাতে বরাদ্দবৃদ্ধির মাধ্যমে শিক্ষা অবকাঠামো ও গবেষণায় জোড় দেয়া হবে।
শিক্ষাব্যবস্থা ও শ্রমবাজারের সংযোগ জোরদার করতে কারিগরি ও ডিজিটাল দ¶তা উন্নয়নের সুযোগ সম্প্রসারণ করতে হবে, যাতে প্রশিক্ষণ সরাসরি কর্মসংস্থানে রূপ নেয়।
প্রতিবন্ধী শিশুদের অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা নিশ্চিত করতে শিক্ষকদের বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। শিক্ষা র্থীদের ঝরে পড়া রোধে কার্যকরী বিশেষ কর্মসূচী প্রণয়ন করতে হবে।
জিরো নিরক্ষরতা, মৌলিক ধর্মীয়, সামাজিক ও কারিগরি জ্ঞানভিত্তিক সার্বজনীন গণ ও প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।
প্রতিজন শিশুর বিদ্যালয়ে গমন নিশ্চিত করা হবে। অভাবের কারণে কোন শিশু যাতে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত না হয় তা নিশ্চিত করা হবে।
একমূখি পূথিগত শিক্ষার বদলে কারিগরি শিক্ষা পদ্ধতি প্রবর্তন করা হবে।
শিক্ষার সকল স্তরের মতো প্রাথমিক স্তরেও ধর্মীয় শিক্ষাকে আবশ্যক করা হবে।
১০. সার্বজনীন কর্মসংস্থান
বাংলাদেশ পপুলেশন ডিভিডেন্ড (জনমিতিক লভ্যাংশ) এর কালে অবস্থান করছে।ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেলে এই জনমিতিক লভ্যাংশ ব্যবহার করার জন্য তারুণ্যকে উদ্ভাবক, উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা এবং অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করা হবে। দেশে নতুন বিনিয়োগ ও শিল্পায়নের পরিবেশ তৈরি করা হবে।
দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রম বাজার পরিস্থিতির আলোকে যুবদের জন্য শোভন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি
প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ও কর্মযোগ এর ত্রিমাত্রিক সংযোগে যুবসমাজের সম্ভাবনা ও প্রতিভা, উদ্ভাবন ও উদ্যোগকে কাজে লাগানো হবে।
অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের বিস্তৃতি, সীমিত সামাজিক সুরক্ষা এবং অনিশ্চিত কাজের পরিবেশ সমস্যাটিকে আরও জটিল করছে। শ্রমবাজারের দক্ষতার চাহিদা ক্রমাগত পরিবর্তিত ও বিবর্তিত হচ্ছে। যুবদের এ পরিবর্তনশীল চাহিদার প্রেক্ষাপটে যথোপযুক্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, দক্ষ ও সম্মানজনক শ্রমবাজার গড়ে তোলা হবে তরুণদের জন্য।
১৩. শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে শিক্ষা ব্যবস্থার সমন্বয় সাধন
শ্রমবাজারে কোন সুনির্দিষ্ট দক্ষতার চাহিদা বাড়ছে বা কমছে তা নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন করার জন্য শিল্প-প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করা হবে এবং দক্ষতার তালিকা হালনাগাদ করা হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিল্প-সম্পৃক্ত ও সময়োপযোগী পাঠ্যসূচি চালু করতে উৎসাহিত করা হবে। পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রতিষ্ঠা করে উপযুক্ত প্রণোদনার মাধ্যমে নিয়মিত মতবিনিময়, ইন্টার্নশিপ এবং চাকরির সুযোগ সৃষ্টি করা হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শিল্পের সঙ্গে সমন্বিত কর্মমুখী শিক্ষা (Co-op) মডেল চালু করা হবে।
কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে মূল্যায়ন ও উন্নয়ন ব্যবস্থা শক্তিশালী করা হবে, এবং প্রাক-যোগ্যতা না থাকার কারণে এ ধরণের শিক্ষায় ভর্তি হতে না পারা যুবকদের জন্য বিশেষ সহায়তা কর্মসূচি চালু করা হবে।
প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি ও আর্থিক সহায়তা বৃদ্ধি করা হবে।
বাস্তবমুখী কর্মপদ্ধতি গ্রহণ করে নিয়োগকর্তাদের শিক্ষানবিশ সুযোগ প্রদানে উৎসাহিত ও প্রণোদিত করে যুবদের শ্রমনিয়োজনের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে।
অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা
অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে ব্যবসা পরিচালনার জন্য ডিজিটাল ব্যবসা শনাক্তকরণ (ডিবিআই) সহ প্রয়োজনীয় শনাক্তকরণ নম্বর প্রদান করা হবে।
ক্রমান্বয়ে অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমবাজারের অংশগ্রহণকারীদের প্রাতিষ্ঠানিক খাতের সুবিধা প্রদান করার জন্য উদ্যোগ নিতে হবে।
নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি
স্বকর্মসংস্থানকে অগ্রাধিকার দেয়া হবে। নতুন উদ্যোক্তাদের অনুদান ও ইকুইটি সহায়তা প্রদানের জন্য জাতীয় উদ্যোক্তা তহবিল গঠনের যে ইতিবাচক উদ্যোগ ইতোমধ্যে গ্রহণ করা হয়েছে তাকে কার্যকর করা হবে।
সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে উদ্ভাবন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করে নতুন উদ্যোক্তাদের সৃজনশীলতা কাজে লাগানোর জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা হবে।
আইসিটি ও উচ্চ-প্রযুক্তি খাত উন্নয়ন
সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি খাতের মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়ে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি এবং উচ্চপ্রযুক্তি শিল্পে গবেষণা ও উন্নয়নে (জ্উ) বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা হবে।
ভবিষ্যতের বাজারের জন্য কর্মশক্তি গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রাথমিক শিক্ষায় কোডিং ও ডিজিটাল সাক্ষরতা অন্তর্ভুক্ত করে সুপরিকল্পিত কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে।
১২. উৎপাদন-সংরক্ষন ও বিপননকে প্রধান্য দিয়ে সমন্বিত কৃষি ব্যবস্থা
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেলে,
কৃষকের জীব, সেচ ও সার ব্যবস্থাপনায় রাষ্ট্র সরাসরি দায়িত্ব নেবে।
প্রাণী খাদ্য ব্যবস্থাপনায় বিকেন্দ্রীকরণ করা হবে।
আমদানী নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।
কৃষি উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনে গ্রামীণ অবকাঠামো, সেচ, কৃষিপণ্য সংরক্ষণাগার, বাজারব্যবস্থা, বিদ্যুৎ ও পরিবহন অবকাঠামো উন্নয়ন করা হবে।
আধুনিক পদ্ধতি ও প্রযুক্তি গ্রহণ এবং অভিযোজন
পরিবেশের ক্ষতি কমাতে জলবায়ু-বান্ধব কৃষি চর্চা (স্মার্ট কৃষি) সম্প্রসারণে সহায়তা প্রদান করা হবে।
কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণ ও আধুনিকীকরণ ত্বরান্বিত করতে ক্ষুদ্র আকারের প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎসাহ দেয়া হবে এবং কৃষকদের যথাযথ প্রণোদনার ব্যবস্থা করা হবে। স্থানীয়ভাবে ছোট কৃষিযন্ত্র উৎপাদন ও সংযোজনকারী ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের কর-সুবিধা, প্রযুক্তিগত সহায়তা ও প্রারম্ভিক পুঁজি প্রদান করে গ্রামীণ অর্থনীতি ও কৃষিভিত্তিক শিল্পের অগ্র-পশ্চাৎ সংযোগ শক্তিশালী করা হবে।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকদের জন্য ফসল কাটার পর ক্ষয়ক্ষতি হ্রাস করতে উন্নত সংরক্ষণ ও পরিবহণ সুবিধার ব্যবস্থা করা হবে।
বৈচিত্র্যমুখী ফসল চাষে ভর্তুকি ও আর্থিক সহায়তা, উচ্চ-মূল্যের অর্থকরী ফসলের বাণিজ্যিক চাষ এবং বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় স¶মতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা হবে।
কৃষি খাতে উৎপাদক এবং গ্রাহক ও ভোক্তার মধ্যে সরাসরি সংযোগ স্থাপনের জন্য ই২ঈ প্ল্যাটফর্ম এবং তথ্যপ্রযুক্তি স্থানীয় চাহিদা ও বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী ব্যবহার করা হবে।
অর্থায়ন ও প্রণোদনা
ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য সহজ ঋণ, আর্থিক সেবা ও বীমার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে, যাতে তারা আধুনিক উপকরণ, সরঞ্জাম এবং অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করতে পারে, এবং উৎপাদনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ঝুঁকি মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়।
ভ্যালু চেইনে অংশগ্রহণকারীদের (প্রাথমিক উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত) মধ্যে সমন্বয় শক্তিশালী করতে হবেএবং কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ সেবায় কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করতে হবে।
ক্ষুদ্র পিছিয়ে পড়া কৃষকদের জন্য করণীয়
ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য মানসম্পন্ন বীজ, সার, কীটনাশকসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ সুলভে পাওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।
ক্ষুদ্র কৃষকদের আবহাওয়া, বাজারদর, উত্তম কৃষিচর্চা, সরকারি প্রণোদনা ও বৈশ্বিক বাজার সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথা দ্রুত পৌঁছে দিতে একটি ডিজিটাল তথ্যসেবা গড়ে তোলার লক্ষ্যে এবং মূল্য-প্রবণতা ও বাজার-চাহিদার ভিত্তিতে উৎপাদন পরিকল্পনায় কৃষকদের সহায়তার জন্য শক্তিশালী ডিজিটাল তথ্য-ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তোলা হবে।
প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের আয়ের নিশ্চয়তা বিধানের লক্ষ্যে ন্যূনতম মূল্য নির্ধারণ, মূল্য-স্থিতিশীলতার জন্য কার্যকরী মজুত ব্যবস্থাপনা এবং উৎপাদন অংশীদারীত্বের ভিত্তিতে সরকারি ক্রয় নিশ্চিত করা হবে: কৃষক ও উৎপাদনকারী সংগঠন এবং সমবায় গঠনে উৎসাহ দিয়ে কৃষকদের বাজার-অংশগ্রহণ ও প্রতিযোগীতা সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হবে।
কৃষক ও ক্রেতাদের মধ্যে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করে মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভরতা কমানো হবে এবং শক্তিশালী বাজার সংযোগের মাধ্যমে কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা হবে।
জমির ইজারা নিরাপত্তা বিধানে ভূমি সংস্কার নীতি বাস্তবায়ন করা হবে।
পণ্যের বিশুদ্ধতা, আন্তর্জাতিক মান, ও প্রয়োজনীয় কারিগরি শর্ত পরিপালনে স¶মতা বৃদ্ধির জন্য কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে ও সচেতনতা নিশ্চিত করতে হবে।
সরকারি খাদ্য ক্রয় নীতি পর্যালোচনা করে তাকে কৃষক বান্ধব করা হবে এবং কৃষকের কাছে সরাসরিভাবে এর সুফল পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হবে। নানাবিধ কৃষিপণ্যকে প্রাতিষ্ঠানিক ক্রয়ের আওতায় আনা হবে।
নিত্য প্রয়োজনীয় কৃষি পণ্যের মূল্য স্থিতিশীল রাখার লক্ষ্যে একটি স্থায়ী কৃষি পণ্য-মূল্য কমিশন গঠন করা হবে।
ভূমিহীন ও প্রান্তিক কৃষকদের কৃষিঋণ পেতে জমি বন্ধকী ব্যবস্থার অবসান করা হবে।
জেলা পর্যায়ে খাস জমি বন্দোবস্ত কমিটির সদস্য হিসেবে ভূমিহীনের সংখ্যা ৩ জনে উন্নীত করা হবে।
খাস জমি বন্দোবস্ত নীতিমালা সংশোধন পূর্বক প্রত্যেক ভূমিহীন পরিবার প্রতি ২.০০ একর খাস জমি বন্দোবস্ত দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে (বিশ্বজনীন মানবাধিকার সনদ, অনুচ্ছেদ-১৭(১) অনুসারে)।
১৩. প্রবাসী কল্যাণ
বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি এখন প্রবাসী বাংলাদেশিগণ।
বৈদেশিক কর্মসংস্থানে দালাল প্রথা ভেঙ্গে দিয়ে সরাসরি জি টু জি বৈদেশিক কর্মসংস্থান ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।
প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও সন্মানজনক যাতায়াত ব্যবস্থা, ঢাকায় উন্নত ট্রানজিটকালীণ আবাসন, প্রবাসে দুতাবাসের অধিনে চিকিৎসা, আপদকালীণ আবাসনের ব্যবস্থা করা হবে।
দক্ষতা নির্ভর জনশক্তি রপ্তানি নিশ্চিত করতে উচ্চশিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষার সাথে সমন্বয় করা হবে।
প্রবাসী ও প্রত্যাবর্তনকারী অভিবাসীদের জন্য ইউনিয়ন পর্যায় থেকে সনদ, নিয়মিত খোঁজখবর, আইনি সহায়তা, স্বাস্থ্যসেবা ও ঋণ সুবিধা নিশ্চিত করা হবে।
অভিবাসন সংশ্লিষ্ট চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা
অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার সুর¶ায় আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হবে এবং প্রেরণকারী ও নিয়োগদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে কঠোর তদারকির আওতায় আনা হবে।
চাকরিদাতা দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার ভিত্তিতে অভিবাসী শ্রমিকদের জন্য ন্যায্য চুক্তি, আইনি সুরক্ষা এবং ন্যায়সংগত আচরণের নিশ্চয়তা বিধান করা হবে।
বিএমইটিকে প্রধান অভিবাসী দেশগুলোর চাহিদা অনুযায়ী সম্ভাব্য কর্মীদের জন্য লক্ষাভিত্তিক প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি পরিকল্পনা করা হবে এবং শ্রমবাজার বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় নিয়মিত জরিপ চালিয়ে বিদেশে চাকরির বাজারের অবস্থা ও চাহিদা নির্ধারণ করা হবে।
অভিবাসী শ্রমিকদের কল্যাণ নিশ্চিত করতে শ্রমিক কল্যাণ তহবিল পুনর্গঠন পূর্বক সমাজকল্যাণ তহবিল প্রতিষ্ঠা করা হবে।
প্রধান অভিবাসী শ্রমিক অঞ্চলগুলোতে ‘অভিবাসী শ্রমিক তথ্য ও সহায়তা কেন্দ্র’ স্থাপন করা হবে এবং বিদেশে কাজ শেষে দেশে প্রত্যাবর্তনের পরবর্তীতে শ্রমিকদের তথ্য ভাণ্ডার গড়ে তোলা হবে এবং তাদের পুনঃপ্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ নিশ্চিত করা হবে।
১৪. সার্বজনীন উন্নত ও সাশ্রয়ী চিকিৎসা ব্যবস্থা
আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থার ভঙ্গুরতা প্রকট হয়েছিলো করোনার সময়। পরেও অবস্থার কোন পরিবর্তন হয় নাই। পুরো চিকিৎসা ব্যবস্থা ঢাকা কেন্দ্রিক। বেসরকারী চিকিৎসা অন্যায্য ব্যবসায় নির্মম নীতিতে কলুষিত।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেলে,
দেশের সকল সরকারী হাসপাতালকে বিশ্বমানের হাসপাতালে পরিনত করা হবে।
ইউনিয়ন ও থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে স্বয়ংসম্পুর্ণ করে তোলা হবে।
বেসরকারী চিকিৎসাখাতের অনিয়ম বন্ধে প্রচলিত আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা হবে প্রয়োজনে আইনী সংশোধন করা হবে।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসার জন্য জেলায় জেলায় সক্ষমতা তৈরি করা হবে।
বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার মেডিকেল হাবে পরিনত করা হবে।
প্রতিটি নাগরিকের জন্য সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচি বা স্বাস্থ্য কার্ড ব্যবস্থা বিবেচনায় নেয়া হবে।
দেশের অতিদরিদ্র ২০ শতাংশ মানুষকে সরকারি, বেসরকারি এবং বাক্তিখাতের হাসপাতালগুলোতে সকল ধরনের স্বাস্থ্যসেবা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে প্রদানের ব্যবস্থা করা হবে।
মনস্তাত্ত্বিক ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগ বাড়ানো হবে এবং এ খাতে প্রশিক্ষিত জনবল গড়ে তোলা হবে।
সাশ্রয়ী ও মানসম্মত ওষুধ নিশ্চিতকরণ
সকল মানুষের জন্য, বিশেষ করে অগ্রাধিকারমূলকভাবে দরিদ্র ও অসুবিধাগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর জন্য, সাশ্রয়ী মূল্যে মানসম্মত ওষুধ প্রাপ্তি নিশ্চিত করা হবে।
প্রতিটি নাগরিকের মানসম্মত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে। কমপ¶ে ৭৫% প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা বিনামূল্যে প্রদান করা হবে।
সকল ধরণের ঔষুধের মূল্যের ওপর মূল্য-নিয়ন্ত্রণ নীতিমালা কঠোরভাবে প্রয়োগ ও নিয়মিত পরিবীক্ষণ করা হবে।
আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে ওষুধের মূল্য কমানো হবে।
অসুবিধাগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবায় বিশেষ উদ্যোগ
প্রান্তিক ও দুর্গম অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে টেলিমেডিসিন, ভ্রাম্যমাণ/স্যাটেলাইট ক্লিনিক এবং ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্সের মতো উদ্ভাবনী উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
মাতৃস্বাস্থ্য, কিশোরী স্বাস্থ্য ও পুষ্টি কর্মসূচির সম্প্রসারণ ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত করার ব্যবস্থা করা হবে।
সরকারি সেবা ব্যবস্থায় দক্ষতা ও কার্যকারিতা বৃদ্ধি
শূন্যপদ পূরণ, ওষুধ ও সরঞ্জাম নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে সরকারি হাসপাতালগুলোকে সেবাদানের জন্য সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত করা হবে।
স্বাস্থ্যকর্মীদের আচরণ নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন করা হবে। সেবাগ্রহণকারীদের মতামতের ওপর নিয়মিত জরিপ পরিচালনা করা হবে।
গ্রাম ও শহর উভয় এলাকায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব দূর করে সমন্বিত সেবা প্রাপ্তি নিশ্চিত করা হবে।
১৫. সিনিয়র সিটিজেন ম্যানেজমেন্ট
বয়স্ক নাগরিকগণ সমাজের সম্পদ। তাদের প্রতি সমাজ ও সভ্যতার দায় আছে। বর্তমানে বয়স্ক নাগরিকদের বোঝা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সমাজ থেকে সেই অসুস্থ্য মানসিকতা দুর করা হবে।
বয়স্ক নাগরিকদের জন্য আবাসন, বিনোদন ও মানসিক স্বস্তির জন্য রাষ্ট্র নীতি প্রনয়ন করবে এবং তা বাস্তবায়ন করবে।
প্রবীণ নাগরিকদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া হবে।
প্রবীণ নাগরিকদের প্রতি বয়সভিত্তিক বৈষম্য দূর করে রাষ্ট্রীয় সেবা, বিচার ও সামাজিক পরিসরে মর্যাদা ও সমান অধিকার নিশ্চিত করা হবে।
১৬. আঞ্চলিক উন্নয়ন ভারসাম্য
টেকসই ও ন্যায়ভিত্তিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে আঞ্চলিক বৈচিত্র্য, ভৌগোলিক বাস্তবতা ও কাঠামোগত বৈষম্যকে স্বীকৃতি দিয়ে লক্ষ্যভিত্তিক আঞ্চলিক উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে। একক উন্নয়ন মডেলের পরিবর্তে অঞ্চলভিত্তিক সম্পদ, ঝুঁকি, জীবিকাগত নির্ভরতা ও পরিবেশগত ভঙ্গুরতা বিবেচনায় নিয়ে সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা হবে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল
পাহাড়ি জনগোষ্ঠির স্বকীয়তা রক্ষা করে জননিরাপত্তা, উন্নয়ন, পর্যটন ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণে ইনক্লুসিভ পার্বত্য চট্রগ্রাম নীতি গ্রহণ করা হবে।
পাহাড়ি জনগোষ্টির ভাষা, সংস্কৃতি রক্ষায় আন্তরিক প্রচেষ্টা চালানো হবে। এই সংক্রান্ত বিদ্যমান আইন ও পদ্ধতিকে নির্মোহভাবে বিশ্লেষণ করে গ্রহণ-বর্জন ও বর্ধিত করা হবে।
পাহাড়কে পর্যটন ও অর্থনীতির কেন্দ্রভূমিতে রুপান্তর করা হবে। পরিবেশের সাথে সমন্বয় করে নাগরিক সেবা যাতে প্রতিজন পাহাড়ির কাছে পৌছে তার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি ও ভূমি কমিশন কার্যকর করা হবে।
স্থানীয় সরকার ও ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষমতায়ন করা হবে।
অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করার উদ্যোগ নেয়া হবে।
রংপুর অঞ্চল
খরা ও তিস্তা-নির্ভর বাস্তবতা বিবেচনায় কর্মসংস্থানমুখী উন্নয়ন পরিকল্পনা নেয়া হবে।
নদী ও পানি ব্যবস্থাপনা জোরদার করতে দ্বিতীয় গঙ্গা ব্যারাজসহ সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলো যথাযথভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বরেন্দ্র অঞ্চল
পৃষ্ঠস্থ পানি সংরক্ষণ ও পানিনির্ভর শিল্প উন্নয়নে বিশেষ কর্মসূচি নেয়া হবে।
রাজশাহী সিল্কসহ ঐতিহ্যবাহী শিল্প পুনরুজ্জীবন করা হবে।
খুলনা-বরিশাল অঞ্চল
লবণাক্ততা ও দুর্যোগ-প্রবণতা বিবেচনায় পৃথক উন্নয়ন কৌশল নেয়া হবে।
ভোলার গ্যাস ব্যবহার করে শিল্পায়ন ও নৌ-পর্যটন সম্প্রসারণ করা হবে।
নদীভাঙন ও হাওর অঞ্চল
পুনর্বাসন, বিকল্প জীবিকা ও বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক কার্যক্রম গড়ে তোলা হবে।
১৭. “বাংলাদেশ হবে বিশ্ব পর্যটনের রাজধানী” প্রতিপাদ্যে পর্যটন খাতের বিকাশ ঘটানো হবে। পরিবহন, আবাসন, খাবার ও নিরাপত্তাই যে কোন পর্যটনে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের পর্যটনখাতে এই প্রত্যেকটি বিষয় দেশের গড় হিসাবের চেয়ে বেশি ব্যয়বহুল। ফলে বাংলাদেশে বিদেশি পর্যটক আসে না বললেই চলে। সরকারী-বেসরকারী যৌথ বিনিয়োগে প্রতিটি ক্ষেত্রে পর্যটক বান্ধব করে তোলা হবে।
১৮. নিরাপদ ও বহুমাত্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
স্বাধীনতার সময়ে দেশে ২৪ হাজার কিলোমিটার জলপথ ছিলো। সেটা উদ্ধার করা হবে।
দেশের প্রতিটি জেলার সাথে রেল সংযোগ স্থাপন করা হবে। রেলখাতকে উন্নত ও লাভজনক জায়গায় নিয়ে আসা হবে।
রেল ও নৌপথকে পণ্য পরিবহনের প্রধান মাধ্যম হিসেবে গড়ে তোলা হবে।
সড়ক পথের ওপরে চাপ কমানোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।
সড়ক পরিবহনখাতে বেসরকারী উদ্যোগকে নিয়ন্ত্রণে এসে যাত্রীবান্ধব করা হবে।
১৯. সবার জন্য সাশ্রয়ী ও দূষণমুক্ত জ্বালানির নিশ্চয়তা
বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন ও প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হলে এবং জনগণের কল্যান বিধানে সবার জন্য সাশ্রয়ী ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানির প্রাপ্যতা যে কোন বিচারেই অগ্রাধিকার প্রাপ্তির দাবীদার। অথচ জ্বালানি ঘাটতি, গ্যাসনির্ভরতা ও দুর্বল নীতি-ব্যবস্থাপনার কারণে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা মীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকির মুখে আছে। সাম্প্রতিক বৈশ্বিক মূল্যবৃদ্ধি, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং কোভিড-পরবর্তী চাপ এই সংকটকে আরও তীব্র করেছে।
অভ্যন্তরীণ প্রাকৃতিক গ্যাসের উন্নয়নে অগ্রাধিকার প্রদান
জরুরি ভিত্তিতে নতুন গ্যাস অনুসন্ধানে উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে এবং দেশের ক্রমহ্রাসমান প্রাকৃতিক গ্যাস মজুত পুনরুদ্ধারে গুরুত্ব দেয়া হবে। বাপেক্সের মানবসম্পদ ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা শক্তিশালীকরণে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ করা হবে। মধ্য-মেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করে বিদেশি ব্যয়বহুল চুক্তি যতটা সম্ভব এড়িয়ে অর্জিত দেশীয় সক্ষমতার ওপর জোর দেয়া হবে।
দেশের জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ ও উন্নয়নের জন্য সুনির্দিষ্ট তহবিল প্রতিষ্ঠার জন্য একটি যুক্তিসঙ্গত কাঠামো প্রস্তুত করা হবে।
জ্বালানি খাতের চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় দক্ষ ও প্রশিক্ষিত মানবসম্পদ গড়ে তুলতে হবে।
বিতরণ ও সঞ্চালন পর্যায়ে সিস্টেম লস হ্রাসের জন্য পুরোনো অবকাঠামো প্রতিস্থাপন ও সেগুলির প্রযুক্তিগত হালনাগাদ নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি অর্থায়নের লক্ষ্যে বকেয়া বিল আদায়ে কার্যকর ও উদ্যমী কার্যক্রম হাতে নেয়া হবে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি সরঞ্জামের স্থানীয় উৎপাদনের লক্ষ্যে সরকারকে উপযুক্ত নীতি, প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থন এবং আর্থিক ও কর প্রণোদনার মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করা হবে।
সরকারি অফিস, বাণিজ্যিক ভবন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিল্প অবকাঠামো এবং ধর্মীয় উপাসনালয়ে সৌরবিদ্যুৎ প্যানেলের ব্যবহার বৃদ্ধি করতে উৎসাহিত করা হবে। জাতীয় গ্রিডে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সংযোগের সুবিধা নেয়ার ক্ষেত্রে ব্যক্তিখাতকে উৎসাহিত করা হবে।
গ্রামীণ ও শহুরে এলাকায় বায়োম্যাস প্রযুক্তি উন্নয়নের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
সৌরশক্তি থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ কার্যকরভাবে বিতরণের জন্য স্মার্ট গ্রিড এবং স্মার্ট মিটারিং প্রযুক্তি প্রবর্তন করা হবে।
প্রতিবেশী দেশসমূহের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক বিদ্যুৎ বাণিজ্যের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হবে।
আর্থিক চাপ হ্রাস এবং জ্বালানি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা
কুইক রেন্টাল (কিউআর) ও ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ধাপে ধাপে বন্ধ করার জন্য একটি সময়সীমাবদ্ধ ‘প্রস্থান পরিকল্পনা (বীরঃ ঢ়ষধহ) প্রস্তুত করা হবে। আগামী দুই বছরের মধ্যে এই কেন্দ্রগুলো বন্ধ করার প্রক্রিয়া শুরু করা হবে এবং বিদ্যমান চুক্তি ও লাইসেন্সের সঙ্গে সমন্বয় করে আর্থিক বোঝা হ্রাসের ব্যবস্থা করা হবে।
জ্বালানি খাতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হবে, যাতে সংশ্লিষ্ট সকল গুরুত্বপূর্ণ গোষ্ঠী এতে অংশগ্রহণ করতে পারে।
জাতীয় স্বার্থের চাহিদা পূরণে সুপরিকল্পিত ও স্বচ্ছ নীতি প্রণয়ন
দেশে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সুরক্ষা এবং জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা, জাতীয় জ্বালানি মাস্টারপ্লান, চাহিদার প্রাক্কলন নীতিমালা ও আইন প্রণয়ন উদ্যোগগুলো পর্যালোচনা, সংশোধন ও হালনাগাদ করা হবে।
এলপিজির দাম নির্ধারিত দামে বিক্রিতে মাঠ পর্যায়ে জেলা প্রশাসন, ভোক্তা অধিদপ্তর ও আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষের কার্যকর সমন্বয় জোরদারে জ্বালানি মন্ত্রণালয় থেকে উদ্যোগ নেয়া হবে।
এলপিজির আমদানিকারক ও এলপিজির পরিবেশকদের মজুদ, সরবরাহ ও খুচরা বিক্রয় কর্মকাণ্ডের তদারকি জোরদার করতে হবে।
২০. পরিবেশ, জলবায়ু ও বন রক্ষায় দেশিয় বাস্তবতা ও আন্তর্জাতিক প্রটোকল অনুসরন করা
ইসলাম প্রকৃতির সাথে প্রতিপালনের সম্পর্ক গঠনের নির্দেশ দেয়। ফলে প্রাণ-প্রকৃতির ক্ষতি হয় এমন কোন কাজ ইসলামী আন্দোলন করবে না। একই সাথে জলবায়ু পরিস্থিতির অভিঘাত সহনীয় করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
২১. গৃহায়ণ ও গণপূর্ত
সকল নাগরিকের আবাসন নিশ্চিত করতে সরকারী আবাসন প্রকল্প শুরু করা হবে।
সকল সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারিদের সরকারী আবাসনের আওতায় আনা হবে।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে পুরোনো ও ভঙ্গুর অবকাঠামো নতুন করে গড়ে তোলা হবে।
২২. তথ্য ও সম্প্রচার
পেশাদারিত্ব ও সমাজের প্রতি দায়বোধের জায়গা থেকে সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হবে।
গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবনাকে আমলে নিয়ে সাংবাদিকদের বেতন-ভাতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সকল কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে, যাতে কোনো সংবাদমাধ্যম প্রশাসনিক আদেশ, রাজনৈতিক চাপ বা ¶মতার অপব্যবহারের মাধ্যমে বন্ধ বা নিয়ন্ত্রিত না হয়।
সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে পেশাগত মানদণ্ড, স্বীকৃতি ও জবাবদিহিতার নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা হবে, যাতে ভুয়া পরিচয়, অপেশাদার আচরণ ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তথ্যপ্রচারের সুযোগ কমে।
ডিজিটাল পরিসরে বিভ্রান্তিমূলক ও বিদ্বেষমূলক তথ্য প্রচারের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে, যাতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সাইবার বুলিংয়ের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য বজায় থাকে।
২৩. শ্রম ও কর্মসংস্থান
দেশের সকল শ্রমকে আনুষ্ঠানিক শ্রম বিবেচনা করে আইনের পরিধিভুক্ত করা হবে।
মূল্যস্ফীতি ও মানসম্মত জীবনমান রক্ষাকে প্রধান্য দিয়ে ন্যূনতম মজুরি প্রতি বছর নির্ধারণ করা হবে।
কর্মপরিবেশ ও শ্রমিকের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কোন ধরণের ছাড় দেয়া হবে না।
বিদ্যমান শ্রম আইন পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সংশোধন করে পূর্ণ বাস্তবায়ন করা হবে।
পরিবারবান্ধব শ্রমনীতি কার্যকর করা হবে। বিশেষ করে শ্রমিক অধ্যুষিত অঞ্চলে শিশুদের জন্য দিবা-যত্ন কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে যাতে কর্মজীবি মহিলারা শ্রমবাজারে নির্বিঘ্নে অংশগ্রহণ করতে পারেন।
যুব নারীদের বৃত্তি, আবাসিক সুবিধা ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
কর্মক্ষেত্রে নারীদের বিরুদ্ধে বৈষম্য ও হয়রানি প্রতিরোধে আইনের সক্রিয় প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন, হিজড়া ও অন্যান্য সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের জন্য বিশেষায়িত ও লক্ষ্য নির্দিষ্ট শ্রম-নিয়োজন কর্মসূচী বাস্তবায়ন করতে হবে।
প্রতি উপজেলা এলাকায় নারীদের জন্য সেলাই, হস্তশিল্প ও আইটি বিষয়ক বিনামূল্যে কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করা হবে।
শ্রম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
শ্রমিক অধিকার লঙ্ঘন ও বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য একটি স্বাধীন শ্রম ন্যায়পালের কার্যালয় স্থাপন করা হবে।
কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের (ডিআইএফই)-এর সক্ষমতা বৃদ্ধি করে এটির কার্যকর দায়িত্ব পালন নিশ্চিত করা হবে।
শ্রমিক সংগঠন স্থাপনের অধিকার রক্ষা এবং শ্রম বিরোধের দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করতে শ্রম আদালতের সক্ষমতা বাড়ানো হবে। দর কষাকষির চুক্তি স্বাক্ষরের সময়ে শ্রমিক ইউনিয়নের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে। পরিবর্তীত শ্রম আইনের বাস্তবায়নে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
রোহিঙ্গা শিশুদের জন্য কর্মমুখী ও বিভিন্ন পরিবেশে ব্যবহারযোগ্য কারিগরি দক্ষতা (পোর্টেবল স্কিলস) গড়ে তুলতে সহায়তা দেয়া হবে।
২৪. স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের শক্তিশালীকরণ এবং ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ
স্থানীয় সরকারকে আইন-বাজেট ও কর্মপরিকল্পনায় স্বাধীন, শক্তিশালী করা হবে।
তাদের সক্ষমতা ব্যবহার করে নতুন ও উদ্ভাবনী বিনিয়োগ কৌশল প্রস্তুতি ও প্রয়োগে উৎসাহ প্রদান করা হবে।
ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও স্থানীয় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সংসদ সদস্যদের ভূমিকা নীতিনির্ধারণ ও আইন প্রণয়ণে সীমাবদ্ধ রেখে উন্নয়ন বাস্তবায়নের দায়িত্ব নির্বাচিত স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের হাতে ন্যাস্ত করা হবে।
স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা হবে।
নগর এলাকায় গণপরিসেবা প্রদানকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব ও কর্তব্যের মধ্যে অস্পষ্টতা দূর করতে প্রয়োজন অনুযায়ী আইন ও নীতিমালা হালনাগাদ, সংশোধন এবং প্রয়োজনে নতুন বিধান প্রণয়ন করা হবে।
স্থানীয় সরকারের আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা বৃদ্ধি করে পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
পাইকারি ও খুচরা বাজারের দামের মধ্যে অযৌক্তিক ব্যবধান কমাতে কার্যকর প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ ও প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারী জোরদার করতে হবে।
২৫. আধুনিক, টেকসই ও স্বাস্থ্যসম্মত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা
সকল এলাকায় আবাসিক, বাণিজ্যিক ও শিল্প এলাকায় সুষ্ঠু পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে এবং বর্জ্য পানি পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ ও পুনঃব্যবহারের ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।
কঠিন ও তরল বর্জ্যের পৃথক সংগ্রহ, পরিবহণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা উন্নত করা হবে এবং নগর এলাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।
২৬. জলবায়ু পরিবর্তন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ
বাংলাদেশ দুর্যোগ প্রবণ দেশ। দুর্যোগে উদ্ধারের চেয়ে দুর্যোগ সম্পর্কে মানুষকে আগে থেকে সতর্ক করার ভেতরেই সফলতা বেশি। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেলে,
দুর্যোগ সম্পর্কে আগাম তথ্য সংগ্রহ করার সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হবে।
অগ্নিকাণ্ডের মতো দুর্ঘটনা রোধে বিদ্যমান ফায়ার সার্ভিস আইন মানা বাধ্যতামূলক করা হবে।
ভূমিকম্প একটি ভয়ানক দুর্যোগ হিসেবে সতর্কবার্তা দিচ্ছে। সেজন্য ঢাকাসহ পুরো দেশের বিশেষ করে শহর অঞ্চলের অবকাঠামো যাছাই করা হবে এবং দুর্বল অবকাঠামো পুনর্নিমাণ করার ব্যবস্থা করা হবে। একই সাথে ভূমিকম্প পরবর্তী উদ্ধারে সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি মোকাবিলায় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও অভিযোজনভিত্তিক পরিকল্পনার মাধ্যমে পরিবেশ সংরক্ষণ, টেকসই উন্নয়ন এবং প্রাকৃতিক সম্পদের দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা হবে।
কৃষি, পানি, বন ও নগর ব্যবস্থাপনায় জলবায়ু-সংবেদনশীল নীতি গ্রহণ করা হবে, যাতে জীবন, জীবিকা ও পরিবেশ একসঙ্গে সুরক্ষিত থাকে। কৃষিনির্ভরতা থেকে বহুমাত্রিক জীবিকার দিকে রূপান্তরকে আঞ্চলিক উন্নয়ন কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
বরেন্দ্র ও উত্তরাঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পৃষ্ঠস্থ পানি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা জোরদার করা হবে।
তিস্তা ও অন্যান্য আন্তঃদেশীয় নদীর পানি ব্যবস্থাপনায় কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ নেয়া হবে।
সবুজ নগরায়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার ও জলাধার সংরক্ষণে অগ্রাধিকার দেয়া হবে। নির্বিচারে বৃক্ষনিধন বন্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ ও ব্যাপক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি নেয়া হবে।
পদ্মা নদীসহ প্রধান নদ-নদীর জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে।
২৭. পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা (Water Resource Management)
দখলকৃত সকল নদী উদ্ধার করা হবে। আন্তর্জাতিক সকল নদীর পানি বন্টনে ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে যা যা করার তাই করা হবে।
দূষণের শিকার নদী,খাল ও জলাশয়কে দূষণমুক্ত করা হবে।
ভূগর্ভস্থ পানির স্তর রক্ষায় উদ্যোগ নেয়া হবে।
সুপেয় পানির সরবরাহ ব্যবস্থা সম্প্রসারণে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে, এবং নগর এলাকায় পাইপলাইনের মাধ্যমে নিরাপদ পানি সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নত করা হবে।
বৃহৎ বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবনে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা (Rainwater Harvesting) ও পুনঃব্যবহারযোগ্য পানি সরবরাহ ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা হবে।
২৮. জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও মুক্তিযুদ্ধ
মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবারের স্বার্থ রক্ষায় বিদ্যমান আইনকে পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সংশোধন করে মুক্তিযুদ্ধকে স্বমহিমায় উদ্ভাসিত করে রাখা হবে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান, শাপলা চত্তরের আন্দোলনসহ দেশের রাজনৈতিক পথচলার সকল আন্দোলনের স্মৃতিকে জাগ্রত রাখতে কাজ করবে এই মন্ত্রণালয়।
সমাপ্ত









































