নিজের মেয়ে নেই, তবু ১৫ মেয়ের ‘বাবা’ সাজ্জাদ পারভেজ

নভেম্বর ০৩ ২০২৬, ১৪:৫৯

আরিফ হোসেন ॥ নিজের ঘরে মেয়ে নেই, আছে কেবল এক ছেলে। অথচ ১৫ মেয়ের জীবনে তিনি হয়ে উঠেছেন বাবার ছায়া। কারও বিয়েতে উকিল বাবা, কারও বিপদে নির্ভরতার ঠিকানা, কারও সন্তান জন্মের সময় রক্তদাতা, আবার কারও সন্তানের কাছে স্নেহময় নানা। রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও মমতা, দায়িত্ব আর ভালোবাসার বন্ধনে গড়ে তুলেছেন এক অনন্য পরিবার। তিনি সাজ্জাদ পারভেজ। যার কাছে বাবা হওয়া শুধু জন্মের সম্পর্ক নয়, বরং দায়িত্ব পালনের এক মানবিক অঙ্গীকার।

২০০৮ থেকে ২০২৪ সাল—দীর্ঘ ১৬ বছরে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত, আশ্রয়হীন ও মূলধারার বাইরে থাকা ১৫ মেয়ের বিয়ের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন সাজ্জাদ পারভেজ। বিয়ের আসরে প্রতিটি মেয়ের পাশে দাঁড়িয়েছেন উকিল বাবা হিসেবে। তবে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলেও শেষ হয়নি তাঁর দায়িত্ব। বরং বিয়ের পর শুরু হয়েছে এক নতুন অধ্যায়। মেয়েদের সংসারের খোঁজখবর, স্বামী-সন্তানের ভালো-মন্দ, অসুস্থতা কিংবা বিপদ—সবকিছুতেই তিনি থেকেছেন আপনজনের মতো।

সাজ্জাদ পারভেজ দীর্ঘদিন সামাজিক প্রতিবন্ধী মেয়েদের প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে, বর্তমানে সুরক্ষা বঞ্চিত মেয়েদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত প্রতিষ্ঠানে ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি আঞ্চলিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের অধ্যক্ষ। দায়িত্ব পালনকালে আশ্রয়হীন ও সুবিধাবঞ্চিত মেয়েদের সঙ্গে গড়ে ওঠে তাঁর গভীর আত্মিক সম্পর্ক। সেই সম্পর্কই একসময় রূপ নেয় পিতৃত্বের বন্ধনে।

ইয়াসমিন ও খালেকের বিয়ের দায়িত্ব নেওয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হয় তাঁর এই মানবিক যাত্রা। এরপর একে একে তানজিলা, রহিমা, বৃষ্টি, তামান্না, লামিয়াসহ ১৫ মেয়ের বিয়ের আয়োজন করেন তিনি। বিয়ের অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসকসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকলেও মেয়েদের কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ছিল একজন বাবার মতো মানুষের উপস্থিতি।

বিয়ের পরও শেষ হয়নি বাবার দায়িত্ব
সাধারণত বিয়ের আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়েই অনেক সম্পর্কের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়। কিন্তু সাজ্জাদ পারভেজের ক্ষেত্রে ঘটেছে ব্যতিক্রম। মেয়েদের সংসারে কোনো সমস্যা হচ্ছে কি না, তারা স্বামী-সন্তান নিয়ে ভালো আছেন কি না—নিয়মিত খোঁজ রেখেছেন। প্রয়োজনের মুহূর্তে মেয়েরাও নির্দ্বিধায় ফোন করেছেন তাঁদের উকিল বাবাকে।

সম্প্রতি তানজিলার সন্তান জন্মের সময় জরুরি ভিত্তিতে রক্তের প্রয়োজন দেখা দেয়। রাতের খবর পেয়ে এক মুহূর্ত দেরি না করে ছুটে যান সাজ্জাদ পারভেজ। ব্যবস্থা করেন প্রয়োজনীয় রক্তের। আবার লামিয়ার সন্তান জন্মের খবর পেয়ে দেখতে যান তাঁকে। মেয়েদের সন্তানদেরও নিজের নাতি-নাতনির মতো স্নেহ করেন তিনি।

শুধু তাই নয়, মেয়েদের সংসার যাতে স্বচ্ছলভাবে এগিয়ে চলে, সে জন্য তাঁদের স্বামীদের স্বাবলম্বী হওয়ার ক্ষেত্রেও সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছেন। তাঁর প্রত্যাশা, একসময় যেসব মেয়ের জীবনে ছিল অনিশ্চয়তা, তারা যেন আজ নিজেদের পরিবার নিয়ে সম্মান ও স্বাচ্ছন্দ্যে বাঁচতে পারেন।

ডিভোর্সের পর অসুস্থ মেয়ের পাশে বাবা
সাজ্জাদ পারভেজের মানবিকতার আরেকটি দৃষ্টান্ত রিয়া। প্রায় ১২ বছর আগে বিয়ে হয়েছিল তাঁর। পরবর্তীতে স্বামীর সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। জীবনের কঠিন সময়ে অসুস্থ হয়ে পড়লে আশ্রয় ও সহযোগিতার জন্য ছুটে আসেন সাজ্জাদ পারভেজের কাছে।

সেই অসহায় মেয়েটির পাশে দাঁড়িয়ে চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করেন তিনি। শুধু চিকিৎসার ব্যবস্থা করেই দায়িত্ব শেষ করেননি; দিয়েছেন এক মাসের বাজারও। রিয়ার মতো অসহায় মেয়েদের কাছে সাজ্জাদ পারভেজ তাই কেবল একজন উকিল বাবা নন, বরং দুঃসময়ে মাথার ওপর ছায়া হয়ে থাকা একজন আপন মানুষ।

‘ওরা আমার সন্তান, বিপদে নিজের মেয়ের মতোই মনে হয়’
সাজ্জাদ পারভেজের এই ভালোবাসার কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তানজিলা। তিনি বলেন, “বিয়ের পরও বাবা আমাদের ছেড়ে দেননি। আমরা কোনো বিপদে পড়লে প্রথমেই যার কথা মনে হয়, তিনি হলেন বাবা। আমার সন্তান হওয়ার সময় রাতে রক্তের প্রয়োজন হয়েছিল। খবর পেয়েই তিনি ছুটে আসেন এবং রক্তের ব্যবস্থা করেন। আমার সন্তানকে তিনি নিজের নাতির মতোই দেখেন। আমাদের কাছে তিনি শুধু উকিল বাবা নন, সত্যিকারের বাবা।”

অন্যদিকে নিজের জীবনের এই ব্যতিক্রমী সম্পর্কের কথা বলতে গিয়ে আবেগ ধরে রাখতে পারেন না সাজ্জাদ পারভেজও। মেয়েদের কথা বলতে বলতে একপর্যায়ে কেঁদে ফেলেন তিনি।

তিনি বলেন, “আমার নিজের একটি মাত্র ছেলে। মেয়ে না থাকার যে অভাব, সেটা এই মেয়েদের মধ্যে পূরণ হয়েছে। ওদের বিয়ের সময় উকিল বাবা হয়েছিলাম। কিন্তু এখন আর শুধু উকিল বাবা মনে করি না। ওরা আমার সন্তান। ওদের কোনো বিপদ হলে নিজের সন্তানের বিপদ মনে হয়।”

কিছুক্ষণ থেমে চোখ মুছে আবার বলেন, “ওদের কারও বিপদের কথা শুনলে এখনও মনে হয়, আমার নিজের মেয়ের বিপদ হয়েছে। তাই যতটুকু পারি পাশে থাকার চেষ্টা করি। মেয়েদের সন্তানদেরও নিজের নাতি-নাতনির মতো দেখি।”

রক্তের সম্পর্ক নয়, মমতাই গড়েছে পরিবার
একসময় যাদের পরিচয় ছিল আশ্রয়হীন, ভাসমান কিংবা সমাজের অবহেলিত মানুষ হিসেবে, তাদের অনেকেই আজ নিজেদের সংসার গুছিয়ে নিয়েছেন। কারও ঘরে সন্তান এসেছে, কেউ স্বামী-সন্তান নিয়ে কাটাচ্ছেন স্বাভাবিক পারিবারিক জীবন। সেই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে একজন মানুষের নিরবচ্ছিন্ন সহযোগিতা, ভালোবাসা ও মানবিক দায়িত্ববোধ।

সাজ্জাদ পারভেজের গল্প তাই কেবল ১৫টি বিয়ের আয়োজনের গল্প নয়। এটি এমন এক মানবিকতার গল্প, যেখানে রক্তের সম্পর্কের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে ভালোবাসা; আনুষ্ঠানিক পরিচয়ের চেয়ে বড় হয়েছে দায়িত্ব।

বিয়ের মঞ্চে ‘উকিল বাবা’ হিসেবে যে সম্পর্কের সূচনা, সময়ের পরিক্রমায় তা আজ গভীর পারিবারিক বন্ধনে রূপ নিয়েছে। মেয়েদের দুঃখে তাঁর চোখে জল আসে, সুখে তাঁর মুখে হাসি ফোটে। তাঁদের সন্তানদের কাছে তিনি হয়ে উঠেছেন স্নেহময় নানা।

সাজ্জাদ পারভেজ যেন প্রমাণ করেছেন—বাবা হওয়ার জন্য শুধু জন্মদাতা হলেই হয় না। কখনো কখনো দায়িত্ব, ত্যাগ আর নিঃস্বার্থ ভালোবাসাই একজন মানুষকে সত্যিকারের বাবা করে তোলে।

১৫ মেয়ের জীবনে তিনি তাই শুধু একজন উকিল বাবা নন, তিনি এক জীবন্ত আশ্রয়, নির্ভরতার নাম, মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

সংবাদটি শেয়ার করুন....

আমাদের ফেসবুক পাতা

আজকের আবহাওয়া