মাঝদরিয়ায়ও পুলিশের চাঁদাবাজি
সেপ্টেম্বর ১৬ ২০২৩, ১৭:১৮
নিজস্ব প্রতিবেদক, বরিশাল: দীর্ঘদিন পর নদী এবং সাগরে জালভরে ইলিশ ধরা পড়তে শুরু করায় হাসি ফুটেছিল জেলেদের মুখে। কিন্তু এর মাঝেই সে হাসি কেড়ে নিচ্ছে নতুন এক উপদ্রব। ইলিশ ধরা পড়তে শুরু হতে না হতেই দক্ষিণের উপকূলে ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে পুলিশের চাঁদাবাজি।
সাম্প্রতিক বেশ কয়েকটি ঘটনায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে সাধারণ জেলেসহ আড়তদাররা। মাঝদরিয়ায় মাছ ছিনিয়ে নেওয়া ছাড়াও জেলেদের জিম্মি করে আদায় করা হচ্ছে অর্থ। এর পেছনে শুধু প্রশাসনই নয়, রয়েছে রাজনৈতিক পরিচয়ধারী চাঁদাবাজরাও। সর্বশেষ তিনদিন আগে সমাধান চেয়ে ভোলার জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছে আড়তদার এবং বাংলাদেশ উপকূলীয় মৎস্য ট্রলার শ্রমিক ইউনিয়ন।
দ্বীপ জেলা ভোলার চারপাশটাই মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীবেষ্টিত। কয়েক লাখ জেলে রয়েছে এ উপকূলে, যারা মেঘনা ও সাগরে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে। ইলিশের মৌসুম অনেক আগেই শুরু হলেও এবার কাক্সিক্ষত ইলিশের দেখা পাচ্ছিল না জেলেরা। মৌসুমের শেষে এসে কিছুটা হলেও দেখা মিলতে শুরু করেছে ইলিশের। জালে ধরা পড়ছে মণের পর মণ রুপালি ইলিশ। সেই সুবাদে মৌসুমের শেষ দিকে এসে ব্যস্ত হয়ে উঠেছে মেঘনাপারের মাছঘাটগুলো।
ভোলার সর্বদক্ষিণে অবস্থিত চরফ্যাশন উপজেলার সামরাজ মাছঘাট। আশপাশে রয়েছে আরো বেশ কয়েকটি মাছঘাট। ফজরের পর থেকেই এসব ঘাটে শুরু হয়ে যায় ইলিশ বিক্রির হাঁকডাক। বেলা ১২টার পর থেকেই কমে আসে ইলিশ বিক্রি। তখন চলে প্যাকেজিংয়ের কাজ।
এই কর্মব্যস্ততার আড়ালেই হানা দেয় আরেক উপদ্রব। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ঝড় আর উত্তাল সাগরের ঢেউয়ের সঙ্গে যুদ্ধ করে ইলিশ ধরার পর রাতের আঁধারে মাঝসমুদ্রেই জেলেদের হাত থেকে চিলের মতো ছোঁ মেরে নিয়ে যাওয়া হয় ওইসব ইলিশ; জিম্মি করে আদায় করা হয় চাঁদা। মাছঘাটে আতঙ্কে অপেক্ষা করেন আড়তদাররাও কখন যেন ফোনে ভেসে আসে ‘বিকাশে অথবা নগদে টাকা পাঠান, না হলে জেলে-নৌকা-জাল কিছুই ছাড়া হবে না!’
সরেজমিন চরফ্যাশন সামরাজ মাছঘাটে গিয়ে কথা হয় আড়তদার মিলন মাস্টারের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘কয়েকদিন আগে নোয়াখালী জেলার হাতিয়া থানার নিঝুম দ্বীপ (বন্দরটিলা) নৌ-পুলিশ মাছ ধরার ট্রলারসহ নাছির মাঝি ও তার জেলেদের আটক করে চাঁদা দাবি করে। কথা বলতে চাইলে কথা বলা যাবে না বলেই মোবাইল বন্ধ করে দেন। পুনরায় চেষ্টার পর ফোনে বলেন, বিকাশে টাকা পাঠান। পরে ১৪ হাজার টাকা দিই।’
অপর এক আড়তদার আবদুর করিম বলেন, ‘পুলিশ জালসহ নৌকা ধরেই বলে, টাকা দেন। পরে বিকাশে টাকা পাঠালে নৌকা আর জাল ফেরত দেয়।’ মো. আলাউদ্দিন গাজী নামে আরেক ব্যবসায়ী বলেন, ‘ট্রলারের মাঝি ফোন দিয়ে বলেন, ভাই টাকা পাঠান। কোস্ট গার্ড ধরছে। তখন ১৭ হাজার টাকা দেওয়ার পরেও রক্ষা হয়নি। ট্রলার থেকে মাঝি ও জেলেদের ফেলে চলে যায় তারা। অপর একটি ট্রলার তাদের উদ্ধার করে নিয়ে আসে।’
কাশাল মাঝি বলেন, ‘মাঝদরিয়ায় লাখ লাখ টাকা প্রতিদিন চাঁদাবাজি করছে পুলিশ। তাদেরকে প্রতিরোধ করার কোনো উপায় পাচ্ছি না। অপরদিকে নৌ-পুলিশের কথা বলে চরফ্যাশন ঢালচরে রাজনৈতিক পরিচয়েও ট্রলার জিম্মি করে চাঁদা নেওয়া হয়।’
এমন বহু অভিযোগ রয়েছে পুলিশের বিরুদ্ধে। তবে অভিযোগের শীর্ষে রয়েছে নিঝুমদ্বীপের নৌ-পুলিশ আর দ্বিতীয় অবস্থানে মনপুরার থানা পুলিশ। পুলিশি এই চাঁদাবাজির খপ্পরে পড়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন সাধারণ জেলেদের পাশাপাশি আড়তদাররাও। প্রতিদিন নৌকা থেকে ইলিশ নেওয়ার পাশাপাশি জিম্মি করা হচ্ছে জেলেদের। তারপর বিকাশ কিংবা নগদে টাকা পাঠিয়ে ছাড়িয়ে নিতে হচ্ছে তাদের।
বেশ কিছুদিন ধরে লাগাতার এসব চাঁদাবাজির পর কোনো উপায় না পেয়ে গত ১২ সেপ্টেম্বর আড়তদার এবং বাংলাদেশ উপকূলীয় মৎস্য ট্রলার শ্রমিক ইউনিয়ন চরফ্যাশন শাখার পক্ষে সংগঠনের সভাপতি মো. আলাউদ্দিন পাটোয়ারী স্বাক্ষরিত একটি লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয় ভোলার জেলা প্রশাসক এবং পুলিশ সুপারের কাছে। অভিযোগে কিছু বিকাশ নম্বর দেওয়া হয়েছে, যেসব নম্বরে জেলেদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছে। এর বাইরেও এমন বহু বিকাশ নম্বর রয়েছে যেসব নম্বরে টাকা নিয়ে থাকে পুলিশ।
বাংলাদেশ উপকূলীয় মৎস্য ট্রলার শ্রমিক ইউনিয়ন চরফ্যাশন শাখা সভাপতি এবং আড়ত মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. আলাউদ্দিন পাটওয়ারী বলেন, ডাকাত কিংবা জলদস্যু নয়, পুলিশের অত্যাচারে অতিষ্ঠ আমরা। মাঝদরিয়ায় বেপরোয়া চাঁদাবাজি চলছে। পুলিশ জড়িত থাকায় থানায় জানিয়েও কোনো লাভ হয় না, উল্টো ক্ষতি হয়। এ কাজে সম্প্রতি জড়িয়ে পড়েছেন অসাধু কোস্ট গার্ড সদস্যরাও। প্রতিকার চেয়ে আমরা জেলা প্রশাসক এবং পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। তিনি আমাদের সামনেই তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। আমরা বাড়তি কিছু চাই না, স্বাধীনভাবে নিরাপদে মাছ ধরতে চাই।’
এদিকে নৌ-পুলিশের বিরুদ্ধে জেলেরা অভিযোগ দিচ্ছে স্বীকার করে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোল্লা এমদাদুল্যাহ বলেন, ‘এসব বিষয় আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক সভায় তুলে ধরা হচ্ছে। বিষয় আমাদের নয়, পুলিশের। তারাই ব্যবস্থা নেবেন।’ এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ভোলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান বলেন, ‘ইলিশ মৌসুমে বিভিন্ন ধরনের উৎপাত দেখা যায়। এগুলো আমরা সমাধান করার চেষ্টা করি। পুলিশের বিরুদ্ধে অর্থসংক্রান্ত কোনো অভিযোগ পেলে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না।’









































