লালমোহনের মহিউদ্দিনকে জানানো হলো তিনি মারা গেছেন!

জুলাই ৩১ ২০২৩, ২০:৪৪

হাসান পিন্টু, লালমোহন ভোলা: প্রায় ৩৭ বছর বয়সী যুবক মো. মহিউদ্দিন। ৩ বছর বয়সে টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত হয়ে প্যারালাইজড হয়ে যায় তার দুই পা। অভাব-অনটনের সংসারে ছেলেকে সুস্থ্য করার নানাভাবে চেষ্টা করেছেন তার বাবা।

তবে ভাগ্যের কাছে হেরে গিয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করেন মহিউদ্দিন। এরপর থেকে দুই পা অচল হয়ে শারীরিক প্রতিবন্ধী হিসেবেই দিন পার হতে থাকে তার। প্রতিবন্ধী হওয়ার কারণে ভাতা পেতে আবেদন করেন মহিউদ্দিন।

ওই আবেদনের ভিত্তিতে ২০০৭ সালের জানুয়ারী মাস থেকে প্রতি তিন মাস পরপর ভাতা পেতে শুরু করেন তিনি। তবে হঠাৎ করে ২০২১ সালের অক্টোবর মাসে তার ভাতা বন্ধ হয়ে যায়।

ভাতা বন্ধ হওয়ার কারণ জানতে ২০২২ সালের প্রথম দিকে উপজেলা সমাজ সেবা কার্যালয়ে যান মহিউদ্দিন। সেখানে যা শুনেন তার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না তিনি। তাকে অফিস থেকে জানানো হয় তিনি জীবিত নেই, মারা গেছেন।

এরপর থেকে নিজেকে জীবিত হিসেবে প্রমাণ করতে স্থানীয় চেয়ারম্যান-মেম্বার আর সমাজ সেবা কার্যালয়ে বহুবার যোগাযোগ করেও কোনো প্রতিকার পাননি ওই প্রতিবন্ধী যুবক।

এমন অমানবিক ঘটনার শিকার ভোলার লালমোহন উপজেলার রমাগঞ্জ ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের চৌমুহনী এলাকার মাতাউল্যাহ চৌধুরী বাড়ির আফতার আলীর ছেলে মো. মহিউদ্দিন।

মহিউদ্দিন বলেন, ছোট বেলা থেকেই আমি প্রতিবন্ধী। যার জন্য ভাতা পেতে আবেদন করি। ওই আবেদনের ভিত্তিতে ২০০৭ সাল থেকে প্রতিবন্ধী ভাতা পেতে শুরু করি। হঠাৎ করে ২০২১ সালের অক্টোর থেকে ওই ভাতার টাকা পাওয়া বন্ধ হয়ে যায়।

ভাতা বন্ধ হওয়ার কারণ জানতে সমাজ সেবা অফিসে গিয়ে জানতে পারি; আমি মারা গেছি। আমি মারা যাওয়ায় আমাদের ইউনিয়ন পরিষদ থেকে নাকি অন্যজনের নামের তালিকা দেওয়া হয়েছে।

তবে আমি ‘মারা যাইনি, জীবিত আছি’ এটা প্রমাণ করতে বহুবার চেয়ারম্যান-মেম্বারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। অনেক বার গিয়েছি সমাজ সেবা অফিসে। তবে এখন পর্যন্ত নিজেকে জীবিত প্রমাণ করতে না পারায় ওই ভাতা বন্ধ রয়েছে।

প্রতিবন্ধী যুবক মহিউদ্দিন আরও বলেন, আমার স্ত্রী ও এক সন্তান রয়েছে। ভাতার টাকায় তাদের নিয়ে খেয়ে-পরে দিন পার করতাম। তবে এখন ভাতা বন্ধ থাকায় সংসার চালাতে পারছি না। তাই ছোট ভাইয়ের দোকানে বসি।

যার জন্য সে কিছু টাকা দেয়। তা দিয়ে এখন কোনো রকমে চলছি। আমার দাবি; খুব দ্রুত যেন ভাতাটি পুনরায় চালু করা হয়। এছাড়া আমি জীবিত থাকার পরও যারা আমাকে মৃত বলে ভাতা বন্ধ করেছে তাদেরও বিচার চাই।

আমার সঙ্গে এটা জঘন্যতম প্রতারণা করা হয়েছে। প্রতিবন্ধী মহিউদ্দিনের ছোট ভাই মো. রায়হান জানান, দুই পা অচল হওয়ায় আমার বড় ভাই আগে প্রতিবন্ধী ভাতা পেতো। ২০২১ সালে তার ভাতা বন্ধ হয়ে যায়। এরপর অফিসে গিয়ে জানতে পারেন তিনি মারা গেছেন।

যার জন্য তার স্থানে অন্য একজন ভাতা পাচ্ছেন। আমার ভাই প্রতিবন্ধী হওয়ায় কোনো কাজ করতে পারেন না। আবার তার স্ত্রী ও এক সন্তান আছে। ওই ভাতার টাকায় তিনি মোটামুটি চলতে পারতেন। তবে ভাতা বন্ধ হওয়ার পর থেকে আমার দোকানে বসেন।

যার জন্য আমি কিছু টাকা দেই। এখন তা দিয়েই চলছে তার সংসার। মহিউদ্দিনের বাবা মো. আফতার আলী বলেন, তিন বছর বয়সে সে টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত হয়। এরপর সাধ্য মতো চিকিৎসা করিয়েছি। তবে ওই জ্বরে তার দুই পা প্যারালাইজড হয়ে যায়।

এরপর থেকে সে আর হাটা-চলা করতে পারছে না। তাই একটি প্রতিবন্ধী ভাতার জন্য তৎকালীন চেয়ারম্যানের কাছে গেলে তিনি একটি ভাতার ব্যবস্থা করে দেন। ২০০৭ সাল থেকে মহিউদ্দিন নিয়মিত প্রতিবন্ধী ভাতা পেতো। তবে বছর খানেক আগে তার ভাতা বন্ধ হয়ে যায়।

অফিসে খোঁজ নিয়ে জানা যায়; মহিউদ্দিন নাকি মারা গেছে। এজন্য তার ভাতা অন্যজনের নামে বরাদ্দ করা হয়েছে। বর্তমানে মহিউদ্দিন তার স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে অসহায়ভাবে জীবন-যাপন করছে।

তাই আমার দাবি; শিগগিরই যেন মহিউদ্দিনকে ভাতা প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। লালমোহন উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রমাগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদ থেকে মৃত ও নিষ্ক্রিয় প্রতিবন্ধীর তালিকায় মহিউদ্দিনকে মৃত বলে অন্য একটি নাম প্রতিস্থাপনের জন্য দেওয়া হয়। যার ফলে ২০২১ সালের জুলাই মাসে মহিউদ্দিনের প্রতিবন্ধী ভাতাটি বন্ধ হয়ে যায়।

তার জায়গায় ওই ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের মো. ছানাউল্যাহ নামের এক ব্যক্তির নাম অর্ন্তভূক্ত করা হয়। বর্তমানে ওই ব্যক্তি ভাতা পাচ্ছেন। জীবিত ব্যক্তির নাম মৃতের তালিকায় উঠার বিষয়ে উপজেলার রমাগঞ্জ ইউপি চেয়ারম্যান মো. গোলাম মোস্তফার সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, মহিউদ্দিনের নাম কিভাবে মৃত তালিকায় উঠেছে তা আমার জানা নেই।

কেউ হয়তো আমার স্বাক্ষর জাল করে এই অপকর্ম করেছে। মহিউদ্দিনের ঘটনাটি জানার পর আমি নিজেই সমাজ সেবা কার্যালয়ে গিয়েছি। তাদের বলেছি এই সমস্যা দ্রুত সমাধান করে দিতে।

এ বিষয়ে লালমোহন উপজেলা সমাজ সেবা কর্মকর্তা মো. মাসুদ জানান, আমি এখানে যোগদান করেছি মাত্র কয়েক মাস হলো। এই ঘটনা আগের কর্মকর্তা থাকাকালীন সময়ে ঘটেছে।

তাই এ ব্যাপারে আমি কিছুই জানি না, মাত্র জেনেছি। ভুক্তভোগী ওই ব্যক্তি আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তার সমস্যা সমাধানের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো।

সংবাদটি শেয়ার করুন....

আমাদের ফেসবুক পাতা

আজকের আবহাওয়া