বিভাগে প্রাথমিকে জনবল সংকট
দক্ষিণাঞ্চলে আড়াই হাজারেরও বেশি স্কুলে নেই প্রধান শিক্ষক
আগস্ট ২৮ ২০২৬, ২৩:৫১
আমার বরিশাল ডেস্ক ॥ একটি বিদ্যালয় মানে শুধু একটি ভবন নয়; সেখানে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে শিক্ষক, নেতৃত্ব ও নিয়মিত তদারকির সমন্বয়ে। কিন্তু বরিশাল বিভাগের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর বড় একটি অংশেই এখন সেই নেতৃত্বের ঘাটতি প্রকট। বিদ্যালয় আছে, শিক্ষার্থী আছে, শিক্ষকও আছেন, কিন্তু নেই স্থায়ী প্রধান শিক্ষক।
বরিশাল বিভাগের ছয় জেলার ৬ হাজার ২৪৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ২ হাজার ৫৯৯টিতেই প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। অর্থাৎ প্রতি ১০টি বিদ্যালয়ের মধ্যে প্রায় চারটিই চলছে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক ছাড়াই। একই সঙ্গে সহকারী শিক্ষকেরও ৩ হাজার ২৯টি পদ শূন্য রয়েছে।
শুধু বিদ্যালয় পর্যায়েই নয়, প্রাথমিক শিক্ষার তদারকি ব্যবস্থাতেও দেখা দিয়েছে বড় ধরনের জনবল সংকট। ছয় জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে ৭০টি পদের মধ্যে ৩১টি এবং উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসগুলোর ৫৩৯টি পদের মধ্যে ৩১৩টিই শূন্য। বিভাগীয় উপ-পরিচালকের কার্যালয়েও ১৪টি পদের পাঁচটি খালি।
ফলে বিদ্যালয়ের নেতৃত্ব, শ্রেণিকক্ষের পাঠদান এবং প্রশাসনিক তদারকি, প্রাথমিক শিক্ষার এই তিন গুরুত্বপূর্ণ স্তরেই একসঙ্গে তৈরি হয়েছে জনবল ঘাটতি। এতে বাড়ছে কর্মরত শিক্ষকদের ওপর চাপ, ব্যাহত হচ্ছে পাঠদান এবং দুর্বল হয়ে পড়ছে মাঠপর্যায়ের তদারকি।
বরিশাল বিভাগীয় প্রাথমিক শিক্ষার উপ-পরিচালকের কার্যালয়ের তথ্য বিশ্লেষণে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
বিভাগের মধ্যে প্রধান শিক্ষক সংকট সবচেয়ে তীব্র বরিশাল জেলায়। জেলার ১ হাজার ৫৮৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৯৩৩টিতেই প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। অর্থাৎ জেলার প্রায় ৫৯ শতাংশ বিদ্যালয়েই নেই স্থায়ী প্রধান শিক্ষক।
উপজেলাভিত্তিক চিত্র আরও উদ্বেগজনক। আগৈলঝাড়ার ৯৭টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৬০টি, উজিরপুরের ১৮১টির মধ্যে ১১১টি, গৌরনদীর ১৩১টির মধ্যে ৯০টি এবং বরিশাল সদরের ২০১টির মধ্যে ৭২টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই।
এ ছাড়া বাকেরগঞ্জের ২৭৯টির মধ্যে ১৮১টি, বানারীপাড়ার ১২৬টির মধ্যে ৮৭টি, বাবুগঞ্জের ১৩৪টির মধ্যে ৭৬টি, মুলাদীর ১৩৯টির মধ্যে ৯০টি, মেহেন্দীগঞ্জের ২০৮টির মধ্যে ১১৩টি এবং হিজলার ৯২টির মধ্যে ৫৩টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে।
বরিশালের বাইরে বিভাগের অন্য পাঁচ জেলাতেও প্রধান শিক্ষক সংকট উল্লেখযোগ্য।
পটুয়াখালীর ১ হাজার ২৩৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৩৯১টি, পিরোজপুরের ৯৮৯টির মধ্যে ৩৪০টি, ভোলার ১ হাজার ৪৭টির মধ্যে ৪২৮টি, বরগুনার ৭৯৯টির মধ্যে ৩০৬টি এবং ঝালকাঠির ৫৮৫টির মধ্যে ২০৯টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য।
অর্থাৎ কোনো জেলাতেই প্রধান শিক্ষক সংকট বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং পুরো বিভাগজুড়েই এটি দীর্ঘদিনের একটি কাঠামোগত সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকলেও বিদ্যালয়গুলো পুরোপুরি নেতৃত্বহীন নয়। বিভাগের ৩ হাজার ৬৪৪টি বিদ্যালয়ে অন্য শিক্ষকরা প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন।এর মধ্যে ১ হাজার ১৪ জন শিক্ষক ‘চলতি দায়িত্বে’ রয়েছেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, অস্থায়ীভাবে দায়িত্ব দিয়ে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম চালানো গেলেও এটি স্থায়ী সমাধান নয়। কারণ একজন প্রধান শিক্ষক শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন না; শিক্ষক উপস্থিতি, পাঠদানের মান, শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি, বিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা এবং অভিভাবকদের সঙ্গে সমন্বয়, সবকিছুর ওপরই তাঁকে নজর রাখতে হয়।
দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ী নেতৃত্ব না থাকলে বিদ্যালয়ের একাডেমিক পরিবেশে তার প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
প্রধান শিক্ষক সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সহকারী শিক্ষকের ঘাটতি। ছয় জেলায় সহকারী শিক্ষকের অনুমোদিত পদ রয়েছে ৩৩ হাজার ১২৩টি। এর বিপরীতে কর্মরত আছেন ৩০ হাজার ৯৪ জন। ফলে শূন্য রয়েছে ৩ হাজার ২৯টি পদ।
জেলাভিত্তিক হিসাবে বরিশালে ৬২৯টি, পটুয়াখালীতে ৭৭৫টি, পিরোজপুরে ৪৯৬টি, ভোলায় ৪৬৪টি, বরগুনায় ৩৮০টি এবং ঝালকাঠিতে ২৮৫টি সহকারী শিক্ষকের পদ খালি।
একদিকে প্রধান শিক্ষক নেই, অন্যদিকে সহকারী শিক্ষকও কম—দুই সংকট একসঙ্গে থাকায় অনেক বিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষকদের অতিরিক্ত দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে। এতে নিয়মিত পাঠদান, শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ এবং পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের বাড়তি সহায়তা দেওয়ার সুযোগও সংকুচিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান শাহিন বলেন, ২০০৯ সাল থেকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি বন্ধ রয়েছে।
তিনি বলেন, ২০১৭ সালে কিছু জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষককে প্রধান শিক্ষকের চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তাদের স্থায়ী পদোন্নতি দেওয়া হয়নি। এর মধ্যে অনেকে অবসরে গেছেন বা মারা গেছেন। ফলে শূন্য পদ পূরণে নতুন করে কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় সংকট আরও বেড়েছে।
তার ভাষ্য, বছরের পর বছর প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকায় বিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। শিক্ষক সংকট ও তদারকির ঘাটতির কারণে পাঠদানের মান নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।
বিদ্যালয়ে শিক্ষক নেই, আবার যাদের কাজ বিদ্যালয় তদারকি করা, সেই শিক্ষা অফিসগুলোতেও পর্যাপ্ত জনবল নেই।
ছয় জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে ৭০টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ৩৯ জন। শূন্য রয়েছে ৩১টি পদ। আর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসগুলোর ৫৩৯টি পদের মধ্যে ৩১৩টি পদই শূন্য। সেখানে কর্মরত আছেন মাত্র ২২৬ জন। বিভাগীয় উপ-পরিচালকের কার্যালয়েও ১৪টি পদের মধ্যে পাঁচটি খালি রয়েছে।
ফলে বিদ্যালয় পরিদর্শন, শিক্ষকদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন এবং শিক্ষার মান যাচাই, এসব কাজ যথাযথভাবে পরিচালনা করা কতটা সম্ভব, তা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের বরিশাল জেলার সাধারণ সম্পাদক রনজিৎ দত্ত বলেন, এটি শুধু শূন্য পদের হিসাব নয়; এর সঙ্গে একটি পুরো প্রজন্মের শিক্ষার ভবিষ্যৎ জড়িয়ে আছে।
তিনি বলেন, প্রাথমিক শিক্ষা হচ্ছে শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তি। সেই ভিত্তিতেই যদি শিক্ষক, নেতৃত্ব ও তদারকির ঘাটতি থাকে, তাহলে শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা কঠিন। তাই দ্রুত প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষক নিয়োগের পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা শিক্ষা অফিসের শূন্য পদও পূরণ করতে হবে। একই সঙ্গে তদারকি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বরিশাল বিভাগীয় প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মীর মো. জাহিদুল কবির তুহিন বলেন, বিদ্যালয় ও শিক্ষা অফিসগুলোর জনবল সংকটের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এবং মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। নতুন নিয়োগপ্রক্রিয়া শুরু হলে সংকটের অনেকটাই সমাধান হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
বরিশাল বিভাগের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর এই চিত্র শুধু কয়েক হাজার শূন্য পদের হিসাব নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে লক্ষাধিক শিক্ষার্থীর নিয়মিত পাঠদান, বিদ্যালয়ের একাডেমিক পরিবেশ এবং ভবিষ্যৎ শিক্ষার ভিত্তি।
স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নেই, সহকারী শিক্ষক কম, আবার তদারকি কর্মকর্তাদেরও বড় অংশের পদ শূন্য এভাবে তিন স্তরে একসঙ্গে জনবল ঘাটতি চলতে থাকলে প্রাথমিক শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত মান ধরে রাখা কঠিন।
শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের মতে, দ্রুত শূন্য পদ পূরণের পাশাপাশি নিয়মিত পদোন্নতি, সময়মতো নিয়োগ এবং মাঠপর্যায়ে কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। কারণ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষেই তৈরি হয় একটি জাতির ভবিষ্যৎ, সেই শ্রেণিকক্ষ যেন জনবল সংকটের ভারে নুয়ে না পড়ে, সেটিই এখন সবচেয়ে জরুরি।








































