পায়ের জাদুতে স্বপ্ন বুনছে নাদিরা

জুলাই ২২ ২০২৬, ২১:৫১

দিনমজুর বাবার সংসারে অভাব নিত্যসঙ্গী কিন্তু মাঠে নামলেই নাদিরা হয়ে ওঠে এক দুর্দান্ত লড়াকু ফুটবলার। পায়ের জাদুতে গোল হয়, দল জেতে, আর দর্শক মুগ্ধ হয় তার ফুটবল খেলা দেখে।

দারিদ্র্যকে হার মানিয়ে জাতীয় দলে খেলতে চায় নাদিরা। মাথা গোঁজার ঠাঁই বলতে কেবল একটি ত্রাণের ঘর। অভাবের সংসার, তবু সেই ঘরজুড়েই লুকিয়ে আছে বড় এক স্বপ্ন। সংগ্রাম আর সীমাবদ্ধতার মাঝেও ফুটবলকে আঁকড়ে ধরে এগিয়ে চলেছে পিরোজপুরের ভান্ডারিয়া উপজেলার উত্তর পৈকখালীর কিশোরী নাদিরা আক্তার। সেই ফুটবলই যেন বদলে দিয়েছে তার জীবনের গল্প।

সম্প্রতি পিরোজপুরে অনুষ্ঠিত ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস-২০২৬’-এর জেলা পর্যায়ের ফুটবল প্রতিযোগিতায় অসাধারণ নৈপুণ্য দেখিয়ে সবার নজর কাড়ে তরুণ ফুটবলার নাদিরা। সেমিফাইনাল ও ফাইনালে শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড়ের স্বীকৃতির পাশাপাশি টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কারও জিতেছে সে। এরপর বরিশাল বিভাগীয় পর্যায়ে নিজের সেরাটা প্রমাণ করে ঢাকায় খেলার জন্য নির্বাচিত হয়েছে।

ভাণ্ডারিয়া উপজেলার ৭নং গৌরীপুর ইউনিয়নের উত্তর পৈকখালী গ্রামের মো. দুলাল আকন ও শাহিদা আক্তার দম্পতির চার সন্তানের মধ্যে তৃতীয় নাদিরা। সে বর্তমানে ভান্ডারিয়া মজিদা বেগম বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৮ম শ্রেণীর শিক্ষার্থী। বাবা দিনমজুর হওয়ায় সংসারে অভাব লেগেই থাকে। বড় ভাই নাঈম অষ্টম শ্রেণির পর পড়াশোনা ছেড়ে বাবার সঙ্গে কাজে নেমেছেন। মেজ ভাই নাহিদ এবার এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। ছোট ভাই এখনও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।

Nadira

গত ৮ মে পিরোজপুর জেলা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত জেলা পর্যায়ের নকআউট, সেমিফাইনাল ও ফাইনাল ম্যাচে ছিল নাদিরার দাপুটে উপস্থিতি। তিন ম্যাচে একাই করেছে ছয় গোল। প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ ভেঙে একের পর এক গোল করে দর্শকদের মুগ্ধ করেছে। তার দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে দল ফাইনালে উঠলেও টাইব্রেকারে ২-১ গোলে হেরে যায়। তবে পুরো টুর্নামেন্টে ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের সব আলো ছিল নাদিরার দখলে।

তবে কঠিন বাস্তবতাও হার মেনেছে নাদিরার স্বপ্নের কাছে। ছোটবেলা থেকেই ছেলেদের সঙ্গে মাঠে খেলতে ভালো লাগত তার। চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময় প্রথমবার স্কুল দলের হয়ে মাঠে নামে। এরপর ধীরে ধীরে ফুটবলই হয়ে ওঠে তার জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয়।

তরুণ ফুটবলার নাদিরা বলেন, ‘আমি ছোটবেলা থেকে ফুটবল খুব ভালো খেলি। ফুটবলের প্রতি আমার অনেক আগ্রহ কাজ করে। লেখাপড়ার পাশাপাশি ছোটবেলা থেকেই ফুটবল খেলায় বেশি সময় দিয়েছি। আমি নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসে ভালো পারফর্ম করেছি। জেলা পর্যায়ে ভালো খেলার কারণে গোল্ডেন বুট উপহার পেয়েছি এবং ক্রিকেটেও ম্যান অব দ্য ম্যাচ হয়েছি। এরপরে বরিশালে খেলার সুযোগ পেয়েছি। সেখানেও ভালো করেছি। বর্তমানে আমি ঢাকায় খেলার জন্য নির্বাচিত হয়েছি।’

নাদিরা আরো বলেন, ‘আমার ছোটবেলা থেকেই ইচ্ছা, জাতীয় নারী দলের একজন ফুটবলার হবো। আমার বাবার সেই সমর্থ্য নেই আমাকে জাতীয় দলে যাওয়ার আগ পর্যন্ত যে আর্থিক ব্যয় হবে, সেটা খরচ করার। নিজেকে জাতীয় দলের জন্য প্রস্তুত করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি আমি। সমাজের বিত্তবান কেউ যদি আমাকে সহযোগিতা করেন, তাহলে হয়তো আমি লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারব। আমি জাতীয় দলের হয়ে খেলে দেশের নাম উজ্জ্বল করতে চাই।’

Nadira

নাদিরার সহপাঠী মরিয়ম আক্তার বলেন, ‘আমি তার প্রতি অনেক অনুপ্রাণিত। দোয়া করি সে যেন আরো ভালো পর্যায়ে যেতে পারে। আমিও চাই পড়ালেখা করে বড় হয়ে ভালো কিছু করতে। আমাদের স্কুলের সবচেয়ে ভালো খেলোয়াড় সে। নাদিরা ফুটবলের পাশাপাশি ক্রিকেট, ভলিবল খেলায়ও ভালো।’

অন্য আরেক সহপাঠী নেহা বৈদ্য বলেন, ‘আমাদের সহপাঠী নাদিরা আক্তার স্কুলে অনেক সুনাম অর্জন করছে। সে ঢাকায় সুযোগ পেয়েছে। এসবের জন্য আমাদের কাছে অনেক ভালো লাগে। সে জীবনে অনেক ভালো কিছু করুক, এই কামনা করি। ওর মতো যদি খেলাধুলায় আমরা ভালো কিছু নাও হতে পারি, তবে লেখাপড়া করে ভালো কিছু হতে চাই। দোয়া করি সে যেন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সুযোগ পায়।’

নাদিরার বাবা দুলাল আকন বলেন, ‘নাদিরাকে নিয়ে আমাদের অনেক আশা। আমার অর্থ সম্পদে আমি ওরে নিয়া আওগাইতে পারতেছি না। আমার চারজন ছেলে-মেয়ে। যতটুকু সাধ্য আছে আমি ততটুকু চেষ্টা করতেছি। যদি সরকারিভাবে কোন অনুদান পাই বা কেউ যদি আমারে সাহায্য করে, তাইলে আমি ওরে অনেক বড় জায়গায় নিয়া যাইতে পারমু। নাদিরা বহুৎ পুরস্কার আনছে, ঘরে থোয়ার জায়গা নাই। আমি বর্তমানে ছেলেমেয়ে নিয়ে একটি ত্রাণের ঘরে থাকি। ৪ জন ছেলে-মেয়ে নিয়ে ঘরে থাকতে অনেক কষ্ট হয়। আমার মেয়ের স্বপ্ন সে জাতীয় দলে খেলবে। জাতীয় দলে যাওয়া পর্যন্ত যে খরচগুলো হবে কোনোভাবে সেটা চালানোর মতো সামর্থ্য আমার নেই। আমি সবার কাছে সহযোগিতা কামনা করি।’

Nadira

নাদিরার মা শাহিদা বেগম বলেন, ‘ফুটবল-ক্রিকেট দুইটাই আমার মেয়ে ফাস্টো। আমি টাকা-পয়সায় আগাইতে পারি না। আমার মেয়ে এখন ঢাকায় চান্স পাইছে। ভালো খেলোয়াড় হতে হলে ওর পিছনে অনেক খরচ করতে হবে; কিন্তু সেটা আমার পক্ষে সম্ভব না। যদি কেউ সহযোগিতা করে তাহলে হয়তো ওর স্বপ্ন পূরণ হবে। আমাদের মতো গরিব মানুষের স্বপ্ন দেখা ছাড়া আর কিছুই করার নেই।’

মজিদা বেগম বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. মনিরুজ্জামান হাওলাদার বলেন, ‘আমার স্কুলের শিক্ষার্থী নাদিরা একজন তরুণ খেলোয়াড়। খেলোয়াড় হিসেবে ইতোমধ্যে সে সুনাম অর্জন করেছে। নাদিরার আর্থিক অবস্থা খুব বেশি একটা ভালো নয়। যদি কোন স্বনামধন্য ব্যক্তি তার উন্নত জীবনের জন্য এগিয়ে আসে, তাহলে সে অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারবে। তাকে যদি সঠিকভাবে নার্সারি করা হয়, তাহলে সে দেশের জন্য সুনাম বয়ে আনতে পারবে। সবার প্রতি প্রত্যাশা থাকবে, নাদিরার আর্থিক দিকটি বিবেচনা করে ওকে সহযোগিতা করার।

পিরোজপুর জেলা ক্রীড়া কর্মকর্তা কৌশিক মন্ডল বলেন, ‘নাদিরা নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসে দুটো ইভেন্টে অংশগ্রহণ করেছে। দুই খেলাতেই টুর্নামেন্ট সেরা হয়েছে। যে দক্ষতা এবং অ্যাবিলিটি আছে, তাকে যদি সুন্দরভাবে নার্সিং করতে পারি- আমার বিশ্বাস নাদিরা শুধু পিরোজপুর নয়, সে দেশের নাম উজ্জ্বল করবে। নাদিরা দেশের হয়ে সর্বোচ্চ জায়গা খেলতে পারবে।’

Nadira

তিনি আরো বলেন, ‘নাদিরা অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারের একটি মেয়ে, তার আর্থিক সহায়তার জন্য দেশের যারা বিত্তশালী আছে তাদেরকে আহ্বান করব নাদিরার পাশে দাঁড়ানোর জন্য। যদি সঠিকভাবে সহযোগিতা পায় এবং তাকে যদি নার্সিং করা যায় তাহলে সে দেশের জন্য সম্পদে পরিণত হবে। আমি বিকেএসপির সাথে যোগাযোগ করছি যাতে কোন একটি প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করতে পারে

স্বপ্ন আছে, আছে অদম্য ইচ্ছা শক্তিও। এখন শুধু প্রয়োজন একটু সহযোগিতা আর সঠিক প্রশিক্ষণ। তাহলেই হয়তো একদিন জাতীয় দলের জার্সিতে দেখা যাবে পিরোজপুরের এই সংগ্রামী ফুটবলার নাদিরাকে।

সংবাদটি শেয়ার করুন....

আমাদের ফেসবুক পাতা

আজকের আবহাওয়া


এক্সক্লুসিভ আরও