নির্বাসন থেকে নেতৃত্বে
দল ও দেশের হাল ধরতে সামনে কঠিন পরীক্ষা তারেক রহমানের
জানুয়ারি ১৪ ২০২৬, ১১:৩২
এই ভঙ্গুর ও অনিশ্চিত প্রেক্ষাপটে দেড় যুগের নির্বাসন শেষে দেশে ফিরে বিএনপির পূর্ণাঙ্গ চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন তারেক রহমান। এটি নিছক একটি দলের নেতৃত্ব বদলের ঘটনা নয়; বরং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র কাঠামো কোন পথে যাবে তার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি রাজনৈতিক মুহূর্ত।
তারেক রহমান দীর্ঘদিন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দল পরিচালনা করলেও বিএনপির ভেতরের প্রকৃত ঐক্যের ভিত্তি ছিল খালেদা জিয়ার প্রতীকী কর্তৃত্ব। তিনি অসুস্থ, রাজনীতিতে অনুপস্থিত তবুও তাঁর নাম বিএনপিকে এক রেখায় ধরে রেখেছিল। এখন সেই ছাতা সরে গেছে। তারেক রহমান একা।
এটি তাঁর জন্য দ্বিমুখী বাস্তবতা তৈরি করেছে একদিকে পূর্ণ কর্তৃত্ব, অন্যদিকে পূর্ণ দায়। এখন বিএনপির ঐক্য, শৃঙ্খলা ও ভবিষ্যৎ পুরোপুরি তাঁর রাজনৈতিক দক্ষতার ওপর নির্ভরশীল।
রাজনৈতিক নির্বাসন ইতিহাসে একটি গভীর পরীক্ষা। কেউ কেউ এতে ভেঙে পড়েন, আবার কেউ ইতিহাসে ফিরে আসেন রূপান্তরিত রাষ্ট্রনায়ক হয়ে। নেলসন ম্যান্ডেলা কারাগার থেকে বেরিয়ে প্রতিশোধ চাননি, তিনি একটি ভাঙা জাতিকে এক করেছিলেন।
তারেক রহমানের দীর্ঘ নির্বাসন, মামলা-মোকদ্দমা, রাজনৈতিক অপপ্রচার ও বিচ্ছিন্নতা সব মিলিয়ে তাঁকেও এক গভীর মানবিক ও রাজনৈতিক পরীক্ষার ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, এই অভিজ্ঞতা কি তাঁকে কঠোর করেছে, নাকি পরিণত?
ভাষার রূপান্তর ও রাজনীতির নতুন সুর সাম্প্রতিক সময়ে তারেক রহমানের বক্তব্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। তিনি এখন- প্রতিহিংসার বদলে পুনর্মিলনের কথা বলেন, ক্ষমতার বদলে রাষ্ট্রের কথা বলেন, দখলের বদলে প্রতিষ্ঠান গড়ার কথা বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে এটি এক নতুন সুর। কারণ এখানকার রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে “আমরা বনাম তারা” বিভাজনে আবদ্ধ ছিল।
তারেক রহমানের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বোঝা তাঁর অতীত। ২০০১–২০০৬ সময়কালের ‘হাওয়া ভবন’ সংক্রান্ত অভিযোগগুলো রাজনৈতিকভাবে তাঁকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এই ভাবমূর্তি ভাঙতে হলে শুধু বক্তব্য নয় রাষ্ট্র পরিচালনায় নিরপেক্ষতা, দুর্নীতিবিরোধী দৃশ্যমান পদক্ষেপ, এবং প্রশাসনিক সংস্কার অপরিহার্য। রাজনীতি বিশ্বাসে চলে, আর বিশ্বাস তৈরি হয় কাজে।
বিএনপির চিরচেনা শক্তিশালী প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগ, কিন্তু আওয়ামী লীগ বর্তমানে নিষিদ্ধ ও মাঠের বাইরে। ফলে বিএনপির সামনে এবার প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত নেতৃত্বাধীন ধর্মীয় জোট। এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন মেরূকরণের সৃষ্টি। তারেক রহমানকে শুধু ক্ষমতা নয়, এই আদর্শিক লড়াইটিও মোকাবিলা করতে হবে।
তারেক রহমান আজ ইতিহাসের এক দরজায় দাঁড়িয়ে। তিনি চাইলে ক্ষমতা ব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে দমন করতে পারেন। আবার চাইলে গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশের রাষ্ট্র পুনর্গঠনের নায়ক হতে পারেন। বাংলাদেশ এখন একজন রাজনীতিক নয় একজন রাষ্ট্রনায়ক খুঁজছে। ভঙ্গুর এই রাষ্ট্রব্যবস্থাকে স্থিতিশীল এবং উন্নয়নমুখী ও অর্থনীতির চাকা চলমান রাখতে দরকার একজন রাষ্ট্রপ্রধান।
তারেক রহমান সেই ভূমিকায় নিজেকে রূপান্তর করতে পারবেন কি না, তা ঠিক করবে নির্বাচনের ফলাফল- আর ফলাফলের মাধ্যমেই ঠিক করবেন তার পরিচয় রাষ্ট্রপ্রধান নাকি রাজনীতিক? সময়ই শেষ কথা বলবে।









































