ফ্যামিলি কার্ডের পাইলট প্রকল্পে অস্বাভাবিক ব্যয়
জুলাই ১৫ ২০২৬, ০৩:০২
দুই যুগ পরে ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকারের প্রধান নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি ছিল ‘ফ্যামিলি কার্ড’। নারীপ্রধান পরিবারের জন্য মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে ভাতা দিতে নেওয়া এই কল্যাণমূলক কর্মসূচির মোট বরাদ্দ যা ছিল, তার এক-তৃতীয়াংশই পাইলট বা পরীক্ষামূলক প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় করেছে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়। মোট ৩৮ কোটি ৭ লাখ টাকা বরাদ্দের ৩৩ দশমিক ৯৪ শতাংশ বা ১২ কোটি ৯২ লাখ টাকা সংস্থাপন খরচ অর্থাৎ তথ্য সংগ্রহ, ডিজিটাল ডেটাবেজ ও স্মার্ট কার্ড তৈরিসহ বাস্তবায়ন ব্যয় হিসেবে দেখানো হয়েছে। বিপুল এই ব্যয়কে ‘অস্বাভাবিক’ হিসেবে তুলে ধরে এর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে অর্থ বিভাগ। এই ব্যয় খতিয়ে দেখা উচিত বলে মত দিয়েছেন বিশ্লেষকরা।
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ক্ষমতায় এসে নারীর ক্ষমতায়ন, অধিকার, মর্যাদা ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করে তারেক রহমানের সরকার। এজন্য দেশের ১৩টি জেলার ১৩টি সিটি করপোরেশন ও ইউনিয়নের ১৫টি ওয়ার্ডে পাইলট কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়। তথ্য যাচাই-বাছাই শেষে ৩৭ হাজার ৫৬৭টি নারীপ্রধান পরিবারকে মাসিক ২ হাজার ৫০০ টাকা করে ভাতা দেওয়ার জন্য নির্বাচন করা হয়।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এই কর্মসূচি বাস্তবায়নে ৩৮ কোটি ৭ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়। এর মধ্যে ২৫ কোটি ১৫ লাখ টাকা বা ৬৬ দশমিক ০৬ শতাংশ অর্থ কার্ডের মাধ্যমে নগদ সহায়তা হিসেবে দেওয়া হয়। বাকি ১২ কোটি ৯২ লাখ টাকা সংস্থাপন ব্যয় হয়েছে। এর মধ্যে জরিপভুক্ত প্রতি পরিবারের জন্য ১ হাজার ৯০৪ টাকা ব্যয় হয়েছে।
Ads 11
তবে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দাবি, প্রযুক্তিনির্ভর, স্বচ্ছ ও নির্ভুল উপকারভোগী নির্বাচন নিশ্চিত করতেই এ ব্যয় করা হচ্ছে। উপকারভোগী নির্বাচন থেকে শুরু করে স্মার্ট কার্ড প্রস্তুতের মতো কাজ এ অর্থ ব্যয় হচ্ছে। তবে অর্থ বিভাগের মতে, এই ব্যয়ের যৌক্তিকতা নেই। কারণ তথ্য সংগ্রহে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বিদ্যমান মাঠপর্যায়ের জনবলকেই ব্যবহার করা হয়েছে। আর কারিগরি সহায়তা দিয়েছে অর্থ বিভাগ।
এ বিষয়ে সাবেক অর্থ সচিব মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, ‘একটা প্রকল্পের পাইলটিংএ এক তৃতীয়াংশ অর্থ ব্যয় করাটা স্বাভাবিক বিষয় না। আমি মনে করি, এই বিষয়টি সরকারের খতিয়ে দেখা উচিত।
একইভাবে অর্থ বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা প্রকল্পের ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তারা বলছেন, কোনোভাবেই পাইলটিংয়ে এই পরিমাণ ব্যয় হওয়ার কথা না।’
অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, তথ্য সংগ্রহের জন্য সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মাঠপর্যায়ের বিদ্যমান অফিস ও জনবলই যথেষ্ট ছিল। এ কারণে অতিরিক্ত জনবল নিয়োগের প্রয়োজন ছিল না। এছাড়া পুরো কর্মসূচির কারিগরি সহায়তা অর্থ বিভাগই দিয়েছে। জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যভান্ডারের ফিও খুবই সামান্য।
পাইলট পর্যায়ে মোট ৬৭ হাজার ৮৫৪টি নারীপ্রধান পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এরপর সফটওয়্যারের মাধ্যমে প্রক্সি মিনস টেস্ট বা দারিদ্র্যসূচক নির্ধারণ করে পরিবারগুলোকে হতদরিদ্র, দরিদ্র, নিম্ন মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত— এই পাঁচটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়।
এ প্রক্রিয়ায় হতদরিদ্র, দরিদ্র ও নিম্ন মধ্যবিত্ত হিসেবে ৫১ হাজার ৮০৫টি পরিবার চিহ্নিত হয়। যাচাই-বাছাই শেষে ৪৭ হাজার ৭৭৭টি পরিবারের তথ্য সঠিক পাওয়া যায়। পরে একই ব্যক্তি একাধিক সরকারি ভাতা গ্রহণ, সরকারি চাকরি, পেনশনসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে চূড়ান্তভাবে ৩৭ হাজার ৫৬৭টি নারীপ্রধান পরিবারকে কর্মসূচির জন্য নির্বাচন করা হয়েছে। অবশ্য সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রম তদারকির জন্য ৫৬০ জন সুপারভাইজার নিয়োগ দেয়। এ খাতে ব্যয় হয়েছে ২৮ লাখ টাকা।
ফ্যামিলি কার্ডের পাইলট প্রকল্পে অস্বাভাবিক ব্যয়ের বিষয়ে সমাজকল্যাণমন্ত্রী এ জেড এম ডা. জাহিদ হোসেন জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, ‘পাইলট প্রকল্পে ব্যয় কিছুটা বেশি হয়েছে। তবে ধীরে ধীরে এই ব্যয় কমে যাবে।’ প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া তুলে ধরে তিনি বলেন, উপকারভোগী বাছাই নিরপেক্ষ ও তথ্যভিত্তিক করতে ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে কমিটি গঠন করা হয়।
মন্ত্রী বলেন, ওয়ার্ড কমিটির সদস্যরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরিবারের আর্থসামাজিক অবস্থা, সদস্যসংখ্যা, শিক্ষার তথ্য, বাসস্থানের ধরন, ব্যবহৃত গৃহস্থালি সামগ্রী— যেমন- টেলিভিশন, ফ্রিজ, কম্পিউটার ও মোবাইল ফোন— এছাড়া রেমিট্যান্স প্রবাহসহ বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করেন। পরে ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করা হয়। তার দাবি, পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়া সফটওয়্যারের মাধ্যমে প্রক্সি মিনস টেস্টের ভিত্তিতে সম্পন্ন হওয়ায় উপকারভোগী নির্বাচনে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি কিংবা ম্যানুয়াল হস্তক্ষেপের কোনো সুযোগ ছিল না।
জানা গেছে, স্পর্শবিহীন চিপযুক্ত আধুনিক স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ডে কিউআর কোড ও নিকটক্ষেত্র যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, যা নিরাপদ ও দীর্ঘস্থায়ী হবে। এক কার্ডের মাধ্যমে এক পরিবারের পাঁচজন সদস্য সুবিধা পাবেন। তবে যৌথ বা একান্নবর্তী পরিবারে সদস্য পাঁচের বেশি হলে আনুপাতিক হারে একাধিক কার্ড দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
জানা গেছে, চিপযুক্ত একটি কার্ড তৈরিতে খরচ হয় ৫০ থেকে ৬০ টাকা। এই হিসেবে ৩৭ হাজার ৫৬৭টি কার্ড তৈরিতে খরচ হতে পারে ২২ লাখ ৫৪ হাজার ২০ টাকা থেকে ১৮ লাখ ৭৮ হাজার ৩৫০ টাকা। পাইলট পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিটি নারীপ্রধান পরিবার মাসিক ২ হাজার ৫০০ টাকা করে ভাতা পাবে। ভবিষ্যতে একই মূল্যের খাদ্যপণ্য সহায়তা দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা হবে বলে জানান মন্ত্রী।
অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, মাঠ প্রশাসনের মাধ্যমে উপকারভোগী নির্বাচন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হয়েছে। সরকার পাইলটিং করতে বাড়তি কোনো অর্থ ব্যয় করেনি। এমনকি রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতাও রাখা হয়নি। তিনি আরও বলেন, ‘কোথাও কোনো অনিয়ম হলে তা জানাতে হবে এবং প্রকল্পটি সততা ও জবাবদিহিতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করা হবে। উপকারভোগীদের তালিকা একটি স্বচ্ছ ও স্বাধীন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রস্তুত করা হয়েছে। এতে কোনো ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব বা পক্ষপাতিত্ব নেই।’








































