জামায়াতের উত্থান কি বিএনপির জন্য অশনিসংকেত 

ফেব্রুয়ারি ১৫ ২০২৬, ১৯:৫০

দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষ হয়েছে। দেশি-বিদেশি নানা মহলের সংশয় উড়িয়ে মোটামুটি শান্তিপূর্ণ পরিবেশে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের সাক্ষী হয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু ভোটের ফলাফলে যে রাজনৈতিক মানচিত্র ফুটে উঠেছে, তা যেমন বিএনপির জন্য বিশাল বিজয়ের বার্তা এনেছে, তেমনি পর্দার আড়ালে তৈরি করেছে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে সংসদে জামায়াতে ইসলামীর অভাবনীয় উত্থান এবং বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা এই দুই মেরু আগামীর রাজনীতিকে কোন পথে নিয়ে যাবে, তা নিয়ে শুরু হয়েছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।

জুলাই অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করার ফলে দলটির প্রাতিষ্ঠানিক অনুপস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে কিছু প্রশ্ন উঠেছিল। তবে বাস্তব পরিস্থিতি বলছে ভিন্ন কথা। আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব নির্বাচন প্রতিহত করার ঘোষণা দিলেও মাঠপর্যায়ে তাদের বিশাল কর্মী ও সমর্থক গোষ্ঠী ভোট প্রদান থেকে বিরত থাকেনি। এমনকি কারাবন্দি শীর্ষ নেতারাও ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. ইফতেখারুজ্জামানের মতে, আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংক টানার জন্য বিএনপি, জামায়াত ও জাতীয় পার্টির মধ্যে যে তীব্র প্রতিযোগিতা হয়েছে, তা নির্বাচনকে কার্যত অংশগ্রহণমূলক করে তুলেছে। আওয়ামী লীগের সমর্থকেরা দল হিসেবে নয়, বরং ব্যক্তি ভোটার হিসেবে সক্রিয় ছিলেন। ফলে এই নির্বাচনকে ‘অ-অন্তর্ভুক্তিমূলক’ বলার সুযোগ ক্ষীণ।

এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় বিস্ময় হলো সংসদে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর, বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর শক্তিশালী অবস্থান। সংসদের এক-চতুর্থাংশের বেশি আসন এখন তাদের দখলে। এই উত্থানকে কেবল সাময়িক কোনো জোয়ার হিসেবে দেখলে ভুল হবে। জামায়াতের শক্তিমত্তার তিনটি প্রধান স্তম্ভ আছে।

১. প্রাতিষ্ঠানিক ইকোসিস্টেম: গত কয়েক দশকে জামায়াত শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যাংকিং এবং সিভিল-মিলিটারি আমলাতন্ত্রে নিজেদের একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করেছে।

২. বিকল্পের সন্ধান: মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো যখনই জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে, জামায়াত নিজেকে একটি ‘সুশৃঙ্খল বিকল্প’ হিসেবে উপস্থাপন করার সুযোগ পেয়েছে।

৩. ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব: বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ইসলামের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি এবং প্রতিবেশী দেশের উগ্র হিন্দুত্ববাদী প্রচারণার ফলে অভ্যন্তরীণভাবে একধরনের ‘ধর্মীয় নিরাপত্তাহীনতা’ তৈরি হয়েছে, যা জামায়াতের মতো দলকে রাজনৈতিক সুবিধা দিয়েছে।

নির্বাচনে বিএনপি জোট দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। সংসদীয় গণতন্ত্রে এটি ক্ষমতার সর্বোচ্চ শিখর হলেও, বাংলাদেশের ইতিহাসে এর অতীত রেকর্ড খুব একটা সুখকর নয়। অতীতে যখনই কোনো দল এ ধরনের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা পেয়েছে, তখনই ‘বিজয়ীরা সব নিয়ে যাবে’ (Winner takes all) মানসিকতা তৈরি হয়েছে।

ড. ইফতেখারুজ্জামান সতর্ক করে বলেছেন, এই বিশাল বিজয় যেন ‘ক্ষমতার অপব্যবহারের লাইসেন্স’ হিসেবে ব্যবহৃত না হয়। বিএনপিকে ‘এবার আমাদের পালা’ এই প্রতিহিংসামূলক মনোভাব পরিহার করে আত্মশুদ্ধির পথে হাঁটতে হবে।

বিএনপি রাষ্ট্র মেরামতের ৩১ দফা এবং জুলাই সনদের অঙ্গীকার নিয়ে নির্বাচনে এলেও কিছু মৌলিক সংস্কার প্রস্তাবে তাদের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমত চিন্তার খোরাক জোগায়। বিশেষ করে সরকারের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা হ্রাসের কিছু প্রস্তাবে বিএনপি সায় দেয়নি। দলটির যুক্তি ছিল, এতে সরকারের হাত-পা বেঁধে ফেলা হবে। কিন্তু জুলাই অভ্যুত্থানের মূল আকাঙ্ক্ষা ছিল জবাবদিহিতা। বিএনপি যদি ক্ষমতায় গিয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তবে সেই শূন্যস্থান পূরণে জামায়াত আরও আগ্রাসীভাবে এগিয়ে আসবে।

জামায়াত এবারের নির্বাচনে যতটুকু পেয়েছে, তাতেই তারা সন্তুষ্ট থাকবে বলে মনে হয় না। বরং তারা কেন আরও বেশি এগোতে পারল না, সেই ব্যবচ্ছেদ করতে তারা দ্রুতই ‘ড্রয়িং বোর্ডে’ ফিরে যাবে। নতুন কৌশল আর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে তারা পরবর্তী লড়াইয়ের প্রস্তুতি নেবে।

অন্যদিকে, তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকারকে প্রমাণ করতে হবে যে, তারা কেবল ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য নয়, বরং রাষ্ট্র কাঠামো পরিবর্তনের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বিএনপির সফলতা বা ব্যর্থতার ওপরই নির্ভর করছে বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির ভবিষ্যৎ বিস্তার।

সংবাদটি শেয়ার করুন....

আমাদের ফেসবুক পাতা

আজকের আবহাওয়া

পুরাতন সংবাদ খুঁজুন

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১৩১৫
১৬১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭  

এক্সক্লুসিভ আরও