রাজপুত্রের রাজ্যাভিষেক

ফেব্রুয়ারি ১৮ ২০২৬, ০৩:০৭

২০০৭ সালের ৭ মার্চের সেই কুয়াশাচ্ছন্ন সকালের কথা হয়তো আজও ভোলেননি বাংলাদেশের কোটি মানুষ। বনানীর ‘হাওয়া ভবন’ থেকে যখন তারেক রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, তখন কেউ কি ভেবেছিলেন এটি কেবল একটি গ্রেপ্তার নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনীতির এক দীর্ঘতম এবং সবচেয়ে কণ্টকাকীর্ণ নির্বাসন ও সংগ্রামের মহাকাব্য হতে যাচ্ছে। ১/১১-এর শাসনামলে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সেই অন্ধকার প্রকোষ্ঠে যে অমানুষিক শারীরিক ও মানসিক নিপীড়ন তার ওপর চালানো হয়েছিল, তা কেবল তাকে বন্দিই করেনি, পঙ্গু করে দেয়ার চেষ্টাও করা হয়েছিল।কিন্তু ২০ বছর পর সেই ইতিহাস যেন নতুন এক রাজসিক প্রত্যাবর্তনের সাক্ষী হলো। সব নির্যাতন আর নির্বাসনের দুঃসহ স্মৃতি মাড়িয়ে গতকাল বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন তারেক রহমান।

নির্বাসন থেকে পুনর্গঠন : লন্ডনের সেই ‘রাজনৈতিক পাঠশালা’
২০০৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর যখন তিনি জামিনে মুক্তি পান, তখন তার শরীর ভেঙে পড়েছিল নির্যাতনে, কিন্তু মনোবল ছিল ইস্পাতকঠিন। চিকিৎসার প্রয়োজনে ওই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর তিনি লন্ডনে পাড়ি জমান। নিন্দুকরা ভেবেছিলেন, এই নির্বাসনই তার রাজনৈতিক জীবনের যবনিকা। কিন্তু তারেক রহমান প্রমাণ করলেন তিনি ছাই থেকে জেগে ওঠা ‘ফিনিক্স পাখি’। লন্ডনের কিংস্টনে থাকা অবস্থায় তিনি নিজেকে কেবল চিকিৎসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেননি, বরং প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার করে সুদূর আটলান্টিকের ওপার থেকে দলকে পুনর্গঠন করার এক অনন্য পাঠশালা তৈরি করেছিলেন।

২০০৯ সালের পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে বিপুল জনমতে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে তিনি তৃণমূলের আস্থার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি লাভ করেন। যখন দেশে বিএনপি দমন-পীড়নের শিকার হয়ে কোণঠাসা, তখন তিনি স্কাইপ আর জুমের মাধ্যমে দেশের প্রতিটি আনাচে-কানাচের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করেন। তার এই ‘ভার্চুয়াল নেতৃত্ব’ ছিল তৎকালীন শাসকদের জন্য এক মূর্তিমান আতঙ্ক।আস্থার অভিভাবক ও দূরদর্শী রণকৌশল ২০১৮ সালে বেগম খালেদা জিয়া কারাবরণ করলে দলের নেতৃত্বে যে শূন্যতা তৈরির ষড়যন্ত্র হয়েছিল, তা নস্যাৎ করে দিয়ে তারেক রহমান ‘ভার্ভিং চেয়ারম্যান’ হিসেবে হাল ধরেন।

তিনি প্রমাণ করেন, কেবল রক্তেই নয়, মেধা আর সাংগঠনিক দক্ষতায় তিনি শহীদ জিয়ার যোগ্য উত্তরসূরি। সিনিয়র নেতাদের এক সুতোয় বেঁধে রাখা এবং তৃণমূলের প্রতিটি কর্মীর কাছে ‘আস্থার অভিভাবক’ হিসেবে আবির্ভূত হওয়া ছিল তার রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম সেরা সাফল্য।

২০২৪-এর জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানেও তারেক রহমানের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। দলীয় পরিচয় ছাপিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাশে ঢাল হিসেবে দাঁড়াতে তিনি ছাত্রদল ও যুবদলকে যে নির্দেশনা দিয়েছিলেন, তা আন্দোলনের প্রাথমিক ধাক্কা সামলাতে বড় ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে বাম-ডান সব মতাদর্শের দলকে ‘এক দফা’র ভিত্তিতে এক প্ল্যাটফর্মে এনে শেখ হাসিনা সরকারকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া ছিল তার রাজনৈতিক দূরদর্শিতার পরিচয়।

বীরের বেশে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ও ‘আই হ্যাভ প্ল্যান’
দীর্ঘ ১৭ বছরের বনবাস কাটিয়ে গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর যখন তিনি দেশের মাটিতে পা রাখলেন, তখন বিমানবন্দর থেকে শুরু করে পূর্বাচলের ৩০০ ফিট রাস্তা পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকা জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছিল। সেদিন বিকেলে এক ঐতিহাসিক জনসভায় মার্টিন লুথার কিং জুনিয়ারের আদলে তিনি ঘোষণা করেছিলেন- ‘আমার একটি পরিকল্পনা আছে’। একটি দুর্নীতিমুক্ত, স্বনির্ভর ও আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার সেই রূপরেখাই আজ তাকে এনে দিয়েছে রাষ্ট্রক্ষমতার মসনদে।

পরবর্তীতে বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণে যখন গোটা দল অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছিল, তখন নয়াপল্টনে সমবেত লাখো নেতাকর্মীর অশ্রুসিক্ত নয়নে সর্বসম্মতিক্রমে তাকে দলের ‘চেয়ারম্যান’ হিসেবে অভিষিক্ত করা হয়। সেই শোককে শক্তিতে রূপান্তর করেই তিনি নামেন নির্বাচনি লড়াইয়ে।

নির্বাচনি বৈতরণী ও ভূমিধস বিজয়
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তারেক রহমানের বিরামহীন প্রচারণায় দেশজুড়ে এক নতুন জাগরণ তৈরি হয়। গত ২২ জানুয়ারি সিলেট থেকে শুরু হওয়া সেই প্রচারণায় তিনি প্রথাগত জনসভার বদলে সাধারণ মানুষের সাথে সরাসরি কথা বলার কৌশল নেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন বেকারদের কর্মসংস্থান, কৃষকদের জন্য বিশেষ কার্ড এবং ধর্মীয় নেতাদের জন্য রাষ্ট্রীয় সম্মানির।

ফলাফল হিসেবে দেখা যায়, ২৯৭টি আসনের মধ্যে বিএনপি এককভাবে ২০৯টি এবং মিত্রদের নিয়ে মোট ২১২টি আসনে জয়লাভ করে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। তারেক রহমান নিজে বগুড়া-৬ ও ঢাকা-১৭ আসন থেকে বিপুল ভোটে বিজয়ী হন।

তৃণমূল থেকে রাষ্ট্রনায়ক : এক গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস
তারেক রহমানের শৈশব ছিল অত্যন্ত সাদামাটা কিন্তু এক বিশাল ইতিহাসের অংশ। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তিনি সরকারের কোনো প্রশাসনিক পদে না বসেও দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন চষে বেড়িয়েছেন ‘তৃণমূল প্রতিনিধি সভা’ করার জন্য। বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো নেতার তৃণমূলের প্রতিটি স্তরে গিয়ে কর্মীদের নাম ধরে ডাকার এমন নজির বিরল। তিনি সবসময় বিশ্বাস করতেন, ক্ষমতার উৎস সচিবালয় নয়, বরং গ্রামীণ জনপদ।

গতকালের এই শপথ অনুষ্ঠানে বঙ্গভবনের চিরচেনা চার দেয়াল ভেঙে জনগণের সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় শপথ নেয়া ছিল এক বিশেষ প্রতীকী বার্তা। ক্ষমতার দম্ভ নয়, বরং জনগণের সেবক হওয়ার যে অঙ্গীকার তিনি করেছেন, তা বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই শুরু হলো তারেক রহমানের নতুন ইনিংস। ১৭ বছরের সেই নির্যাতন আর নির্বাসনের দুঃসহ স্মৃতি আজ থেকে ইতিহাস; বর্তমান আর ভবিষ্যৎ এখন শুধুই এক নতুন বাংলাদেশের স্বপ্নকে ঘিরে।

সংবাদটি শেয়ার করুন....

আমাদের ফেসবুক পাতা

আজকের আবহাওয়া

পুরাতন সংবাদ খুঁজুন

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১৩১৫
১৬১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭  

এক্সক্লুসিভ আরও