মেট্রোরেলে সময় বাঁচলেও ভাড়া বেশি

ডিসেম্বর ১৮ ২০২২, ১৩:৫৯

নিজস্ব প্রতিবেদক, বরিশাল: মেট্রোরেল ঢাকাবাসীর কাছে আর স্বপ্ন নেই। ইতিমধ্যে এটি বাস্তবে রূপ নিয়েছে।

২৮ ডিসেম্বর প্রথম ধাপে উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত (প্রায় ১২ কিলোমিটার) যাত্রী নিয়ে মেট্রোরেল আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হওয়ার মধ্য দিয়ে দেশে গণপরিবহন ব্যবস্থায় এক নতুন যুগের সূচনা হতে যাচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের পরদিন ২৯ ডিসেম্বর থেকে সাধারণ যাত্রী পরিবহন শুরু হবে।

এদিন থেকে প্রতি কিলোমিটার ৫ টাকা হিসেবে ৬০ টাকা ভাড়া দিয়ে মাত্র ২০ মিনিটে উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত যাতায়াত করতে পারবেন যাত্রীরা।

তবে মেট্রোরেলের সরকার নির্ধারিত ভাড়া অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি দাবি করে এই ভাড়া ৫০ শতাংশ কমানো এবং সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা করার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি এবং নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটি।

মেট্রোরেল সূত্র জানিয়েছে, উদ্বোধনের পরদিন থেকেই চলাচল করবে কমপক্ষে ৫টি ট্রেন। প্রতিটি ট্রেনে

প্রাথমিকভাবে ৬টি করে কোচ থাকবে। পরে আরও দুটি কোচ যোগ করে প্রতি ট্রেনে কোচের সংখ্যা ৮টিতে উন্নীত করা হবে। প্রতিটি ট্রেনের ছয়টি কোচের মধ্যে দুই প্রান্তের দুটি কোচকে বলা হচ্ছে ট্রেইলর কার।

এতে চালক থাকবেন। এসব কোচে ৪৮ জন করে যাত্রী বসতে পারবেন। মাঝখানের চারটি মোটরকার কোচে বসার ব্যবস্থা আছে ৫৪ জনের। সব মিলিয়ে একটি ট্রেনে বসে যেতে পারবেন ৩১৬ জন। প্রতিটি কোচ সাড়ে ৯ ফুট চওড়া।

মাঝখানের প্রশস্ত জায়গায় যাত্রীরা দাঁড়িয়ে ভ্রমণ করবেন। ভোর ৬টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত চার মিনিট অন্তর ট্রেন চলাচল করার কথা থাকলেও প্রথম দিকে এ নিয়ম মানা হবে না।

আপাতত কিছু দিনের জন্য সকালে এবং বিকালে কিছুক্ষণ ট্রেন চলবে। ডিএমটিসিএল কর্মকর্তারা জানান, শুরুতে মেট্রোরেল সব স্টেশনে থামবে না। শুরুর স্টেশন উত্তরা উত্তর থেকে ছেড়ে ট্রেনটি পল্লবী গিয়ে থামবে।

এরপর না থেমে আগারগাঁও চলে যাবে। মাঝের স্টেশনগুলোতে ট্রেন থামানোর কার্যক্রম কিছু দিন পরে শুরু হবে। প্রতিটি স্টেশনে থামবে ৪৫ সেকেন্ডের জন্য। তবে পুরো সিডিউল এখনও চূড়ান্ত করা হয়নি।

১৮ ডিসেম্বর জাপানের উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জাইকা এবং মেট্রোরেলের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও পরামর্শকদের নিয়ে বৈঠক করে বিষয়টি ঠিক করার কথা রয়েছে মেট্রোরেল নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল)।

সরকার নির্ধারিত মেট্রোরেলের সর্বনিম্ন ভাড়া ২০ টাকা। প্রথম পর্যায়ে উত্তরা উত্তর স্টেশন থেকে আগারগাঁও স্টেশনের ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ৬০ টাকা।

এ ছাড়া উত্তরা উত্তর স্টেশন থেকে উত্তরা সেন্টার (মধ্য) ও উত্তরা দক্ষিণ স্টেশনের ভাড়া ২০ টাকা, উত্তরা উত্তর থেকে পল্লবী ও মিরপুর-১১ স্টেশনের ভাড়া ৩০ টাকা, মিরপুর-১০ ও কাজীপাড়া স্টেশনের ভাড়া ৪০ টাকা এবং শেওড়াপাড়া স্টেশনের ভাড়া ৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। আর পুরো রুট চালু হলে উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ভাড়া হবে ১০০ টাকা।

ডিএমটিসিএলের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, স্মার্ট কার্ডে ভাড়া পরিশোধ করলে ১০ শতাংশ ছাড় দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সাপ্তাহিক, মাসিক, পারিবারিক কার্ড আগে থেকে কিনতে হবে। মেট্রোরেলের প্রতিটি স্টেশনে থাকা যন্ত্রেও কার্ডে টাকা ভরা যাবে। প্ল্যাটফর্মে প্রবেশের সময় যাত্রীদের কার্ড পাঞ্চ করে দরজা খুলতে হবে।

একইভাবে নেমে যাওয়ার সময়ও কার্ড পাঞ্চ করতে হবে, তা না হলে দরজা খুলবে না। যারা প্রতিযাত্রায় টিকেট কিনতে চান তাদের স্টেশন থেকে নির্দিষ্ট গন্তব্যের ভাড়া দিয়ে এ কার্ড সংগ্রহ করতে হবে।

এটিও স্মার্ট কার্ডের মতো। ভাড়ার অতিরিক্ত যাতায়াত করলে ওই কার্ড দিয়ে দরজা খোলা যাবে না। সে ক্ষেত্রে দায়িত্বে থাকা কর্মীদের কাছে বাড়তি ভাড়া পরিশোধ করেই বের হতে হবে।

স্টেশনে টিকেট বিক্রির দুটি কাউন্টার থাকবে যার একটিতে সাধারণ মানুষ টিকেট কিনতে পারবেন। অন্যটিতে কেনার সুযোগ পাবেন শারীরিক ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ উদ্যোগে ‘বাঁচবে সময় বাঁচবে তেল, জ্যাম কমাবে মেট্রোরেল’-এ সেøাগানকে সামনে রেখে ২০১২ সালের ১৮ ডিসেম্বর সরকার এ প্রকল্প অনুমোদন করে। তখন মেয়াদকাল ছিল ২০১২ সালের জুলাই থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত।

২০১৬ সালের ২৬ জুন নির্মাণকাজ উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২১ হাজার ৯৮৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকার এই প্রকল্পে ১৬ হাজার ৫৯৪ কোটি টাকার আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে জাপানি উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা- জাইকা।

আর পাঁচ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা ব্যয় করছে সরকার। নির্মাণকাজের উদ্বোধনের প্রায় সাড়ে ৬ বছর পর আগামী ২৮ ডিসেম্বর মেট্রোরেলের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী।

ডিএমটিসিএল সূত্র জানিয়েছে, শেরেবাংলা নগরে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দুই হাজার অতিথিকে আমন্ত্রণ জানানো হবে। প্রধানমন্ত্রী প্রথম টিকেট কেটে মেট্রোরেলে চড়বেন।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মন্ত্রিসভার সদস্য, রাজনীতিবিদ, কূটনীতিক, সরকারি কর্মকর্তা ও ভারতের মেট্রোরেলের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাসহ বিশিষ্টজনকে অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানোর কথা রয়েছে।

ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এমএএন ছিদ্দিক জানান, সরকারের ব্যয় সংকোচন নীতির কারণে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাড়তি চাকচিক্য থাকবে না। তবে মেট্রোরেল চালুর মুহূর্ত স্মরণীয় করে রাখতে ভালো অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে।

তিনি বলেন, উত্তরা থেকে আগারগাঁও অংশের সব কাজ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। ১২টি ট্রেন চলাচলের জন্য প্রস্তুত করা হলেও শুরুতে ১০টিতে সরাসরি যাত্রী পরিবহন করা হবে। বাকি দুটি যে কোনো সময়ে চলাচলের জন্য ব্যাকআপ হিসেবে ডিপোতে প্রস্তুত থাকবে।

ট্রেন দুটি পরিচালনার জন্য কর্মকর্তারাও প্রস্তুত থাকবেন। এমএএন ছিদ্দিক বলেন, অন্যান্য দেশেও উদ্বোধনের পর প্রথম দিন থেকেই মেট্রোরেলে পরিপূর্ণভাবে যাত্রী পরিবহন করা হয় না।

তাই শুরুতে কয়েক মাস কম যাত্রী পরিবহন করা হবে। পরবর্তী ২ থেকে ৩ মাসের মধ্যে শতভাগ যাত্রী পরিবহন করা যাবে।

নিরাপত্তা ও নানা আনুষ্ঠানিকতার কারণে উদ্বোধনের দিন নির্ধারিত অতিথিদের বাইরে সাধারণ যাত্রীদের মেট্রোরেলে চড়ার সুযোগ থাকছে না বলেও জানান তিনি।

সংশ্লিষ্টরা জানান, আগারগাঁও থেকে মতিঝিল অংশ আগামী বছরের শেষ দিকে চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেল লাইন-৬ পুরোপুরি চালু হলে দৈনিক ৪ লাখ ৮৩ হাজার যাত্রী যাতায়াত করতে পারবে বলে জানিয়েছে ডিএমটিসিএল।

অবশ্য মেট্রোরেল কমলাপুর রেলস্টেশন পর্যন্ত ১ দশমিক ১৬ কিলোমিটার সম্প্রসারণ করা হবে। মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেল আগামী বছরের শেষ দিকে চালুর কথা রয়েছে। কমলাপুর পর্যন্ত চালু হতে ২০২৫ সাল লেগে যেতে পারে।

অন্যদিকে মেট্রোরেলের ভাড়া ঢাকায় চলাচলরত বাসের চেয়ে দ্বিগুণ হওয়ায় এই হারকে ‘অযৌক্তিক ও গণবিরোধী’ উল্লেখ করে ভাড়া ৫০ শতাংশ কমানো এবং সর্বনিম্ন ভাড়া ২০ টাকা থেকে কমিয়ে ১০ টাকা করার দাবি জানিয়েছে দুটি সংগঠন।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী শনিবার সংবাদ সম্মেলনে ঢাকার সঙ্গে ভারতের কলকাতা শহরের তুলনা করে বলেন, মাথাপিছু আয় ও গড় জিডিপি বিবেচনায় নিলে প্রায় সব সূচকে সমান অবস্থানে আছে।

কিন্তু কলকাতার মেট্রোরেলের তুলনায় ঢাকার মেট্রোরেলে কিলোমিটার প্রতি ভাড়া দ্বিগুণ এবং সর্বনিম্ন ভাড়া ৪ গুণ বাড়তি নির্ধারণ করা হয়েছে।

কলকাতায় মেট্রোরেলের সর্বনিম্ন ভাড়া ৫ রুপি বা ৬ টাকা। ঢাকায় মেট্রোরেলের সর্বনিম্ন ভাড়া ২০ টাকা। কলকাতায় মেট্রোরেলের সর্বোচ্চ ভাড়া ২৫ রুপি বা ৩১ টাকা। ঢাকায় মেট্রোরেলের সর্বোচ্চ ভাড়া ১০০ টাকা।

তিনি বলেন, এতে সামর্থ্যহীন সাধারণ যাত্রীরা মেট্রোরেল ব্যবহার করবে না। মেট্রোরেলে যাত্রী পরিবহনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ব্যাহত হবে। বেসরকারি লক্কড়-ঝক্কড় বাস কোম্পানি লাভবান হবে।

নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটির সভাপতি হাজি মো. শহীদ মিয়া ও সাধারণ সম্পাদক আশীষ কুমার দে এক বিবৃতিতে মেট্রোরেলের ভাড়া কিলোমিটার প্রতি আড়াই টাকা করা দাবি জানিয়ে বলেন, বেসরকারি বাসের সর্বনিম্ন ভাড়া যেখানে ১০ টাকা, সেখানে রেলের মতো রাষ্ট্রীয় পরিবহন সংস্থার দ্বিগুণ ভাড়া সম্পূর্ণ অন্যায্য, অনাকাক্সিক্ষত ও অগ্রহণযোগ্য।

এতে যেমন একদিকে সাধারণ জনগণের যাতায়াত ব্যয় বেড়ে যাবে, তেমনই অনদিকে বাস-মিনিবাসসহ বেসরকারি পরিবহন মালিকরা বেশি লাভবান হবেন।

তারা বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে পরিবহন ব্যয় অত্যধিক বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি ওষুধসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতির ফলে জনগণের জীবনযাত্রার ব্যয় ৪০ শতাংশেরও বেশি বেড়ে গেছে। স্বল্প ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে ঢাকায় বসবাসকারীদের সমস্যা আরও বেশি।

আ/ মাহাদী

সংবাদটি শেয়ার করুন....

আমাদের ফেসবুক পাতা

আজকের আবহাওয়া