কুয়াকাটা সৈকতের শ্বেত খঞ্জন

অক্টোবর ২৩ ২০২৬, ২১:১১

রাস্তায় যানবাহনের চাপ থাকায় সময়মতো বাস ছাড়তে পারল না। ফলে কুয়াকাটা পৌঁছাতেই দুই-আড়াই ঘণ্টা দেরি হয়ে গেল। এর পর হোটেলে উঠে ফ্রেশ হয়ে নাশতা সেরে লেম্বুর বনে পৌঁছতেই সকাল সাড়ে ১০টা বেজে গেল। কাজেই সকালের পাখি খোঁজার সেশন শেষ হয়ে গেল।

লেম্বুর বনে ঢোকার মুখে শুঁটকির দোকানগুলোর সামনে অটোভ্যান থেকে নেমেই দুটি কানিবককে সৈকতে মাছ শিকার করতে দেখলাম। বড় বড় ঢেউ বালুতটে আছড়ে পড়ছে, আর তার মাঝে মাছ শিকার করছে কানিবক। দারুণ এক দৃশ্য!

সমুদ্রের তীর ধরে হাঁটা শুরু করলাম। একপাশে সৈকত, সেখানকার বালতটে আছড়ে পড়ছে বড় বড় ঢেউ। অন্য পাশে কেওড়া, বাইন, টাইগার ফার্ন ইত্যাদির সমন্বয়ে বাদাবন। এ সময়টা বেশ কিছু প্রজাতির পন্থ-পরিযায়ী (Passage Migrants) পাখি কুয়াকাটা পার হয়ে তাদের শীতের আবাসে যায়, যেমন– লালপা তুরমতি (Amur Falcon), কাকঠুঁটো ফিঙে (Crow-billed Drong), পাকড়া দামা (Pied Thrush) ইত্যাদি। তাদের খোঁজেই মূলত এখানে আসা।

সৈকতে কানিবক ও ছোট সাদা বকের সঙ্গে কিছু বুনো পায়রা খাবার খেতে ব্যস্ত। এরই মধ্যে একটি সাদা-কালো ছোট পাখি লেজ নেড়ে হাঁটতে হাঁটতে পানির সামনে এসে দাঁড়াল। পানিতে তার প্রতিবিম্বটি এমনভাবে পড়ল, মনে হলো আয়নায় সে নিজের চেহারা দেখছে। চোখাচোখি হতেই দ্রুত হেঁটে ছোট্ট একটি মরা গাছের গোড়ায় প্যাঁচানো জালের ওপর গিয়ে দাঁড়াল। ক্যামেরায় ওর এই কীর্তিকলা ধারণ করতে এতটুকু সময় নিলাম না। সারাটা দিন খানিক পরপর সৈকতে পাখিটিকে দেখতে লাগলাম। গত ১৬ অক্টোবরের ঘটনা এটি।

কুয়াকাটা সৈকতে দেখা এই সাদা-কালো পাখিটি আর কেউ নয়, এ দেশের এক বহুল দৃশ্যমান পরিযায়ী পাখি শ্বেত বা সাদা খঞ্জন অথবা খঞ্জনা। White Wagtail তার ইংরেজি নাম। মোটাসিলিডি (Motacillidae) গোত্রের পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম Motacilla alba (মোটাসিলা অ্যালবা)। ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়াজুড়ে পাখিটি বিস্তৃত।
শ্বেত খঞ্জন ছোট আকারের পাখি। ঠোঁটের আগা থেকে লেজের ডগা পর্যন্ত দৈর্ঘ্য ১৮-১৯ সেন্টিমিটার। ওজন ২৩-২৪ গ্রাম। একনজরে দেহের পালক সাদা-কালো। স্ত্রী ও পুরুষের রঙে তেমন পার্থক্য নেই। প্রজননকালে প্রাপ্তবয়স্ক পাখির ঘাড়-গলা-বুক কালো হয়। কপাল ও গাল সাদা। কাঁধ-ঢাকনি ও পিঠ কালচে-ধূসর। দেহের পেছনের অংশ ও কোমর ছাই রং ধারণ করে। ডানার নিচের অংশ, পেট ও লেজের তলা সাদা। লম্বা ও সরু লেজটি কালচে।

প্রজননকাল বাদে বাকি সময় গলা ও মুখের বেশির ভাগ অংশ হয় সাদা। কোনো কোনো পাখির বুকে কালো ফিতা দেখা যায়। সব মৌসুমেই ঠোঁট কিছুটা বাদামি-কালো, চোখ বাদামি। পা, পায়ের পাতা ও নখ কালচে-বাদামি।

শীতকালে এ দেশের পাহাড়, নদী, নদীর পার, জলাভূমি, হ্রদ, আবাদি জমি ও লোকালয়ে দেখা যায়। সচরাচর একাকী, জোড়ায় বা বিচ্ছিন্ন দলে বিচরণ করে। পোকামাকড়, পিঁপড়া, শুয়াপোকা, গুবরে পোকা, ছারপোকা এবং অতি ক্ষুদ্র শামুকজাতীয় প্রাণী খায়। আকাশে ওড়ার সময় তীক্ষ্ণ কণ্ঠে ‘চি-চিপ … চি-চিপ … চি-চিপ …’ শব্দে ডাকে।
এপ্রিল-আগস্ট প্রজননকাল। এ সময় নিজেদের আবাসিক এলাকা, অর্থাৎ সাইবেরিয়া বা হিমালয়ের পানির ধার বা শিলার নিচে অথবা ঘাস-ঝোপ, নদীর পার বা দালানের ফাটলে শিকড়, শুকনো ঘাস বা পাতা দিয়ে ছোট বাটির মতো বাসা বানায়। ডিম পাড়ে চার থেকে ছয়টি। ঘিয়ে রঙের ডিমের ওপর হালকা নীলচে-সবুজ বা ফিরোজা রঙের ছিট থাকে। ডিম ফোটে ১১-১৬ দিনে। ছানারা প্রায় ১৬ দিনে উড়তে শিখে। আয়ুষ্কাল সচরাচর চার থেকে পাঁচ বছর। তবে কোনো কোনোটা এমনকি ১৩ বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারে।
লেখক: পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ

সংবাদটি শেয়ার করুন....

আমাদের ফেসবুক পাতা

আজকের আবহাওয়া