‘আমার বাবা ভালো বাবা, তাঁকে মিথ্যে অপবাদ দেওয়া হয়েছে’

সেপ্টেম্বর ২৯ ২০২৬, ০১:১৭

আমার বরিশাল ডেস্ক,
‘আমার বাবা ভালো বাবা, তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যে অপবাদ দেওয়া হয়েছে’ কথাগুলো বলতে বলতে আজও হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে বরিশালের উজিরপুরের বামরাইলের আলোচিত শিশুকন্যা তুবা বিনতে অরণি। বাবার সঙ্গে যেন আর কোনো অন্যায় না হয় এবং তিনি যেন সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে আবার ফিরে আসেন, এই কামনায় সোমবার দুপুরে বাবাকে তিন মাসের জন্য বিদায় জানিয়েছে ছোট্ট তুবা।

তুবার বাবা অনিক সরদারকে গত শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত চুরির অপবাদ দিয়ে বেঁধে রেখে মারধর করার অভিযোগ ওঠে স্থানীয় কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধে। ওই সময় হাত-পা বাঁধা বাবাকে নিজের হাতে চা ও রুটি খাওয়ায় শিশু তুবা। সেই হৃদয়বিদারক দৃশ্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে আলোচনার সৃষ্টি হয়।

পরবর্তীতে বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসনের নজরে এলে তারা তুবা ও তার পরিবারের পাশে দাঁড়ায়। তুবা বামরাইলের একটি স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী। বাবাকে মুক্ত করে আনার পর বিগত দুটি দিন তাকে আগলে রেখেছিল সে। তবে এবার সুস্থ জীবনের প্রত্যাশায় বাবার ফিরে আসার জন্য তাকে দীর্ঘ তিন মাস অপেক্ষা করতে হবে।

সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) দুপুরে স্থানীয় প্রশাসন ও সুশীল সমাজের সহায়তায় অনিক সরদারকে সার্বিক চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারে (মাদক নিরাময় কেন্দ্র) পাঠানো হয়েছে।

বাবার সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার স্মৃতিচারণ করে শিশু তুবা জানায়, ভোররাতে এক তরুণ বাড়িতে এসে তাঁর বাবাকে আটকে রাখার খবর দেয়। খবর পাওয়া মাত্রই সে, তার মা ও ছোট বোন স্যান্ডেল না পরেই ঘটনাস্থলে ছুটে যায়।

তুবা বলে, ‘আমি গিয়ে দেখি বাবাকে সবাই বেঁধে রেখে লাঠি দিয়ে পেটাচ্ছে এবং লাথি মারছে। তখন আমি তাঁদের পায়ে ধরে আকুতি জানিয়ে বলেছি, আমার বাবাকে আর মেরো না, বাবাকে তোমরা ছেড়ে দাও, বাবাকে এভাবে বেঁধে রেখো না।’

সে আরও বলে, ‘দেখতে পাই বাবার খুব ক্ষুধা লেগেছে। তখন একজন চা আর রুটি দিলে তা আমি বাবার মুখে তুলে দিই। অনেক অনুনয়-বিনয় করার পর তারা বাবাকে ছাড়ে। বাবাকে বাড়ি নিয়ে আসতে পেরে আমি কতটা আনন্দিত হয়েছিলাম, তা ভাষায় বোঝাতে পারব না। এখন বাবাকে যদি একটা কাজের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়, তবে আমরা সবাই মিলে ভালোভাবে বাঁচতে পারব।’

মেয়েটি দুঃখ প্রকাশ করে আরও বলে, ‘ভোররাত সাড়ে ৪টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত আমি আর আমার মা বাবাকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য কাকুতি-মিনতি করেছি। কিন্তু সেখানে থাকা কিছু লোক আমাদের নানাভাবে ঘুরিয়েছে। আমরা যে না খেয়ে সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম, সেটা কেউ ভাবেনি। ক্ষুধা লাগলেও আমি শেষ পর্যন্ত বাবার পাশেই বসে ছিলাম।’

তুবা জানায়, শুরুতে কিছু লোক তাঁদের স্বাক্ষর নিয়ে সেদিনই বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বলেছিল। পরদিনও গ্রামছাড়া করার ভয় দেখানো হয়। তবে পরবর্তীতে ইউএনও স্যার এবং পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আসার পর পরিস্থিতি শান্ত হয়। এখন আর কেউ তাদের ভয় দেখাচ্ছে না। তুবার আকুল আশা, তার বাবা সুস্থ হয়ে ফিরে এসে একটি কাজ পেলেই তাঁদের সব দুঃখ কেটে যাবে।

তুবার মা জান্নাত বেগম বলেন, ‘খবর পেয়ে আমরা দৌড়ে সেখানে যাই। তুবা স্যান্ডেল পরারও সময় পায়নি। ওর চোখের সামনে যখন ওর বাবাকে প্রহার করা হচ্ছিল, তখন ও চিৎকার করে কাঁদছিল আর বাবাকে না মারতে অনুরোধ করছিল। কিন্তু কেউ ওর কথায় কান দেয়নি, উল্টো অনেকে ভিডিও করে মজা নিচ্ছিল।’

চুরির অপবাদে নির্যাতনের শিকার অনিক সরদার দাবি করেন, পূর্বশত্রুতা ও ভিটেমাটির জমি নিয়ে বিরোধের জের ধরে তাঁর ওপর এই নির্যাতন চালানো হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমার কাছ থেকে চুরির কোনো মালামাল পাওয়া যায়নি, কেউ কোনো প্রমাণও দিতে পারেনি। একটি মহল চায় না আমি পৈতৃক ভিটায় বসবাস করি।’

তিনি আবেগপ্লুত হয়ে বলেন, ‘কোনো সন্তানই চায় না তার বাবা এমন নির্মম পরিস্থিতির শিকার হোক। আমার নিষ্পাপ মেয়েটি যখন আমাকে বাঁধা অবস্থায় মার খেতে দেখেছে, তখন আমার মরে যেতে ইচ্ছে করছিল। পৃথিবীর আর কোথাও এমন মর্মান্তিক দৃশ্য আছে কি না জানা নেই। আমি সবার ভালোবাসায় এবার একটি সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চাই।’

উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আলী সুজা জানান, ঘটনাটি জানতে পেরে রোববার তিনি তৌবাদের বাড়িতে যান এবং পরিবারের সার্বিক পরিস্থিতির খোঁজ নেন। অনিক সরদার শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ থাকায় তাঁর পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসার জন্য সোমবার দুপুরে তাঁকে নিরাময় কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। আগামী তিন মাসের মধ্যে তিনি সুস্থ হয়ে ফিরে আসবেন। এই সময়টুকুতে পরিবারটির সার্বিক খোরপোষ ও দায়িত্ব উপজেলা প্রশাসন বহন করবে।

অনিককে পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠানোর সময় উজিরপুর উপজেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি এস এম আলাউদ্দিন পরিবারটির হাতে নগদ সহায়তা তুলে দেন। ইউএনও মো. আলী সুজা আরও বলেন, ‘ঘটনাটিতে অপরাধের চেয়েও মানুষের হৃদয়ে বেশি দাগ কেটেছে বাবার প্রতি ছোট্ট একটি মেয়ের অকৃত্রিম ভালোবাসার ছবি।’

সংবাদটি শেয়ার করুন....