নদী দখল-দূষণে বাড়ছে হুমকি

সেপ্টেম্বর ২৮ ২০২৬, ০৩:৩৫

আমার বরিশাল ডেস্ক,
বাংলাদেশকে বলা হয় নদীমাতৃক দেশ। জালের মতো ছড়িয়ে থাকা হাজারো নদ-নদী এই বদ্বীপের ভৌগোলিক রূপ, আবহাওয়া, অর্থনীতি এবং সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রেখেছে যুগ যুগ ধরে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আজ অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দখলদারিত্ব এবং লাগামহীন দূষণের কারণে দেশের প্রায় প্রতিটি নদ-নদী এক চরম অস্তিত্ব সংকটের মুখে পতিত হয়েছে।

রাজধানী ঢাকার বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ কিংবা ধলেশ্বরীর মতো নদীগুলোর দিকে তাকালে আজ স্বচ্ছ জলের পরিবর্তে কেবল কালচে বিষাক্ত তরল ও পলিথিনের স্তূপ দেখতে পাওয়া যায়। নদী রক্ষায় নানা আইন ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ থাকার পরও মাঠপর্যায়ে তার কার্যকর বাস্তবায়ন না থাকায় এই সংকট আজ কেবল পরিবেশগত বিপর্যয়ে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা মানবজাতি ও জনস্বাস্থ্যের জন্য এক মারাত্মক ও বহুমুখী হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। নদী দখল ও দূষণের সবচেয়ে বড় এবং প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে জলজ প্রাণবৈচিত্র্যের ওপর।

দেশের শিল্পাঞ্চলগুলো থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার ঘনমিটার পরিশোধিত ও অপরিশোধিত রাসায়নিক বর্জ্য, টেক্সটাইল ডাইংয়ের বিষাক্ত তরল এবং ওষুধ কারখানার বর্জ্য সরাসরি দেশের প্রধান নদীগুলোতে নিক্ষিপ্ত হচ্ছে। এর পাশাপাশি প্রতিদিন চলাচলকারী হাজার হাজার নৌযান থেকে নিঃসৃত তেল ও মবিল পানির দ্রবীভূত অক্সিজেন মাত্রা বিপজ্জনকভাবে কমিয়ে দিচ্ছে। ফলস্বরূপ, নদীতে মাছসহ অন্যান্য জলজ প্রাণী আর টিকতে পারছে না।

আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, দূষিত নদীর মাছের নমুনায় সিসা, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম, পারদ ও নিকেলের মতো মারাত্মক ভারী ধাতুর উপস্থিতি মিলছে। আর খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে এই বিষাক্ত ভারী ধাতুগুলো মানুষের শরীরে প্রবেশ করে ক্যানসার, কিডনি জটিলতা, স্নায়ুরোগ এবং চর্মরোগের মতো ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।

নদীর এই করুণ দশা কেবল শারীরিক স্বাস্থ্যকেই বিপন্ন করছে না, বরং এটি উপকূলীয় ও নদীমাতৃক অঞ্চলের মানুষের সামাজিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও গভীর আঘাত হানছে। অপরিকল্পিত দখলএবং পলি জমে নদীগুলোর নাব্য হ্রাস পাওয়ার ফলে প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ নদীভাঙনের শিকার হয়ে নিঃস্ব হচ্ছে।

ভিটেমাটি হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হওয়া এসব মানুষের মধ্যে তীব্র মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও বিষণ্নতা লক্ষ্য করা যায়। অন্যদিকে, নদী শুকিয়ে যাওয়া বা দূষিত হওয়ার কারণে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের গ্রামীণ সংস্কৃতির ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ, নদীকেন্দ্রিক জীবিকা এবং নান্দনিক সৌন্দর্য। সমাজে বাড়ছে যান্ত্রিকতা ও মানসিক অস্থিরতা। জাতীয় নদী কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে নদী রয়েছে ১ হাজার ৮টি। কিন্তু পরিকল্পনা ও নজরদারির অভাবে এই বিপুল জলসম্পদ আজ অপূরণীয় ক্ষতির মুখে।

জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের বার্ষিক প্রতিবেদনে নদীদূষণের যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তা সত্যিই আতঙ্কজনক। ঢাকা ও এর চারপাশে ছড়িয়ে থাকা ১১টি প্রধান শিল্পাঞ্চল যেমন- টঙ্গী, মিরপুর, তেজগাঁও, শ্যামপুর, ডেমরা, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, গাজীপুর ও নরসিংদীর বিভিন্ন এলাকায় হাজার হাজার কারখানা গড়ে উঠেছে।

পরিশোধনবিহীন বর্জ্য: কমিশনের তথ্যমতে, প্রায় ৭ হাজার শিল্পকারখানার বর্জ্য পরিশোধনের (ইটিপি) কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। প্রতিদিন অন্তত ৬০ হাজার ঘনমিটার বিষাক্ত বর্জ্য (টেক্সটাইল, ডাইং, প্রিন্টিং ও ওষুধ শিল্পের তরল বর্জ্য) সরাসরি দেশের খাল ও নদ-নদীতে নিক্ষিপ্ত হচ্ছে। ট্যানারির ক্রোমিয়াম বিষ: ধলেশ্বরীসহ বিভিন্ন নদীতে সাভারের চামড়া শিল্পনগরী থেকে আসা ট্যানারির তরল বর্জ্য মেশার কারণে পানিতে উচ্চমাত্রার ক্রোমিয়াম পাওয়া গেছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক ঐবধষঃয বিভাগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, পানিতে থাকা এই ক্রোমিয়াম মানবদেহে মারাত্মক ক্যানসারের মতো রোগ সৃষ্টির অন্যতম অনুঘটক। নৌযান থেকে দূষণ: শিল্পকারখানার পাশাপাশি প্রতিদিন হাজার হাজার লঞ্চ, স্টিমার ও ইঞ্জিনচালিত নৌকা থেকে নিঃসৃত তেল, জ্বালানি ও তরল বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলায় পানির স্বাভাবিক অক্সিজেন লেভেল বা ডিও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

নদীদূষণের সবচেয়ে বড় বলি হচ্ছে জলজ প্রাণবৈচিত্র্য, বিশেষ করে মাছ। আন্তর্জাতিক গবেষক দল যাদের মধ্যে অস্ট্রেলিয়া, বাংলাদেশ ও চীনের বিজ্ঞানীরা অন্তর্ভুক্ত তাদের একটি গবেষণায় মেঘনা নদীর ১৫ প্রজাতির প্রধান মাছ (যেমন তেলাপিয়া, কই, কাতলা, রুই, পাবদা, লইট্টা ইত্যাদি) পরীক্ষা করে উদ্বেগজনক তথ্য পেয়েছেন।

গবেষণায় মাছের নমুনায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নির্ধারিত সীমার চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে লোহা, দস্তা, তামা, পারদ ও নিকেলের মতো ভারী ধাতুর উপস্থিতি ধরা পড়েছে। মানবদেহে খাদ্য হিসেবে এসব ভারী ধাতুযুক্ত মাছ নিয়মিত গ্রহণের ফলে স্নায়ুরোগ, কিডনি জটিলতা এবং অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হওয়ার তীব্র ঝুঁকি তৈরি হয়।

নদী ভাঙন এবং নদীর মৃত্যু কেবল অর্থনৈতিক বা শারীরিক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে না, এটি মানুষের মানসিক ও সাংস্কৃতিক শেকড়েও আঘাত করে। নদীভাঙনের মানসিক অভিঘাত: প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ নদীভাঙনের শিকার হয়ে সর্বস্বান্ত হয়। রাজশাহী ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের জরিপে দেখা গেছে, নদীভাঙনের শিকার বাস্তুচ্যুত মানুষের মধ্যে সাধারণ মানুষের তুলনায় তীব্র বিষণ্নতা, উদ্বেগ এবং মানসিক চাপ অনেক বেশি থাকে।

নান্দনিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষতি: নদী শুকিয়ে যাওয়া বা দখল হয়ে যাওয়ার ফলে হারিয়ে যাচ্ছে বাংলার ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ, নদীভ্রমণ ও গ্রামীণ উৎসব। নদী রক্ষা কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মনজুর আহমেদ চৌধুরী যথার্থই উল্লেখ করেছেন যে, নদীর নান্দনিক ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য হারিয়ে যাওয়ার অর্থ হলো সমাজে যান্ত্রিকতা, মানসিক অস্থিরতা এবং নান্দনিক শুষ্কতা বৃদ্ধি পাওয়া। মানবীয় মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষার্থে তাই নদীর স্বাভাবিক রূপ টিকিয়ে রাখা অত্যন্ত জরুরি।

পরিশেষে বলা যায়, নদীর দখল ও দূষণ কেবল পরিবেশগত বা সৌন্দর্যহানির কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি আমাদের সামগ্রিক জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি এবং অস্তিত্বের প্রশ্ন। ধলেশ্বরী, বুড়িগঙ্গা কিংবা শীতলক্ষ্যার দূষিত পানি এবং ভারী ধাতুযুক্ত মাছ আমাদের নীরবে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এমতাবস্থায় কেবল দিবস পালনের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থেকে, কলকারখানায় ইটিপির বাধ্যতামূলক ব্যবহার নিশ্চিতকরণ, অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে নদীগুলোকে বাঁচিয়ে তুলতে হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন....