স্থানীয় সরকার নির্বাচন: বিএনপির আরেক ‘এসিড টেস্ট’

আগস্ট ১০ ২০২৬, ০২:৪৬

আমার বরিশাল ডেস্ক,

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঐতিহাসিক বিজয়ের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ১৭ বছর পর রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরেছে বিএনপি। ক্ষমতার মসনদে বসার পর ‘হানিমুন পিরিয়ড’ কাটতে না কাটতেই দলটির সামনে এসে দাঁড়িয়েছে কঠিন রাজনৈতিক বাস্তবতা।
আর সেই বাস্তবতা হলো, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন।

দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে দেখা গেছে, জাতীয় নির্বাচনের পর অনুষ্ঠিত স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো ক্ষমতাসীন দলের জন্য অনেকটা সহজ জয়ের মাঠ হয়ে দাঁড়ায়।
কিন্তু এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। এই নির্বাচন শুধু প্রশাসনিক ক্ষমতার বিন্যাস নয়, বরং নতুন সরকারের জনপ্রিয়তা, মাঠপর্যায়ের রাজনৈতিক সক্ষমতা এবং জনগণের আস্থার প্রথম বড় ‘এসিড টেস্ট’।

রাষ্ট্রপরিচালনা, ভঙ্গুর অর্থনীতি মেরামত ও প্রশাসনিক নানা চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি দলের অভ্যন্তরীণ জটিল সমীকরণের মধ্যেই সরাসরি হাল ধরেছেন দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দীর্ঘ দেড় যুগের বেশি সময় ক্ষমতার বাইরে থেকে রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রাম শেষে সরকারে ফেরা বিএনপি এখন নিজেদের সাংগঠনিক ভিত নতুন করে সাজাতে কৌশলী ভূমিকা নিচ্ছে।

তারেক রহমানের তৃণমূল মিশন
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি চিরাচরিত ধারা হলো, সংসদ নির্বাচনে জয় পাওয়ার পর ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ থেকে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা কিছুটা শিথিল হয়ে পড়েন। ক্ষমতার মোহ ও প্রশাসনিক প্রভাববলয়ের ভেতরে ঢুকে অনেক সময় তারা জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবার সেই ধারার বিপরীতে হাঁটছেন।

দলের নীতিনির্ধারণী সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আসন্ন স্থানীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে তিনি কোনো ধরনের আত্মতুষ্টিতে ভুগতে রাজি নন। বরং দেশের বিভিন্ন বিভাগের নেতাদের সঙ্গে সরাসরি ও ধারাবাহিকভাবে ‘ঝটিকা বৈঠক’ করছেন তিনি।

সম্প্রতি রংপুর বিভাগের তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে এমনই একটি বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেই বৈঠকে তার কণ্ঠে রাজনৈতিক সতর্কতার স্পষ্ট সুর ছিল। ক্ষমতার দম্ভ যাতে কোনোভাবেই তৃণমূলকে গ্রাস করতে না পারে, সে বিষয়ে তিনি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।

বৈঠকে উপস্থিত থাকা বিএনপির একাধিক শীর্ষ নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারেক রহমান তার নির্দেশনায় কোনো ধরনের অস্পষ্টতা রাখেননি। তিনি পরিষ্কার ভাষায় তৃণমূলকে বার্তা দিয়েছেন, ‘কোনো প্রশাসনিক প্রভাব বা ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে ভোটে জেতার চেষ্টা দল বরদাশত করবে না। বিগত দিনে যারা রাজপথে জনগণের পাশে ছিল, রক্ত দিয়েছে, মামলা-হামলার শিকার হয়েছে, তাদের সেই ত্যাগের সুফলই এবার ঘরে তুলতে হবে। জনগণের মন জয় করাই বিএনপির একমাত্র ও মূল লক্ষ্য। প্রশাসন নয়, জনগণই হবে ক্ষমতার উৎস।’

বিগত বছরগুলোর রাজপথের আন্দোলনে দলটির ত্যাগকে পুঁজি করে এবং জনসম্পৃক্ততা বাড়িয়েই স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সাফল্য পাওয়ার নতুন রাজনৈতিক নকশা তৈরি করেছেন তিনি।

এই রাজনৈতিক বাস্তবতায় তারেক রহমানের পরিকল্পিত ‘তৃণমূল মিশন’ বিএনপিকে কতটা সুসংহত করতে পারে, অভ্যন্তরীণ কোন্দল কতটা মেটাতে পারে এবং ক্ষমতায় থেকেও সাধারণ মানুষের আস্থা কতটা ধরে রাখা সম্ভব, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। স্থানীয় সরকার নির্বাচনেই অনেকটা স্পষ্ট হবে তারেক রহমানের ‘জনগণই সর্বশক্তি’ নীতি কতটা কার্যকর হয়।

অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও নতুন চ্যালেঞ্জ
ক্ষমতায় আসার পর প্রথম পাঁচ মাসে বিএনপি সরকারকে বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে। রাষ্ট্রযন্ত্রে জমে থাকা বিগত সরকারের দুর্নীতি, প্রশাসনিক স্থবিরতা এবং বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ কারণে সৃষ্ট মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের মধ্যে কিছুটা অস্বস্তি তৈরি করেছে। এই নাগরিক অসন্তোষ যাতে আসন্ন স্থানীয় নির্বাচনে নেতিবাচক প্রভাব না ফেলে, সে বিষয়ে সরকার ও দল দুই পক্ষই সতর্ক।

সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার জায়গা দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকার কারণে তৃণমূলে বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে এক ধরনের রাজনৈতিক বঞ্চনা তৈরি হয়েছিল। ক্ষমতার পালাবদলের পর সেই বঞ্চনা এখন নেতৃত্বের প্রতিযোগিতায় রূপ নিয়েছে। কোথাও কোথাও তা প্রকাশ্য কোন্দলেও রূপ নিচ্ছে।

রংপুরসহ দেশের বেশ কয়েকটি বিভাগে পদ-পদবি দখল এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নকে কেন্দ্র করে উপদলাদলি ও গ্রুপিং প্রকট আকার ধারণ করেছে। দীর্ঘদিন যারা রাজপথে আন্দোলন করেছেন, তারা এখন স্থানীয়ভাবে নিজেদের অবস্থান প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছেন। ফলে একই এলাকায় একাধিক যোগ্য ও ত্যাগী প্রার্থী তৈরি হওয়া দলীয় হাইকমান্ডের জন্য মধুর হলেও কঠিন সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তবে তারেক রহমান অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিরসনে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। মাঠপর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে সরাসরি ভার্চ্যুয়াল ও মুখোমুখি কথোপকথনে তিনি ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করেছেন।

তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, দল তৃণমূলের মতামতের ভিত্তিতে যাকে চূড়ান্ত মনোনয়ন দেবে, তার বাইরে গিয়ে কেউ যদি ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে দাঁড়ান বা দলের মনোনীত প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিন্দুমাত্র ষড়যন্ত্র করেন, তবে তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ও কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এক্ষেত্রে প্রার্থীর অতীতের কোনো পরিচয় বা প্রভাব কাজে আসবে না।

‘ক্ষমতার অহংকার নয়, জনগণই সব’
বর্তমানে সাধারণ মানুষের প্রধান উদ্বেগের জায়গাগুলোর মধ্যে রয়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ঊর্ধ্বগতি ও জ্বালানি সংকট। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের ত্রুটির কারণে সৃষ্ট এই সংকট সাধারণ মানুষের মধ্যে যে ক্ষোভ তৈরি করছে, তা সরকার ও বিএনপির হাইকমান্ডও অনুধাবন করছে।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিএনপি বিশেষ জনসংযোগ কৌশল বা ‘পাবলিক রিলেশন স্ট্র্যাটেজিৎ তৈরি করেছে। এর অংশ হিসেবে তৃণমূল নেতাদের বেশ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

ডোর-টু-ডোর ক্যাম্পেইন: নেতাদের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত (এসি) কক্ষ ও বিলাসবহুল গাড়ি ছেড়ে সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সরকার গত পাঁচ মাসে বাজার নিয়ন্ত্রণে কী কী পদক্ষেপ নিয়েছে, বৈশ্বিক সংকটের কারণে কেন এই সমস্যা তৈরি হয়েছে এবং সরকার কীভাবে তা সমাধানের চেষ্টা করছে—এসব বিষয় সাধারণ মানুষকে বিনয়ের সঙ্গে বোঝাতে বলা হয়েছে।

‘জনগণই সব’ নীতি: ‘বিএনপি ফার্স্ট’ কিংবা ক্ষমতার অহংকার ঝেড়ে ফেলে রাজনীতির মূল কেন্দ্রে সাধারণ মানুষকে স্থান দেওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। সাধারণ মানুষের সঙ্গে কোনো ধরনের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ না করার নির্দেশনাও রয়েছে।

সরাসরি মনিটরিং সেল: স্থানীয় সংসদ সদস্য বা প্রভাবশালী নেতাদের কোনো আচরণ যাতে সাধারণ মানুষের মনে দল বা সরকারের প্রতি বিরূপ প্রভাব না ফেলে, সেজন্য কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে একটি বিশেষ মনিটরিং সেল গঠন করা হয়েছে। এই সেল সরাসরি তারেক রহমানের কাছে মাঠপর্যায়ের বাস্তব পরিস্থিতির প্রতিবেদন দেবে।

নির্বাচন কমিশন ও ভবিষ্যৎ রোডম্যাপ
একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ভূমিকাকেও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে ক্ষমতাসীন বিএনপি। অতীতে ক্ষমতাসীন দলগুলোর বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনকে প্রভাবিত করার অভিযোগ উঠেছে। এবার বিএনপি চাইছে ইসি সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করুক, যাতে নির্বাচনে বিএনপির জয় নিয়ে দেশে বা আন্তর্জাতিক মহলে কোনো প্রশ্ন না ওঠে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক গোলাম হাফিজ বাংলানিউজকে বলেন, এই স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুধু একটি গতানুগতিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়। এটি বিএনপির জন্য রাজনৈতিক নির্বাসন থেকে ফিরে নিজেদের গণতান্ত্রিক গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তার প্রমাণ দেওয়ার সবচেয়ে বড় মঞ্চ।

অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেছেন, একদিকে দীর্ঘদিনের মিত্র জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে বিএনপির চলমান রাজনৈতিক ও আদর্শিক দূরত্ব দিন দিন স্পষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে সাধারণ জনগণের আকাশচুম্বী প্রত্যাশার চাপ সরকারের কাঁধে। সব মিলিয়ে একটি জটিল রাজনৈতিক সমীকরণের সামনে দাঁড়িয়েছে বর্তমান ক্ষমতাসীন দলটি। জাতীয় নির্বাচনে জয়ী হয়ে তারা প্রমাণ করেছে যে দেশের বৃহত্তর জনমত তাদের পক্ষে। কিন্তু স্থানীয় সরকার নির্বাচনের অলিগলির রাজনীতি অনেক বেশি জটিল ও ব্যক্তি-কেন্দ্রিক।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেছেন, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে বিএনপি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। নির্বাচনে দলের পক্ষ থেকে একক প্রার্থী দেওয়া হবে। দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে কেউ প্রার্থী হলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন....