কীর্তনখোলা নদীর পাড় দখল করে চাঁদাবাজি
জুলাই ১৭ ২০২৬, ২০:০২
বরিশাল নগরীর কীর্তনখোলা নদীর পাড় দখল করে দীর্ঘদিন ধরে চাঁদাবাজি করছে একটি চক্র। বরিশাল সিটি করপোরেশন (বিসিসি) ও বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণ কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) জায়গা অবৈধভাবে দখল করে এরা গড়ে তুলেছে শতাধিক ভাসমান দোকান। এসব অবৈধ দোকান থেকে চাঁদা তুলছে তারা।
স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে সে দলের নাম বিক্রি করে এরা চাঁদাবাজি চালিয়ে যায়। এদিকে অবৈধ এসব দোকানপাটের জন্য চলাচলে ভোগান্তিতে পড়েন পথচারীরা। যানজট সৃষ্টি হচ্ছে প্রতিনিয়ত। অভিযোগ রয়েছে বিসিসি ও বিআইডব্লিঅউটিএ’র কিছু অসাধু কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে চলে এই ফুটপাত বাণিজ্য। স্থানীয়রা বলছেন, জনসাধারণের ভোগান্তি কমাতে এসব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা এখন সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে।
সরেজমিন দেখা যায়, নগরীর লঞ্চঘাট থেকে মুক্তিযোদ্ধা পার্ক পর্যন্ত কীর্তনখোলা নদীর পাড় দখল করে গড়ে উঠেছে শতাধিক দোকান। জনসাধারণের চলাচলের জায়গা দখল করে এসব দোকান এখন নগরবাসীর ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে বিআইডব্লিউটিএ’র জায়গায় স্থায়ী দোকান বসানোর কারণে বরিশাল সদর উপজেলাসহ কয়েকটি উপজেলার বাসিন্দাদের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে। চরকাউয়া খেয়াঘাট থেকে প্রতিদিন লাখো মানুষ যাতায়াত করেন।
নদীর পাড় দখল করে দোকান নির্মাণ করায় খেয়াঘাটে যেতে বিড়ম্বনায় পড়েন যাত্রীরা। বাকেরগঞ্জ উপজেলার দাঁড়িয়াল ইউনিয়নের বাসিন্দা মামুন খান বলেন, বরিশালের পূর্বাঞ্চলের মানুষদের চলাচলের জন্য শুধুমাত্র চরকাউয়া খেয়া পার হতে হয়। বছরখানেক ধরে খেয়াঘাট এলাকায় দোকান বসানোর কারণে দুর্ভোগ সৃষ্টি হচ্ছে। এ বিষয়টি বিসিসির নজরে আসা জরুরি। জর্ডন রোডের বাসিন্দা মোস্তাফিজুল আলম সজিব বলেন, লঞ্চঘাট থেকে ত্রিশ গোডাউন পর্যন্ত নগরবাসির চলাচলের জন্য রাস্তা করা হলেও বর্তমানে চিত্র ভিন্ন। এসব সরকারি জমি দখল করে একটি চক্র দোকান বসিয়ে চাঁদাবাজি চালিয়ে আসছে।
পাইকারি সবজি বিক্রেতা সিটি মার্কেটের ব্যবসায়ী রনি বলেন, বরিশালের এই পাইকারি মার্কেটে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ট্রাকে করে সবজি আনা হয়। এসব অবৈধ দোকানের জন্য প্রতিনিয়ত যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। একই অভিযোগ সিটি মার্কেট কাঁচা বাজারের আড়ৎদার লোকমান খাঁন, মাসুম খলিফা, আনোয়ার হোসেন, সজিব গাজী, জামাল মিয়া, সোহরাব হোসেন, শামীম গাজী, আক্তার, শহীদ, বাচ্চু হাওলাদারসহ অনেকের।
সিটি মার্কেট কাঁচা বাজারের শ্রমিক ইব্রাহিম সরদার বলেন, দোকান বসিয়ে রাস্তা দখল করে আবার ওপরে ত্রিপল দেওয়ার কারণে রাস্তা ছোট হয়ে গেছে। দুটি যানবাহন চলাচল করতে পারে না। ভারী মালামাল নামানোর সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা হতে পারে পথচারীদের। তাই এসব দোকান সরানো অতি জরুরি হয়ে পড়েছে।
এ বিষয়ে বিসিসির প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা মো. রায়হান উজ্জামান (সিনিয়র সহকারী সচিব) বলেন, আমি নিজে ওই স্থানে অভিযান করে বেশ কয়েকজনকে জরিমানা করেছি। আবারও বড় পরিসরে অবৈধ দোকান উচ্ছেদ অভিযান করা হবে। এদিকে বিআইডব্লিউটিএ’র কিছু অসাধু কর্মচারীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির টাকার ভাগ নেওয়ার অভিযোগ থাকলেও এ বিষয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হননি দপ্তরের কোনো কর্মকর্তা।
চরকাউয়া খেয়াঘাট এলাকার ভাসমান দোকানদার জালাল বলেন, প্রতিদিন মাসুম নামের একজন ১শ করে টাকা নেন দোকানপ্রতি। তবে যাদের দোকান বড় তাদের দেড়শ করে টাকা দিতে হয়। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নগরীর ১০নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা মাসুমই ভাসমান দোকানগুলো থেকে টাকা আদায় করেন। তবে চেষ্টা করেও মাসুমের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
একটি চক্রের চাঁদাবাজির বিষয়ে জানতে চাইলে বরিশাল মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব জিয়া উদ্দিন সিকদার বলেন, কেউ যদি দলের নাম ভাঙিয়ে কোনো অপকর্ম করে তার দায়ভার দল নেবে না। কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আল মামুন উল ইসলাম বলেন, চাঁদাবাজির বিষয়ে কোনো অভিযোগ পাইনি। লিখিত অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নদীতে চাঁদাবাজি, মামলার নির্দেশ, তদন্তে নেমেছে পুলিশ : এদিকে বরিশাল নগরীর ত্রিশ গোডাউনের কীর্তনখোলা নদীতে ট্রলার থেকে চাঁদাবাজি করতে দেখেন বরিশালের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এস এম শরিয়ত উল্লাহ। ভাড়ায়চালিত নৌকা ও ট্রলার থেকে অবৈধভাবে চাঁদা আদায় দেখে স্বপ্রণোদিত হয়ে মামলা করার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে বাদী (এজাহারকারী) করে সংশ্লিষ্ট বরিশাল মেট্রোপলিটন কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে এ মামলা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বুধবার বরিশালের অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম শরিয়ত উল্লাহ এ আদেশ দেন।
আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ১০ জুলাই বিচারক ঘটনাস্থলে অবস্থানকালে নদীর তীরে থাকা নৌকা ও ট্রলার থেকে অবৈধভাবে চাঁদা আদায় করতে দেখেন। সে সময় গোপনে চাঁদা আদায়ের একটি ভিডিও ধারণ করেন তিনি। পরে একাধিক মাঝির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সাঈম নামের এক ব্যক্তি তার প্রতিনিধিদের মাধ্যমে প্রতিদিন ত্রিশ গোডাউন এলাকার নৌকা ও ট্রলার থেকে ৫০ টাকা করে চাঁদা আদায় করছে। স্থানীয় মাঝিদের অভিযোগ, আগে কখনো এই এলাকায় এ ধরনের চাঁদা দিতে হয়নি। এই অবৈধ চাঁদা আদায়ের কারণে তারা যেমন হয়রানির শিকার হচ্ছেন, তেমনি এখানে ঘুরতে আসা পর্যটকদেরও অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
আদালত তার পর্যবেক্ষণে আরও উল্লেখ করেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ড গুরুতর আইন লঙ্ঘন এবং শাস্তিযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ। জনস্বার্থ ও ন্যায়বিচারের স্বার্থে এ বিষয়ে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। এ বিষয়ে কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আল মামুন উল ইসলাম বলেন, এখনো আদালতের নির্দেশনার কাগজ থানায় আসেনি। কাগজ আসা মাত্রই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
