চলতি ২০২৬ সালের জানুয়ারি-মার্চ সময়ে দেশে মাত্র ৭ কোটি ৮২ লাখ ৬০ হাজার মার্কিন ডলার নতুন ইক্যুইটি বিনিয়োগ এসেছে। অথচ একবছর আগেও একই সময়ে তার পরিমাণ ছিল ২৬ কোটি ৩৮ লাখ ৭০ হাজার ডলার। এক বছরের ব্যবধানে নতুন বিদেশি মূলধন প্রবাহ কমে গেছে প্রায় তিন-চতুর্থাংশ। একই সময়ে নতুন ইক্যুইটি, পুনঃবিনিয়োগকৃত লভ্যাংশ এবং আন্তঃকোম্পানি ঋণ মিলিয়ে মোট নিট এফডিআই দাঁড়িয়েছে ৪৪ কোটি ৭৩ লাখ ডলার, যা ২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকে ছিল ৭৯ কোটি ৬৬ লাখ ডলার। ফলে সামগ্রিক বিদেশি বিনিয়োগও প্রায় ৪৪ শতাংশ কমেছে। ব্যাংকিং খাত, অর্থনীতিবিদ এবং বিনিয়োগকারীদের সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দেশে মোট এফডিআইয়ের চেয়ে নতুন ইক্যুইটি বিনিয়োগ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তাতে নতুন বিদেশি উদ্যোক্তারা বাংলাদেশে নতুন কারখানা, শিল্প কিংবা ব্যবসায়িক প্রকল্পে অর্থ আনছেন কি না বোঝা যায়। আর আগে থেকেই ব্যবসা পরিচালনা করা বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো যদি তাদের লাভের একটি অংশ দেশে রেখে আবার বিনিয়োগ করলে সামগ্রিক বিনিয়োগের পরিমাণবাড়লেও নতুন বিদেশি উদ্যোক্তা আসার চিত্র প্রতিফলিত হয় না।
চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে পুনঃবিনিয়োগকৃত লভ্যাংশ বেড়ে ৩৪ কোটি ২৯ লাখ ডলারে পৌঁছেছে। যা আগের বছর ছিল ১৯ কোটি ১২ লাখ ডলার। মূলত পুরোনো বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকেই এদেশে মোট এফডিআইয়ের বড় অংশই এসেছে। নতুন বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে নয়।
সূত্র জানায়, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের আগে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কয়েকটি বিষয় সবচেয়ে বেশি বিবেচনায় নেয়। তার মধ্যে রয়েছে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নীতির ধারাবাহিকতা, মুদ্রার স্থিতিশীলতা, বৈদেশিক মুদ্রা সহজে দেশে ফেরত নেয়ার সুযোগ, ব্যাংকিং খাতের স্বাস্থ্য এবং আন্তর্জাতিক ঋণমান। ঋণমানকে একটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, নীতিগত স্থিতিশীলতা এবং বৈদেশিক দায় পরিশোধের সক্ষমতার প্রতিফলন হিসেবে দেখা হয়।
তাছাড়া অর্জিত মুনাফা সহজে নিজ দেশে পাঠানো যাবে কি না, বৈদেশিক মুদ্রা পাওয়া যাবে কি না তাও বিনিয়োগ সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রাখে। কিন্তু এদেশের ব্যাংকিং খাতে উচ্চ খেলাপি ঋণ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থাকে দুর্বল করছে। ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এদেশে নতুন ব্যবসা শুরু করতে আগ্রহ হারাচ্ছে। আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিংয়ের অবনতি এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। পরিস্থিতি উন্নত করতে আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা ও সংস্কার জরুরি।
সূত্র আরও জানায়, আন্তর্জাতিক মানের লজিস্টিক সুবিধা এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারলে বড় বিদেশি বিনিয়োগ এদেশে আগ্রহী হবে। কিন্তু বিদেশি বিনিয়োগের প্রধান বাধা দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা। দেশে এখনো ওয়ান-স্টপ সার্ভিস পুরোপুরি কার্যকর হয়নি; বরং এদেশে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় বেশি, অনুমোদন প্রক্রিয়া জটিল এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। এসব সমস্যা দূর না হলে বিদেশি বিনিয়োগে বড় পরিবর্তন আসবে না।
এ অবস্থায় শুধু বিদেশি নয়, দেশীয় বেসরকারি বিনিয়োগও বর্তমানে মন্থর হয়ে পড়ছে। স্থানীয় উদ্যোক্তারাও নতুন বিনিয়োগে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশ এখনো প্রশাসনিক জটিলতা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, জ্বালানি সংকট, উচ্চ ব্যবসা ব্যয় এবং নীতিগত অনিশ্চয়তার মতো দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি।
এদিকে অর্থনীতিবিদদের মতে, বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে শুধু প্রণোদনা বা কর ছাড়ই যথেষ্ট নয়। বিনিয়োগকারীরা এখন নীতির ধারাবাহিকতা, আইনের শাসন, দ্রুত প্রশাসনিক সেবা, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, দক্ষ অবকাঠামো, শক্তিশালী ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং সহজে মুনাফা প্রত্যাবাসনের নিশ্চয়তার ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়।
নতুন সরকার যদি অর্থনৈতিক সংস্কার, প্রশাসনিক জটিলতা দূরীকরণ, আর্থিক খাতের স্বচ্ছতা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে আগামী কয়েক বছরে বিদেশি বিনিয়োগের গতি আবারো বাড়বে। তা নাহলে পুনঃবিনিয়োগের ওপর নির্ভরশীল বর্তমান প্রবৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না এবং নতুন শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানও প্রত্যাশিত মাত্রায় এগোবে না।
