নানা সংকটেও টিকে আছে ‘শীতল পাটি’

জুলাই ০৫ ২০২৬, ১৬:৫১

আমার বরিশাল ডেস্ক,

একসময় ‘শীতল পাটির গ্রাম’ নামে দেশব্যাপী পরিচিত ছিল পিরোজপুরের কাউখালী উপজেলার সুবিদপুর গ্রাম। কচা নদীর তীরঘেঁষা এই গ্রামে এখনও শতাধিক কারিগরের হাতে বেঁচে আছে শত বছরের ঐতিহ্য। তবে প্লাস্টিক পণ্যের সহজলভ্যতা, কাঁচামালের সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে বসেছে এই ঐতিহ্যবাহী কুটিরশিল্প।

বর্তমানে মাত্র ৫০ থেকে ৬০টি পরিবার নানা সংকট ও সংগ্রামের মধ্যেও পূর্বপুরুষের এই পেশা আঁকড়ে ধরে টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।

সরেজমিনে সুবিদপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, নারী-পুরুষ সবাই শীতল পাটি বুনন, পাইত্রা প্রস্তুত ও নকশার কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। এসময় তারা অভিযোগ করেন, কাঁচামাল ‘পাইত্রা’র তীব্র সংকট এবং মূল্যবৃদ্ধির কারণে উৎপাদন ব্যয় কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। অন্যদিকে প্লাস্টিকজাত পণ্যের সহজলভ্যতা ও তুলনামূলক কম দামের কারণে শীতল পাটির চাহিদা আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

সুবিদপুর গ্রামের কারিগর সজল দে (৫০) বলেন, ‘কয়েকশ বছর ধরে আমাদের পরিবার এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত। একসময় কয়েকশ পরিবার শীতল পাটি তৈরি করত। এখন চাহিদা কমে যাওয়ায় অনেকেই পেশা বদল করেছেন।’

আশি বছর বয়সী অনিল চন্দ্র পাটিকর বলেন, ‘একসময় দেশ-বিদেশ থেকে মানুষ এই শিল্প দেখতে আসত। অনেক রাষ্ট্রদূতও এসেছেন। সবাই সহযোগিতার আশ্বাস দিলেও বাস্তবে কোনো সহায়তা পাইনি। সরকার যদি বিশেষ প্রণোদনা দিত, তাহলে এই শিল্প আবারও আগের অবস্থানে ফিরতে পারত।’

কারিগর আরতি রানী (৪৫) বলেন, ‘শুধু শীতল পাটি বিক্রি করে এখন সংসার চালানো খুব কঠিন। কাঁচামালের দাম বেড়েছে, ন্যায্যমূল্যও পাওয়া যায় না। তাই অনেক পরিবার মানবেতর জীবনযাপন করছে। তারপরও আমরা ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা করছি।’

এদিকে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সুবিদপুর গ্রামের কারিগররা পাটি দিয়ে শুধু শীতল
পাটি তৈরী করছে না, বরং পাটি দিয়ে টিস্যু বক্স, পেন্সিল হোল্ডার, ব্যাগ, ওয়ালম্যাট, ট্রে, ল্যাম্পশেড, পাখির বাসা, ডাইনিং ম্যাটসহ ৪০টিরও বেশি নান্দনিক ও ব্যবহারিক পণ্য তৈরি করছেন। এতে দেশের পাশাপাশি বিদেশেও নতুন বাজারের সম্ভাবনাও সৃষ্টি হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, ইউনেস্কোর স্বীকৃতি পাওয়ার পরও শিল্পটির উন্নয়নে দৃশ্যমান কোন পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। যে কারণে কালের পরিক্রমায় হারিয়ে যেতে পারে দেশের সংস্কৃতি ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ শীতল পাটি।

দি পিরোজপুর চেম্বার অব কমার্স এড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি গাজী ওয়াহিদুজ্জামান লাভলু বলেন, রাজধানীসহ দেশের বড় শহরগুলোতে প্রদর্শনী ও স্থায়ী বিক্রয়কেন্দ্র স্থাপন, সহজ শর্তে ঋণ প্রদান, কারিগরদের প্রশিক্ষণ এবং কাঁচামাল সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে হারিয়ে যেতে বসা এই শিল্প নতুন করে ঘুরে দাঁড়াতে পারে। একই সঙ্গে রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেরও সম্ভাবনা রয়েছে।

বিসিক পিরোজপুরের ভারপ্রাপ্ত উপব্যবস্থাপক এইচ. এম. ফাইজুর রহমান বলেন, ‘প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ, কাঁচামাল সরবরাহ এবং বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ সৃষ্টি করা গেলে সুবিদপুরের শীতল পাটি শিল্প দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবে।’

কয়েক প্রজন্মের শ্রম, দক্ষতা ও ঐতিহ্যের ধারক সুবিদপুরের শীতল পাটি শিল্প আজ অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই করছে। যথাযথ সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ নেওয়া না হলে শুধু কয়েকটি পরিবারের জীবিকাই নয়, বাংলার একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যও একদিন হারিয়ে যেতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন....