চার মেগা প্রকল্পের দাবিতে উত্তাল দক্ষিণাঞ্চল
জুন ২৮ ২০২৬, ০৪:০২
আরিফ আহমেদ, বিশেষ প্রতিবেদক ॥ ভাঙা থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত ৬ লেন মহাসড়ক, ভোলা-বরিশাল সরাসরি যোগাযোগের জন্য লাহারহাটে সেতু, দক্ষিণাঞ্চলে পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ এবং বরিশালে রপ্তানিমুখী শিল্পাঞ্চল (ইপিজেড) প্রতিষ্ঠার দাবিতে গত প্রায় দুইবছর ধরে ধারাবাহিক আন্দোলন করে আসছেন বিভাগের ৬ জেলার মানুষ। ইতিমধ্যে ইপিজেড নির্মাণ বিষয়ে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হলেও অন্য বিষয়গুলো উপেক্ষিত রয়ে গেছে। যে কারণে ব্যবসায়ী, পেশাজীবী, শিক্ষার্থী, রাজনৈতিক নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এসব দাবিতে একাধিকবার মানববন্ধন, স্মারকলিপি, গণসমাবেশ ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছেন। আন্দোলনকারীদের দাবি, বরিশাল অঞ্চলের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সংসদ সদস্যরা বিভিন্ন সময় প্রকাশ্যে এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
সর্বশেষ জাতীয় সংসদের চলতি বাজেট অধিবেশনেও বরিশাল অঞ্চলের একাধিক সংসদ সদস্য ভাঙা-কুয়াকাটা ৬ লেন মহাসড়ক, ভোলা-বরিশাল সেতু, পাইপলাইনে গ্যাস এবং ইপিজেড প্রতিষ্ঠার দাবি উত্থাপন করেন। কিন্তু সম্প্রতি ঘোষিত জাতীয় বাজেটে এসব প্রকল্পের জন্য কোনো নতুন বরাদ্দ বা বাস্তবায়নের সুস্পষ্ট ঘোষণা না থাকায় দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প অনুমোদনের তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে অনুমোদিত উন্নয়ন প্রকল্পের সিংহভাগ বরাদ্দ দেশের অন্যান্য অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত হলেও বরিশাল বিভাগের অংশ তুলনামূলকভাবে অত্যন্ত কম। এতে দেখা গেছে বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অনুসরণেই বরিশাল অঞ্চলের জন্য কোনো মেগা প্রকল্প নেওয়া হয়নি।
অন্যদিকে চট্টগ্রামের জন্য একনেক সভায় সাড়ে ১১ হাজার কোটি টাকার বেশি মূল্যের বড় বড় মেগা প্রকল্প অনুমোদন পেলেও বরিশালের দীর্ঘদিনের দাবি ভোলা-বরিশাল সেতু কিংবা ঢাকা-বরিশাল ৬ লেন মহাসড়ক প্রকল্পের কাজ থমকে আছে।
বন্দর ও শিল্পনগরী হওয়ার কারণে সরকারকে চট্টগ্রামে বিপুল অর্থ ঢালতে হচ্ছে। বরিশালে পায়রা বন্দর থাকা স্বত্বেও কৃষি ও নদীমাতৃক অঞ্চল হওয়ায় সেখানে শুধু ছোট আকারের সুরক্ষা প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে যা অঙ্কের হিসাবে খুব কম।
নগর চিন্তাবিদরা মনে করছেন, মোট বাজেটের মাত্র ০.৮৬% বরাদ্দ পাওয়ায় বরিশালের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক জীবনযাত্রার মান অন্যান্য উন্নত অঞ্চলের চেয়ে অনেক পিছিয়ে পড়ছে। বাজেট বরাদ্দের এই পরিসংখ্যানটি স্পষ্ট করে যে, কৌশলগত কারণে চট্টগ্রাম অগ্রাধিকার পেলেও বরিশালের মতো প্রান্তিক অঞ্চলগুলো মারাত্মকভাবে বাজেট বৈষম্যের শিকার হচ্ছে।
আর এই পরিসংখ্যানই দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন বৈষম্যের অভিযোগকে নতুন করে সামনে এনেছে।
এর প্রতিবাদে শুক্রবার জুমার নামাজের পর বরিশাল-পটুয়াখালী মহাসড়কসহ বিভাগের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ভুরঘাটা থেকে ইল্লা, বরিশাল নগরীর চৌমাথা থেকে রূপাতলী এবং পটুয়াখালী থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় প্ল্যাকার্ড ও দাবিসংবলিত ফেস্টুন হাতে মহাসড়কের পাশে অবস্থান নেন হাজার হাজার মানুষ। আন্দোলনকারীদের স্লোগান ছিল- “দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নে বৈষম্য বন্ধ করতে হবে”,
“চার মেগা প্রকল্প এখনই বাস্তবায়ন করতে হবে।”
মানববন্ধনে অংশ নিয়ে পটুয়াখালীর তামজিদ হাসান বলেন, “বরিশাল বিভাগ থেকে বর্তমানে পাঁচজন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করছেন। জাতীয় সংসদেও আমাদের জনপ্রতিনিধিরা একাধিকবার ভাঙা থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত ৬ লেন মহাসড়কের দাবি তুলেছেন। এটি কোনো বিলাসিতা নয়, দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের ন্যায্য অধিকার। আমরা ভিক্ষা চাই না, আমাদের প্রাপ্য উন্নয়ন চাই। ৬ লেন মহাসড়ক এখন সময়ের দাবি।”
নগরীর চৌমাথায় আন্দোলনকারী সাজ্জাদ রহমান বলেন, “বরিশালের মানুষ বারবার ভোট দিয়ে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত করেছে। কিন্তু বাজেটে বরিশাল কী পেল? দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বড় বড় প্রকল্প এগিয়ে গেলেও দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের বহুদিনের দাবিগুলো আবারও উপেক্ষিত হয়েছে। এই বৈষম্যের অবসান চাই।”
আন্দোলনকারীরা বলেন, পদ্মা সেতু চালুর পর দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হলেও ভাঙা-কুয়াকাটা মহাসড়ক এখনও সংকীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ। একইভাবে ভোলা-বরিশাল সরাসরি সেতু নির্মিত হলে নদীবেষ্টিত দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত হলে শিল্পায়নের নতুন দুয়ার খুলবে এবং ইপিজেড প্রতিষ্ঠা হলে হাজার হাজার তরুণ-তরুণীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। অথচ বছরের পর বছর ধরে এসব প্রকল্প কেবল প্রতিশ্রুতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।
এ বিষয়ে বরিশাল চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি এবায়দুল হক চাঁন বলেন, “বাজেট ঘোষণার অনেক আগে থেকেই ব্যবসায়ী সমাজ ও সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে ভাঙা-কুয়াকাটা ৬ লেন মহাসড়ক, ভোলা-বরিশাল সেতু, পাইপলাইনে গ্যাস এবং ইপিজেড স্থাপনের দাবি জানিয়ে আসছি। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতিতে আমূল পরিবর্তন আসবে। তারপরও এবারের বাজেটে এসব বিষয়ে কোনো বরাদ্দ না থাকায় আমরা হতাশ। কেন বরিশালকে আবারও উপেক্ষা করা হলো- এ প্রশ্ন এখন পুরো দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের।”
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, কৃষি, মৎস্য, পর্যটন, নৌপরিবহন ও সমুদ্র অর্থনীতিতে দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় অঞ্চল হওয়া সত্ত্বেও বরিশাল বিভাগ এখনও অবকাঠামোগত বিনিয়োগে পিছিয়ে রয়েছে। তাদের দাবি, এই বৈষম্য দূর করতে আগামী সংশোধিত বাজেট কিংবা নতুন অর্থবছরের উন্নয়ন কর্মসূচিতে ভাঙা-কুয়াকাটা ছয় লেন মহাসড়ক, ভোলা-বরিশাল সেতু, পাইপলাইনে গ্যাস সংযোগ এবং বরিশালে ইপিজেড প্রতিষ্ঠার জন্য পৃথক বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে।
মানববন্ধন থেকে বক্তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, অবিলম্বে এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের রোডম্যাপ ঘোষণা না করা হলে বরিশাল বিভাগের ৬ জেলায় বৃহত্তর আন্দোলনের কর্মসূচি দেওয়া হবে।
শুধু রাজপথেই নয়, জাতীয় সংসদেও দক্ষিণাঞ্চলের চার মেগা প্রকল্পের দাবিটি জোরালোভাবে উত্থাপিত হয়েছে। বাজেট অধিবেশনে বরিশাল-৫ আসনের সংসদ সদস্য মজিবর রহমান সরোয়ার ভাঙা-কুয়াকাটা ৬ লেন মহাসড়ক, ভোলা-বরিশাল সংযোগ সেতু এবং ভোলার গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে বরিশালে আনার দাবি তুলে ধরেন। এর আগে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সংসদ সদস্যরাও দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগ ও জ্বালানি অবকাঠামো উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে একই ধরনের দাবি জানান।
