পাবলিক টয়লেট নেই বরিশালের বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে!

জুন ১১ ২০২৬, ০৩:২২

আমার বরিশাল ডেস্ক,

আরিফ আহমেদ, বিশেষ প্রতিবেদক ॥ প্রতিদিন গড়ে চার থেকে পাঁচ হাজার মানুষের ভীড় বরিশালের কীর্তনখোলা নদী তীরবর্তী এলাকায়। বিশেষ করে ত্রিশ গোডাউন ও মুক্তিযোদ্ধা পার্ক ঘীরে সকাল থেকেই বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষের ভীড় চোখে পড়ে। দূর দূরান্ত থেকে আসা নারী-পুরুষ ও শিক্ষার্থীদের সংখ্যাই বেশি।

শিক্ষার্থীদের বেশিরভাগ যদিও স্কুল ফাঁকি দিয়ে সময় পার করে এই নদী তীরবর্তী এলাকায়। তবে শুধু শিক্ষার্থী নয়, অসংখ্য দর্শনার্থী নারী-পুরুষ ও শিশুদের নিয়ে সকাল থেকেই রাত আটটা পর্যন্ত এই নদী তীরবর্তী এলাকায় কাটান বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দারা। যে কারণে ৩০ গোডাউন ও মুক্তিযোদ্ধা পার্কে একটি করে অত্যাধুনিক পাবলিক টয়লেট খুবই জরুরী বলে মনে করেন দর্শনার্থী ও এলাকাবাসী ।

ত্রিশ গোডাউন এলাকার সড়ক ও আশেপাশের সৌন্দর্য আগের তুলনায় অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে দাবী করে পটুয়াখালী বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী বলেন, আমরা প্রয়োজনীয় উপকরণ কিনতে বরিশালে এসেছি। আমাদের বাস ঠিক তিনটায় ছেড়ে যাবে। কেনাকাটা শেষে মুক্তিযোদ্ধা পার্কের ভিতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ত্রিশ গোডাউনের এই সাইলো সীমানায় এসে দাঁড়িয়েছি। কেডিসি থেকে নদী তীরবর্তী কোনো সড়ক না থাকায় কিছুটা সমস্যা হয়েছে। চাঁদমারি ঘুরে পুনরায় ভাঙা বা অসমাপ্ত একটা ব্রীজ পার হয়ে এই ত্রিশ গোডাউন সড়ক শুরু হয়েছে। এখানে এসে  চমৎকার একটা অনুভূতি। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে পথে কোথাও পাবলিক টয়লেট খুঁজে পেলাম না।

ত্রিশ গোডাউন এলাকার জমি জেলা প্রশাসনের এবং নদী এলাকা নৌ বন্দর কর্তৃপক্ষের হলেও এখানে স্থাপনা নির্মাণ ও নাগরিক সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করার দায়িত্ব বরিশাল সিটি করপোরেশনের বলে জানালেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সালমা পারভিন। তিনি বলেন, এখানে একটি পাবলিক টয়লেট স্থাপন করার মূল আইনি ও নির্বাহী দায়িত্ব বরিশাল সিটি কর্পোরেশন (বিসিসি)-এর। নাগরিক সুবিধা ও বিনোদন কেন্দ্রগুলোর আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে গণশৌচাগার নির্মাণ করা সিটি কর্পোরেশনের অন্যতম প্রধান সংবিধিবদ্ধ দায়িত্ব। তবে সিটি কর্পোরেশন জানিয়েছে এখানে তাদের জমি নেই। জেলা প্রশাসন থেকে জমি দেয়া হলে জনসাধারণের সুবিধার্থে অবশ্যই ত্রিশ গোডাউশন এলাকায় পাবলিক টয়লেট নির্মাণ করা হবে।

প্রায় একই কথা বলেন, পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া থেকে আসা সাংবাদিক সুমন বেপারী ও শিক্ষক আবুল কালাম আজাদ। তারা দুজনেই পরিবারসহ এসেছেন ডাক্তার দেখাতে। প্যাথলজি পরীক্ষার পর অপেক্ষার সময় কাটাতে এসে বসেছেন ত্রিশ গোডাউন এলাকার নদীর পাড়ে। বললেন, আমরা পুরুষরা না-হয় যেকোনো উপায়ে টয়লেটের কাজ সারতে পারি, কিন্তু মেয়েরা কি করবে? এ বিষয়টি প্রশাসনের মাথায় রাখা উচিত। নদী তীরবর্তী মুক্তিযোদ্ধা পার্ক ও ত্রিশ গোডাউন এলাকায় অন্তত দুটো পাবলিক টয়লেট জরুরী প্রয়োজন। আর সঠিক যতœ পেলে এই পাবলিক টয়লেট প্রশাসনের আয়ের উৎস হবে বলে জানান তারা।

এসময় আবুল কালাম আজাদ বলেন, মুক্তিযোদ্ধা পার্কের ভিতর একটি পাবলিক টয়লেট রয়েছে। যা পরিত্যক্ত। ওটি সংস্কার ও ব্যবহার উপযোগী করে তোলা খুবই সহজ। ত্রিশ গোডাউন এলাকার বাসিন্দারা বলেন, এখানে পাবলিক টয়লেট না থাকায় ঘুরতে আসা দর্শনার্থীরা আমাদের বিরক্ত করে। একদিন দু’দিন এটা সহ্য করা যায়, তাই বলে প্রতিদিনতো এটা সহ্য করবো না। ত্রিশ গোডাউন এলাকার দায়িত্ব সরকারের। এটি নিয়ে সরকারকেই চিন্তা করতে হবে বলে জানান তারা।

বরিশাল সিটি করপোরেশনের ৫৮ বর্গ কিলোমিটার এলাকায় ১০/১২টি পাবলিক টয়লেট থাকলেও বেশিরভাগই বন্ধ বা বেদখল হয়ে আছে। কোনটি আবার ব্যবহার অনুপযোগী হবার পরেও ইজারা দেওয়া হয়েছে। এসব পাবলিক টয়লেট রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবহার উপযোগী করা হলে আয়ের উৎস যেমন বাড়তে পারে তেমনি সুপরিকল্পিত পদক্ষেপে এগুলো থেকে উৎপাদন হতে পারে নিজস্ব বায়োগ্যাস। যা ব্যবহার করে নির্দিষ্ট এলাকা বা মার্কেটে বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব বলে মতামত দিয়েছেন নগর চিন্তাবিদদের অনেকেই। যদিও নগরীতে কতগুলো পাবলিক টয়লেট রয়েছে তা বরিশাল সিটি করপোরেশন (বিসিসি) কর্তৃপক্ষের কেউই সঠিক তথ্য দিতে পারেননি।

তবে গত ১০ জুন বুধবার নগরী ঘুরে ও অনুসন্ধানে বরিশালের মুক্তিযোদ্ধা পার্ক ও চরকাউয়া খেয়াঘাট সংলগ্ন দুটি পাবলিক টয়লেট তালাবদ্ধ এবং অযতœ অবহেলায় ভঙ্গুর অবস্থায় দেখা গেছে। বেলস পার্ক ও স্বাধীনতা পার্কে একটি করে পাবলিক টয়লেট থাকলেও সেটিও কোনোভাবে জোড়াতালি দিয়ে ব্যবহার উপযোগী করা হয়েছে। শুধুমাত্র নথুল্লাবাদ, রূপাতলী ও ছোট লঞ্চঘাট সংলগ্ন বহু পুরাতন পাবলিক টয়লেটটির যথাযথ ব্যবহার চোখে পড়ে। আর এই তিনটি নিয়মিত ইজারা দেওয়া হয়। তবে বলাবাহুল্য যে, ছোট লঞ্চঘাটের এই পাবলিক টয়লেটটি অনেক পুরাতন এবং জরাজীর্ণ দশা। ঝুঁকিপূর্ণ হলেও সম্প্রতি এটির ইজারা দেওয়া হয়েছে প্রায় পাঁচ লাখ টাকায়। ইজারাদার আব্দুস সোবহান। তবে এটির ভিতরের দরজা, জানালা ভাঙ্গাচুরা হলেও নিয়মিত পরিষ্কার রাখা হয়েছে।

সোবহান  জানান, ছোট লঞ্চঘাটের এই পাবলিক টয়লেটটি গোলাম মাওলার সময়ে তৈরি। এর ব্যবহার আগের চেয়ে অনেক বাড়লেও আকার আকৃতি বাড়েনি।
বিষয়টির সমর্থনে তথ্য দিলেন নগর চিন্তাবিদ কাজী মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, পার্কে অনেক মানুষের উপস্থিতি থাকে সবসময়। বিশেষ করে শুক্র ও শনিবার বন্ধের দিনে বিভিন্ন সংগঠন পার্কে অনুষ্ঠান করে। মুক্তিযোদ্ধা পার্ক ও  বেলস পার্কে পাবলিক টয়লেট থাকার পরও তা ব্যবহার করা যায়না এটা কষ্টদায়ক। পরিকল্পিত নগরায়নে পাবলিক টয়লেট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বেকারত্ব দূর করতে পারে। ঢাকায় এখন সেটা প্রমাণিত হয়েছে বলে জানান কাজী মিজানুর রহমান।

সংবাদটি শেয়ার করুন....