পাশাপাশি কবরে শায়িত হলেন স্বামী-স্ত্রী ও তিন সন্তান

মে ১৮ ২০২৬, ১৮:৩২

আমার বরিশাল ডেস্ক,

কোরবানির ঈদে বাড়ি ফিরে নতুন ঘরের কাজ শেষ করার কথা ছিল কালাম মিয়ার। ইচ্ছা ছিল, বাকি জীবনটা স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে কাটাবেন নিজের গ্রামেই। কালাম মিয়া গ্রামে ফিরলেন ঠিকই, তবে জীবিত নয়, লাশ হয়ে। আর তার সঙ্গে ফিরল পুরো পরিবারের আরও চারটি লাশ। নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় গ্যাস লিকেজ বিস্ফোরণের নির্মম আগুনে দগ্ধ হয়ে এক সপ্তাহের ব্যবধানে নিভে গেছে একটি পরিবারের সবকটি প্রাণ। শনিবার (১৬ মে) পটুয়াখালীর বাউফলে পাশাপাশি পাঁচটি কবরে শায়িত হলেন স্বামী, স্ত্রী ও তাদের তিন সন্তান।

শনিবার (১৬ মে) সকালে মা ও তিন সন্তানের মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্সটি যখন বাউফলের কাড়াল বাড়ির উঠানে এসে থামে, তখন পুরো এলাকায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। স্বজনদের আহাজারি আর প্রতিবেশীদের চোখের পানিতে ভারী হয়ে ওঠে চারপাশ।

এর আগে সোমবার (১১ মে) সকালে দাফন করা হয়েছিল পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি কালাম মিয়াকে (৫০)। আজ সকাল ১০টায় জানাজা শেষে তার কবরের ঠিক পাশেই শায়িত করা হলো স্ত্রী সালমা বেগম (৪০), একমাত্র ছেলে মুন্না (১২), দুই মেয়ে মুন্নী (৯) ও সাত বছরের শিশু কথাকে। একই সারিতে পাশাপাশি পাঁচটি তাজা কবরের দিকে তাকিয়ে নির্বাক দাঁড়িয়ে ছিলেন জানাজায় অংশ নেওয়া শত শত মানুষ।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, কালাম মিয়া দীর্ঘ ২০ থেকে ২২ বছর ধরে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার সাইনবোর্ড এলাকায় কাঁচামালের ব্যবসা করতেন। স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে ভুইগড় এলাকার একটি ১০ তলা ভবনের নিচতলার দুটি কক্ষে ভাড়া থাকতেন তিনি।

রোববার (১০ মে) সকাল ৬টার দিকে কালাম মিয়া রান্নাঘরে গ্যাসের চুলায় তরকারি গরম করতে যান। তখন স্ত্রী ও সন্তানরা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলেন। ঘরটিতে আগে থেকেই জমে থাকা লিকেজ গ্যাস দেশলাইয়ের সংস্পর্শে আসতেই বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হয়। মুহূর্তের মধ্যে আগুন পুরো ঘরে ছড়িয়ে পড়ে।

জ্বলন্ত আগুনের মাঝেই বাবা কালাম মিয়া ঘরের দরজা খুলে দগ্ধ ছেলে মুন্নাকে বাইরে বের করে দিতে পেরেছিলেন। কিন্তু ততক্ষণে আগুনের লেলিহান শিখা কামালের স্ত্রী ও দুই কন্যাসন্তানসহ সবাইকে নির্মমভাবে গ্রাস করে নেয়। পরে স্থানীয় বাসিন্দা ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা তাদের উদ্ধার করে দ্রুত ঢাকা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করেন।

বিলাপ করতে করতে কালাম মিয়ার বোন রাসেদা বেগম বলেন, ‘ভাই বলছিল, এবার কোরবানির ঈদে বাড়ি আইসা ঘরের কাজ শেষ করমু, বাকি জীবনটা স্ত্রী-সন্তান নিয়া দেশের বাড়িতেই থাকমু। ভাই আমার বাড়ি ফিরল, কিন্তু লাশ হয়া!’

জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটের বিছানায় গত এক সপ্তাহে একে একে নিভে গেছে পাঁচটি জীবন। মৃত্যুর এই নির্মম মিছিলে প্রথমে বিদায় নেন কালাম মিয়া। দুর্ঘটনার দিন রোববারই চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।

এরপর বুধবার (১৩ মে) বিকেলে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে ৭ বছরের শিশু কথা। বোনকে হারানোর কয়েক ঘণ্টার মাথায় বৃহস্পতিবার (১৪ মে) সকালে মারা যায় একমাত্র ছেলে মুন্না (১২)। একই দিন বিকেলে না ফেরার দেশে চলে যায় মেজো মেয়ে মুন্নী (৯)। আর সবশেষে শুক্রবার সকাল ৮টায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন মা সালমা বেগম (৪০)।

এদিকে এই মর্মান্তিক ট্র্যাজেডির পেছনে ভবন কর্তৃপক্ষের চরম গাফিলতির অভিযোগ তুলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নিহতের এক স্বজন। তিনি জানান, বাসার গ্যাসের পাইপ লিকেজ হওয়ার বিষয়টি কালাম মিয়া ঘটনার আগের দিনই ভবনের দায়িত্বরত দারোয়ানকে জানিয়েছিলেন। কিন্তু দারোয়ান অলসতা করে বাড়ির মালিককে বিষয়টি জানায়নি। যদি সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়া হতো, তবে আজ একটি পুরো পরিবার এভাবে ধ্বংস হয়ে যেত না।

কালাম মিয়ার চাচাতো ভাই সোহাগ বলেন, ‘কত কষ্ট করে ফতুল্লার ব্যবসাটা দাঁড় করাল। মাত্র ২০ থেকে ২৫ দিন আগেও ঢাকায় ওর সাথে আমার দেখা হয়েছিল। ভাবতেই পারছি না, ভাই-ভাবি আর পুলাপাইনডি এভাবে আমাদের ছেড়ে এক্কেরে চলে যাবে!’

সংবাদটি শেয়ার করুন....